পরকীয়া প্রেমিকের সাথে পালাতে মৃত্যুর নাটক সাজায় প্রবাসীর স্ত্রী
- আপডেট সময় : ১০:৪২:২৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৩
- / 210
দাফনের’ দুই দিন পর গৃহবধূ ফোন, ‘আমি বেঁচে আছি’- এমন সংবাদে পুরো দেশে হইচই পড়ে গিয়েছিল দুদিন আগে। আসলে ওই ঘটনার পেছনে ছিল আরেক ঘটনা। যা রীতিমত সিনেমার মতো। পরকীয়ার কারণে বাড়ি ছাড়তে মৃত্যুর নাটক সাজায় ওই গৃহবধূ ও তার পরিবার। সেখানে আসামি হওয়ার আশঙ্কা ছিল প্রবাসী স্বামীরও। তবে বেঁচে থাকার খবরে মুক্তি পেলেও জীবনে নেমে এসেছে অশান্তির ঝড়।
ফরিদপুরের সদরপুরে পরকীয়ার টানে নিখোঁজ গৃহবধূ হাসি বেগমের কথিত লাশ উদ্ধারের পর জীবিত ফিরে এলেও মিথ্যা মামলায় ৭২ ঘণ্টা থানা হাজতে আটক করে রাখা হয় তার স্বামী মোতালেব শেখকে। এ ঘটনায় শুরু থেকেই তার প্রতি অবিচারের অভিযোগ করেন তিনি।
এমনকি তাকে হত্যা মামলায় ফাঁসিয়ে শেষ বেলায় টাকা-পয়সা হাতিয়ে নেয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি। স্ত্রী নিখোঁজের পর থানায় অভিযোগ দিতে গেলেও তার কোন অভিযোগই আমলে নেয়া হয়নি। স্ত্রীর কথিত ওই লাশ উদ্ধারের পর তাকে শেষবারের জন্য একটিবার স্ত্রীর মুখটিও দেখতে দেয়া হয়নি। লাশ সনাক্তের জন্য ডেকে নিলেও তাকে আটক করে স্ত্রীকে কুপিয়ে হত্যা করেছে বলে রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতনের ভয় দেখানো হয়।
এরপর জীবিত অবস্থায় তার স্ত্রী ফিরে এলেও তাকে না জানিয়েই স্ত্রী হাসি বেগমকে বাবার জিম্মায় ছেড়ে দেয়া হয়। এ ঘটনায় তছনছ হয়ে গেছে তার সংসার। একমাত্র শিশু সন্তানকে নিয়ে উদ্বিগ্ন মোতালেব শেখ এ ঘটনায় ন্যায় বিচার দাবি করেছেন প্রধানমন্ত্রীর নিকট।
ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার চরবিষ্ণুপুর ইউনিয়নের জামতলা বড় বাড়ির সন্তান দুবাই ফেরত প্রবাসী শ্রমিক মোতালেব শেখ (৪৫)। আট বছর আগে তার সাথে বিয়ে হয় পার্শ্ববর্তী কৃষ্ণপুর ইউনিয়নের শৌলডুবী গ্রামের হাবিবুর রহমানের মেয়ে হাসি বেগমের (২৫) সাথে। মুরসালিন নামে সাত বছরের একটি শিশু সন্তান রয়েছে তাদের। চার বছর প্রবাসে থাকার পর গত জানুয়ারীতে দেশে ফিরেন মোতালেব। বর্তমানে তিনি ঢাকার বসুন্ধরায় ডেন্টিং মিস্ত্রির কাজ করেন।
মোতালেব শেখ বলেন, তিনি প্রবাসে থাকাবস্থায় উপার্জনের সব টাকাই তিনি স্ত্রীর কাছে দেন। এই টাকা কি করছে জানিনা। বিদেশ থেকে আসার পর কিছুদিন আমার বাড়িতে ছিলো। তবে আমি ঢাকায় গেলে সে বাবার বাড়ি চলে যেতো। তিনি বলেন, ঘটনার দিন ৭ সেপ্টেম্বর তিনি ঢাকায় ছিলেন কর্মস্থলে। ওইদিন সকাল ৮টার দিকে স্ত্রী হাসি তাকে ফোন করে জানান, ফুফাতো ভাইয়ের সুন্নতে খৎনা অনুষ্ঠানে অংশ নিতে তিনি বাবার বাড়িতে যাবেন। এসময় স্ত্রী হাসি বিদ্যুৎ বিল দেয়ার কথা বলে তার নিকট থেকে ৩ হাজার টাকাও চেয়ে নেন বিকাশে মাধ্যমে। এরপর সকাল ১০টার দিকে ৩ ভরি স্বর্ণালঙ্কার, নগদ টাকা ও কাপড়চোপড় নিয়ে তিনি বাড়ি থেকে বের হন।
কাকলি আক্তার নামে হাসি বেগমের চাচাতো ননদ বলেন, চলে যাওয়ার আগের দিন রাত করে বাড়ি ফিরে হাসি। তখন তাকে জিজ্ঞেস করলে জানায়, বাবার বাড়ি থেকে এসেছেন। সকালে অনেক জামাকাপড় নিয়ে বের হওয়ার সময় তারা সকালে যাওয়ার আগে বেডিংপত্র গোছানোর সময় আমি জিজ্ঞেস করলে সে জানায় তার ফুপু বাড়িতে অনুষ্ঠান আছে সেখানে যাচ্ছে। ছেলের কথা জানতে চাইলে জানায় মামা বাড়ি রেখে এসেছে।
হাসি আক্তারের চাচাতো ননদ মনোয়ারা পারভীন বলেন, হাসি বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার তিন থেকে চারদিন পরে হাসির কাছে এনজিও সমিতি থেকে আসে কিস্তির টাকা নিতে। তখন আমরা বলি হাসিকে তো পাওয়া যাচ্ছেনা, তার ফোনও বন্ধ। তখন আমরা হাসির এক আপন ননদের কাছে ফোন দিলে জানতে পারি হাসি অন্য কোথাও চলে গেছে। আমার দেবর অনেক খোঁজাখুঁজি করেছে তাকে খুঁজে বের করতে। মনোয়ারা জানান, পালিয়ে যাওয়ার আগে হাসি ওই এনজিও সমিতি থেকে ৬০ হাজার টাকা লোন তুলেন।
হাসি বেগমের নিখোঁজের বিষয়টি জানতে পেরে স্বামী মোতালেব শেখ তার শ্বশুর বাড়িতে যোগাযোগ করেন। তাকে বিষয়টি বাড়িতে জানাজানি করতে নিষেধ করেন শ্বশুর। তারা কয়েকদিনের মধ্যে বিষয়টি সুরাহা করে দিবেন বলেও আশ্বাস দেন। স্ত্রীকে নিয়ে সংসার করতে হবে এজন্য মানসম্মানের ভয়ে তিনি আর থানায় কোন অভিযোগ দেননি। তবে চারদিন পরে তার শ্বশুর সদরপুর থানায় মেয়ের নিখোঁজের ব্যাপারে একটি অভিযোগ করেন।
পরেরদিন মোতালেব শেখের বাড়িতে পরিবারের লোক ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সালিশও করেন। সদরপুর উপজেলার বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের ২ নং ওয়ার্ডের মেম্বার মোশাররফ হোসেন বলেন, বৈঠকে আসলে হাসি বেগম কারো সাথে চলে গেছে এমন একটি কথাই হইছিলো। তখন তার স্বামী বলেন, সে যখন চলেই গেছে যাক, তাহলে তার সাথে আমার যে ঝামেলা আছে তা পরিস্কার করে দেন। পরেরদিন মোতালেব শেখ থানায় একটি অভিযোগ করেন স্ত্রীর বিরুদ্ধে। তাতে তিনি বলেন, তার স্ত্রী বাড়ি থেকে সোনা গহনা ও টাকাপয়সা নিয়ে পালিয়েছেন।
এদিকে, ২০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় পাশ্ববর্তী ভাঙ্গা উপজেলার মানিকদহ ইউনিয়নের আদমপুর এলাকার নাউটানায় একটি ডোবা থেকে এক নারীর অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এরপর খবর দেয়া হয় হাসির বাবা ও স্বামীকে।
হাসি বেগমের মা সালমা বেগম বলেন, লাশটি দেখেই আমি বলেছি সেটি আমার মেয়ের না। হাসির বাবাও সেটি সনাক্ত করতে পারেননি। তবে লাশের পায়ের দুটি আঙুল ছোট ছিলো যার সাথে তার মেয়ের কিছুটা মিল রয়েছে। এছাড়া হাসির ফুফু নিহারন বেগম বলেন, তিনি হাসির কোমড়ে একটি তাবিজ দিয়েছিলেন যেটি এই লাশের কোমড়েও রয়েছে।
তাদের এসব তথ্যেই ভিত্তিতেই ভাঙ্গা থানা পুলিশ লাশটি সনাক্ত করে বৃহস্পতিবার পোস্টমর্টেমের জন্য মর্গে পাঠায়। যাওয়ার পথে লাশবাহী নসিমনটি দুর্ঘটনার কবলে পরে। পরেরদিন শুক্রবার হওয়ায় লাশটি ফরিদপুর মেডিক্যালের মর্গে রাখা হয়। পচাঁ-গলা লাশটি এভাবেই দুদিন পড়ে থাকার পর শনিবার সেটি ময়নাতদন্ত করা হয়। হাসির বাবার সাথে থানায় যাওয়া লুৎফর রহমান নামে এক ব্যক্তি তখন পুলিশকে বলে, যদি এটি হাসির লাশ না হয় এবং পরে হাসি জীবিত ফিরে আসে তাহলে কি হবে? জবাবে পুলিশ জানায়, আমরা লাশের পরিচয় উদ্ধারের জন্য ডিএনএ সংরক্ষণ করে রেখেছি। জানতে চাইলে হাসির বাবা হাবিবুর রহমান বলেন, সার্কেল অফিস থেকেই ’ই’ করছিলো। আমার তখন মাথা ঠিক ছিলোনা। আমার ভুল হয়ে গেছে।
মোতালেব শেখ বলেন, আমি খবর পেয়ে মৈনট ঘাট হয়ে বাড়িতে এসে আমার পরিবারের লোকদের নিয়ে ভাঙ্গায় যাই। তবে আমার যেতে দেরি হওয়ায় পুলিশ আমাকে সন্দেহ করে আটকায়। আমাকে বলে যেই রামদা দিয়ে খুন করেছিস সেটি কোথায়? তুই একাই এতোগুলো কোপ কিভাবে দিলি? আমি বারবার তাদের বলেছি আমি খুন করিনি। কিন্তু তারা আমার কোন কথাই শুনেনি। এমনকি আমাকে ওই লাশটিও দেখতে দেয়নি। এরপর আমাকে সদরপুর থানায় নিয়ে হাজতে রাখে। সেখানে দুইতিন ঘন্টা পরপর আমাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করতো। আমার হাত দেখে বলে, এতো তাড়াতাড়ি হাতের রেখা মুছে যায় নাকি মানুষের? আমাকে নানাভাবে ভয় দেখায়। বলে, রাত ১২টার পর তোকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই আসল তথ্য বেরিয়ে আসবে। আমি তাদের বারবার বলেছি আমি এর সাথে জড়িত না। আমার কথা শুনেনি। থানায় ৭২ ঘন্টা আটক রাখার সময় তারা আমাকে কোন খাবারও দেয়নি। বাড়ি থেকে খাবার পাঠিয়েছে। তবে বাড়ির লোকদের সাথে কথাও বলতে দেয়নি।
মোতালেব শেখের বড় ভাই হালিম শেখ বলেন, হাসির ওই কথিত লাশ দাফনের সময় তার ছোটভাইকে আনার কথা বললে হাসির বাবা টাকাপয়সা দিয়ে থানা থেকে ছাড়িয়ে আনা যায় কিনা বলে। এসময় তারা হাসির বাবার হাতে ত্রিশ হাজার টাকা দেন ছোট ভাইকে ছাড়িয়ে আনার জন্য। স্বীকার করে হাসির বাবা হাবিবুর রহমান অবশ্য দাবি করেন, এই টাকা তারাই ইচ্ছা করে দেন।
এদিকে, লাশ দাফনের পর ওই রাতেই হাসি তার বাড়িতে ফোন করে জানায় সে মারা যায়নি জীবিত আছে। খবর পেয়ে পুলিশ তার অবস্থান সনাক্ত করে ময়মনসিংহের নান্দাইল থেকে প্রেমিক মোস্তাকের বাড়ি থেকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে। এসময় হাসির স্বামী সদরপুর থানাতেই আটক ছিলো। স্ত্রীর সাথে ছাড়াছাড়ি না হলেও হাসিকে স্বামীর বদলে আদালতের মাধ্যমে বাবার জিম্মায় ছেড়ে দেয়া হয়। হাসি ছাড়া পাওয়ার পরে মুক্তি পায় মোতালেব। পুরো ঘটনাকালেই তাই এই প্রবাসী তার প্রতি চরম অবিচার করা হয়েছে বলে অভিযোগ করে ন্যায়বিচার দাবি করেন। একইসাথে এমন আচরণ যেনো আর কারো সাথে না হয় সে দাবিও করেন।
এব্যাপারে সদরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মামুন আল রশিদ বলেন, ভাঙ্গা থানায় একটি লাশ উদ্ধারের খবর পাওয়ার পর আমরা খোঁজ নিয়ে জানতে পারি হাসি নামে একটি মেয়ে নিখোঁজের জিডি হয়েছে থানায়। তখন হাসির বাবা ও ফুফু লাশটি সনাক্ত করেন। হাসির স্বামীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় আনা হয় তবে তাকে আটক করা হয়নি। হাসির স্বামীর অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সে বলেছে ১০ লাখ টাকা ও সোনাগহনা নিয়ে গেছে তার স্ত্রী? সে একজন গরিব মানুষ। এতো টাকা সে কোথায় পাবে? তাই আমরা তার অভিযোগ বিশ্বাস করিনি। আমরা আইনগত প্রক্রিয়াতেই পরে হাসির সন্ধান পাওয়ার পর তাকে ছেড়ে দিয়েছি। আর আদালতে হাসি তার পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য জবানবন্দি দেয়ার পর তার বাবার জিম্মায় তাকে মুক্তি দেয়া হয়। এরপর সে স্বেচ্ছায় নিজের ইচ্ছামতো জায়গায় চলে গেছে। তবে তালাক না হওয়ায় তাকে বাবার পরিবর্তে স্বামীর জিম্মায় ছেড়ে দেয়াই আইনসঙ্গত বলেও এই পুলিশ কর্মকর্তা দাবি করেন।


















