ঢাকা ০৩:৩৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৮ মে ২০২৬, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

২০১৩ সালের ২৬ অক্টোবর প্রতিবেদনটি প্রথম প্রকাশিত হয়

ফিরে দেখা: ফরিদপুরের নিষিদ্ধপল্লীতে শিশু-কিশোরীদের বোবা কান্না

হারুন আনসারী, ফরিদপুর:
  • আপডেট সময় : ১০:৫৮:১৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৫
  • / 1216

ছবিতে কয়েকজন পাচারকারী

দৌলতদিয়ার পদ্মা নদীর পাড়ে প্রাগৈতিহাসিক গোয়ালন্দ পতিতা পল্লী। বাস থেকে নেমেই কলারদের হাকডাক—যাবেন নাকি নানী বাড়ি? যাত্রাপথে এমন ঘনিষ্ঠ আমন্ত্রণ শুনে সহসা হতচকিয়ে ওঠেন অনেকে। রিকশাচালক আবার বলে, ‘বোর্ডিং বোর্ডিং, নানীর বোর্ডিং, যাবেন নাকি…?’ পাশেই পুলিশ। তাদের নাকের ডগাতেই এভাবেই খদ্দের খুঁজে পতিতাপল্লীর লোকাল এজেন্ট তথা কলাররা।

দক্ষিণবঙ্গের প্রবেশমুখ রাজবাড়ির গোয়ালন্দ। সেখানেই দৌলতদিয়া ঘাট। ঢাকা হতে এখনো এই পদ্মা পেরিয়ে ফরিদপুর আসতে হয়। বছরের পর বছর চলছে এভাবে খদ্দের ধরার ফাঁদ। এরা এই আঁধার ঘেরা জগতের জন্য খদ্দের ধরে নিয়ে যাচ্ছে আলো ঝলমল নদীর ঘাট হতে।

দেশের একেবারে মধ্যবর্তী জেলা ফরিদপুর। শহরের প্রাণকেন্দ্রে রয়েছে উপমহাদেশের মহান মুজাদ্দেদ (সংস্কারক) হাজী শরিয়তুল্লাহ (র.) এর নামে একটি বাজার। হাজী শরিয়তুল্লাহ বাজারের পশ্চিমে বায়তুল মোকাদ্দেম মসজিদ ট্রাস্টের মসজিদ। নিচতলায় শতাধিক দোকান আর উপর তলায় নামাজের স্থান। দক্ষিণপ্রান্তে ছিলো একসময়ের খুলনা-বরিশাল বাস চলাচলের সড়ক পথ। আর তার বিপরীত পাশে রথখোলা মহল্লা। প্রতিবছর রথের মেলা বসতো সেখানে। এখনো আশ্বিন মাস এলে শুরু হয় পূজা-পার্বণ। একটি কালি মন্দিরও করা হয়েছে।

বিস্ময়কর হলেও সত্যি যে, ফরিদপুরবাসীর আদর্শের রাহবার হাজী শরিয়তুল্লাহ (র.) এর নামের এই বাজারের পাশে বিশাল জায়গাটি এখন রেড জোন। শুধুমাত্র টাকার বিনিময়ে রূপজীবিনীদের সাময়িক সঙ্গই নয়, এখানে পাওয়া যায় না কি?

রঙিন জগতের স্বপ্ন বা একটু সচ্ছল ভবিষ্যৎ দেখিয়ে শহর বা গ্রাম থেকে ভাগিয়ে নিয়ে আসা কিশোরী থেকে ভাড়াটিয়া খুনি, ভয়ঙ্কর ডাকাত; সব অপরাধীদের অভয়ারণ্য হিসেবেই দেশের সর্ববৃহৎ যৌনপল্লী এটি। ফরিদপুর নতুন বাসস্ট্যান্ড হতে মুজিব সড়ক মিশেছে শহরের শেষ সীমানায়, পদ্মা এখন যেখানে এসে মিশেছে সেই টেপুরাকান্দি সিএন্ডবি ঘাট এলাকায়। এই সিএন্ডবি ঘাটের লোকালয়ে এলাকাবাসীর বিষফোঁড়া হয়ে জ্বলছে আরও একটি রেড জোন এলাকা। শিশু ও নারী পাচারকারী, মাদক কারবারি, ভাড়াটিয়া খুনি আর দুর্নীতিবাজদের জন্য এ যেন সোনায় সোহাগা!

ফরিদপুর জেলার জনবসতি এলাকায় গড়ে ওঠা এসব রেড জোন স্পট ঘিরে এখন চলছে কিশোরী ও মেয়ে শিশু পাচারের রমরমা কারবার। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে নানাভাবে এসব মেয়ে ও শিশু সংগ্রহ করে যৌনবৃত্তিতে বাধ্য করা হয়। কাউকে পাচার করা হয় ভারতে বা অন্য কোথাও। এ কাজে নিয়োজিত নারী-পুরুষ ও তাদের লোকাল এজেন্টদের আইনী শেল্টারের জন্য আছে লাইসেন্স ডিপার্টমেন্ট ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও অসাধু নোটারি পাবলিক অফিসার ও কিছু আইনজীবী সহকারী।

টাকার বিনিময়ে এফিডেভিট করে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বয়স বাড়িয়ে দেখিয়ে যৌনবৃত্তির লাইসেন্স সংগ্রহ হয়। এ কাজে থানা হতে কোর্ট, সবখানেই রয়েছে তাদের সেট করা এজেন্ট। একটা সময় যৌনপল্লী থেকে পুলিশের বড় কর্তার বাড়িতেও প্রতিদিনের বাজার যেত। আর তার অধস্তনরা মাসোহারা, নগদ উপরির বাইরে মনোরঞ্জনের সুযোগও পেতো। সোর্সের মাধ্যমে নিয়মিত চাঁদার বাইরেও বিভিন্ন ঘটনায় মোটা অঙ্কের বাণিজ্য হতো। এখন অবশ্য এমন অভিযোগ শোনা যায় না। দু-চারজন অসাধু ব্যক্তি যা নেয়, খুবই গোপনে।

কেস স্টাডি:

দ্বীপ জেলা ভোলার চরফ্যাসনের দরিদ্র পরিবারের মেয়ে খাদিজার বয়স ১৪, তার বান্ধবী নাজমার বয়স ১৩। পড়ালেখা হয়নি। মানুষের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ ছাড়া তার কোনো বিকল্প কিছু জানা নেই। এদের মতো মেয়েদেরকেই টার্গেট করা হয় পাচারের জন্য। তাদের ভালো কাজ দেওয়ার প্রলোভন দেখায় নার্গিস ওরফে কল্পনা (৩৮) এবং রাবেয়া (৩৫) নামে শিশু পাচার চক্রের দুই নারী দালাল। এরপর ফরিদপুর এনে তাদের নিয়ে আসা হয় রথখোলার রেড জোনে। জয়নাল বাড়িওয়ালার বাড়িতে রীতা নামে এক সর্দারনীর কাছে বিক্রি করা হয় তাদের।

সমুদ্রপাড়ের মেয়ে বলেই হয়তো প্রতিকূল পরিবেশে বিদ্রোহের নিয়ম জানা ছিল ওদের। ফরিদপুরের যৌনপল্লীতে বিক্রি হওয়ার ১২ দিন পরেও তাদের কাবু করা যায়নি। তেরো দিনে তাদের একজনের ঘরে যায় এক যুবক খদ্দের। ছেলেটি তাদের বিষয়টি টের পেয়ে সাহায্যের আশ্বাস দেয়। সেখান থেকে বেরিয়ে স্থানীয় সাংবাদিকদের জানায় এ তথ্য। এরপর পুলিশ নিয়ে তাদের উদ্ধার করা হয়।

পরের ঘটনা:

মেয়ে দু’টিকে রেড জোন হতে উদ্ধারের সময়েই গ্রেফতার করা হয় রাবেয়া ও কল্পনা নামে দু’জনকে, যারা তাদের কিনে দেহ ব্যবসা করাচ্ছিল। তবে কিছুদিন না যেতেই আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে কারাগার থেকে বেরিয়ে আসে তারা। রাবেয়া ও কল্পনারা আবার ডেরায় ফিরে এসে নতুন করে ধান্দায় নেমেছে। দু’টি শিকার হাতছাড়া হওয়ায় তাদের অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। বেশ কিছু টাকা গচ্চা গেছে। তবে কাজ এতোটুকুই হয়েছে, লাইনঘাটটা আরও একটু ভালো মতো চিনেছে। কাকে দিয়ে কীভাবে কাজ হবে সেই অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে ভুক্তভোগী হয়ে।

এখন তারা আবার নতুন শিকারের সন্ধানে নেমেছে। বিপুল জনসংখ্যার এই দারিদ্র্যপীড়িত দেশে কাজের সন্ধানে মুখিয়ে আছে অনেক কিশোরী মেয়ে। পারিবারিক নিগ্রহ, ক্ষুধা কিংবা রঙিন জগতের নেশায় তারা সামান্য প্রলোভনেই ঘর ছাড়তে প্রস্তুত। এদেরই টার্গেট করা হয় দেশব্যাপী বিস্তৃত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে।

শহরের বাখুন্ডা এলাকার কুদ্দুস মিয়া, মেয়ে শিশু পাচার সিন্ডিকেটের সক্রিয় এজেন্ট সে। রোজিনা নামে এক মেয়েকে বিয়ের অভিনয় করে নিয়ে এসেছে রথখোলায়। বউ বানিয়ে প্রথমে রাজবাড়ি ও কানাইপুরের বিভিন্ন স্থানে তাকে নিয়ে মৌজ-মাস্তি করেছে। এরপর সুযোগ বুঝে হাই ও আনোয়ার এই চক্রের দুই সহযোগীর মাধ্যমে রোজিনাকে বিক্রি করে দিয়েছে সিএন্ডবি ঘাটের রেড জোনে। রোজিনাকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পরে উদ্ধার করা গেলেও কুদ্দুস মিয়া লাপাত্তা। তাকে আটক করা যায়নি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এইসব সংঘবদ্ধ পাচার চক্রের মাধ্যমে খাদিজা, নাজমা ও রোজিনার মতো শত শত শিশু ও মেয়েকে নানা প্রলোভনে নিয়ে আসার পর ফরিদপুরের পতিতাপল্লীর সর্দারনীদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। এসব কিশোরীর বোবা কান্না ছোট্ট কুঠুরির বাইরে আসে না। আর এখানে নিয়ে আসার পর প্রথম ক’দিন তাদের উপর দিয়ে যেই ঝড় বয়ে যায় তা ভাষায় বর্ণনাতীত। তারপর অনেকে এই অন্ধকার জগতে মিশে যায়। অনেকে পালিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে। দৌলতদিয়া, রথখোলা ও সিএন্ডবি ঘাট পতিতাপল্লীতে বিভিন্ন বয়সী প্রায় আড়াই হাজার যৌন দাসী রয়েছে।

একজন সর্দারনী বলেন, “বাপুরে, খদ্দের আসে বলেই তো ব্যবসা চলে। তবে টাকা পয়সায় রফা না হলে পুলিশ আটকে দেয়। থানায় নিয়ে যায়। মামলা দেয়।”

নতুন কোনো মেয়েকে আনার পর প্রথমেই মেয়েটির শারীরিক ফিটনেস নেয় টিআই এর মাধ্যমে। বয়স কম মেয়েদের এফিডেভিট করে বয়স বেশি দেখিয়ে ফিটনেস সার্টিফিকেট সংগ্রহ করা হয়। সংশ্লিষ্ট দপ্তর হতেই এসব করা হয়।

পরিতাপের বিষয় হলো, দেশে মেয়েদের সুরক্ষায় যাদের বেতন দিয়ে চাকরিতে পুষছে সরকার, তাদেরই একটি অংশ দুর্নীতির টাকার লোভে সরকারের আইনী সুরক্ষার ব্যবস্থা করে দিচ্ছে।

প্রাপ্ত তথ্য মতে, পাচার করে আনা অনেক মেয়েকে সরাসরি সড়ক পথে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে পাশের দেশে। মোটা অঙ্কের বিনিময়ে তাদের হাতবদল করা হয়। নারী পাচার রোধে গঠিত বিশেষ টাস্কফোর্সের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী মেয়ে ও কিশোরীসহ আদম পাচারের একটি অন্যতম প্রধান রুট হচ্ছে ফরিদপুর। এখানকার আবাসিক হোটেল, বিভিন্ন ফ্ল্যাটবাড়িও রয়েছে লাল তালিকায়।

২০১৩ সালের ২৬ অক্টোবর প্রতিবেদনটি প্রথম প্রকাশিত হয়

ফিরে দেখা: ফরিদপুরের নিষিদ্ধপল্লীতে শিশু-কিশোরীদের বোবা কান্না

আপডেট সময় : ১০:৫৮:১৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৫

দৌলতদিয়ার পদ্মা নদীর পাড়ে প্রাগৈতিহাসিক গোয়ালন্দ পতিতা পল্লী। বাস থেকে নেমেই কলারদের হাকডাক—যাবেন নাকি নানী বাড়ি? যাত্রাপথে এমন ঘনিষ্ঠ আমন্ত্রণ শুনে সহসা হতচকিয়ে ওঠেন অনেকে। রিকশাচালক আবার বলে, ‘বোর্ডিং বোর্ডিং, নানীর বোর্ডিং, যাবেন নাকি…?’ পাশেই পুলিশ। তাদের নাকের ডগাতেই এভাবেই খদ্দের খুঁজে পতিতাপল্লীর লোকাল এজেন্ট তথা কলাররা।

দক্ষিণবঙ্গের প্রবেশমুখ রাজবাড়ির গোয়ালন্দ। সেখানেই দৌলতদিয়া ঘাট। ঢাকা হতে এখনো এই পদ্মা পেরিয়ে ফরিদপুর আসতে হয়। বছরের পর বছর চলছে এভাবে খদ্দের ধরার ফাঁদ। এরা এই আঁধার ঘেরা জগতের জন্য খদ্দের ধরে নিয়ে যাচ্ছে আলো ঝলমল নদীর ঘাট হতে।

দেশের একেবারে মধ্যবর্তী জেলা ফরিদপুর। শহরের প্রাণকেন্দ্রে রয়েছে উপমহাদেশের মহান মুজাদ্দেদ (সংস্কারক) হাজী শরিয়তুল্লাহ (র.) এর নামে একটি বাজার। হাজী শরিয়তুল্লাহ বাজারের পশ্চিমে বায়তুল মোকাদ্দেম মসজিদ ট্রাস্টের মসজিদ। নিচতলায় শতাধিক দোকান আর উপর তলায় নামাজের স্থান। দক্ষিণপ্রান্তে ছিলো একসময়ের খুলনা-বরিশাল বাস চলাচলের সড়ক পথ। আর তার বিপরীত পাশে রথখোলা মহল্লা। প্রতিবছর রথের মেলা বসতো সেখানে। এখনো আশ্বিন মাস এলে শুরু হয় পূজা-পার্বণ। একটি কালি মন্দিরও করা হয়েছে।

বিস্ময়কর হলেও সত্যি যে, ফরিদপুরবাসীর আদর্শের রাহবার হাজী শরিয়তুল্লাহ (র.) এর নামের এই বাজারের পাশে বিশাল জায়গাটি এখন রেড জোন। শুধুমাত্র টাকার বিনিময়ে রূপজীবিনীদের সাময়িক সঙ্গই নয়, এখানে পাওয়া যায় না কি?

রঙিন জগতের স্বপ্ন বা একটু সচ্ছল ভবিষ্যৎ দেখিয়ে শহর বা গ্রাম থেকে ভাগিয়ে নিয়ে আসা কিশোরী থেকে ভাড়াটিয়া খুনি, ভয়ঙ্কর ডাকাত; সব অপরাধীদের অভয়ারণ্য হিসেবেই দেশের সর্ববৃহৎ যৌনপল্লী এটি। ফরিদপুর নতুন বাসস্ট্যান্ড হতে মুজিব সড়ক মিশেছে শহরের শেষ সীমানায়, পদ্মা এখন যেখানে এসে মিশেছে সেই টেপুরাকান্দি সিএন্ডবি ঘাট এলাকায়। এই সিএন্ডবি ঘাটের লোকালয়ে এলাকাবাসীর বিষফোঁড়া হয়ে জ্বলছে আরও একটি রেড জোন এলাকা। শিশু ও নারী পাচারকারী, মাদক কারবারি, ভাড়াটিয়া খুনি আর দুর্নীতিবাজদের জন্য এ যেন সোনায় সোহাগা!

ফরিদপুর জেলার জনবসতি এলাকায় গড়ে ওঠা এসব রেড জোন স্পট ঘিরে এখন চলছে কিশোরী ও মেয়ে শিশু পাচারের রমরমা কারবার। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে নানাভাবে এসব মেয়ে ও শিশু সংগ্রহ করে যৌনবৃত্তিতে বাধ্য করা হয়। কাউকে পাচার করা হয় ভারতে বা অন্য কোথাও। এ কাজে নিয়োজিত নারী-পুরুষ ও তাদের লোকাল এজেন্টদের আইনী শেল্টারের জন্য আছে লাইসেন্স ডিপার্টমেন্ট ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও অসাধু নোটারি পাবলিক অফিসার ও কিছু আইনজীবী সহকারী।

টাকার বিনিময়ে এফিডেভিট করে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বয়স বাড়িয়ে দেখিয়ে যৌনবৃত্তির লাইসেন্স সংগ্রহ হয়। এ কাজে থানা হতে কোর্ট, সবখানেই রয়েছে তাদের সেট করা এজেন্ট। একটা সময় যৌনপল্লী থেকে পুলিশের বড় কর্তার বাড়িতেও প্রতিদিনের বাজার যেত। আর তার অধস্তনরা মাসোহারা, নগদ উপরির বাইরে মনোরঞ্জনের সুযোগও পেতো। সোর্সের মাধ্যমে নিয়মিত চাঁদার বাইরেও বিভিন্ন ঘটনায় মোটা অঙ্কের বাণিজ্য হতো। এখন অবশ্য এমন অভিযোগ শোনা যায় না। দু-চারজন অসাধু ব্যক্তি যা নেয়, খুবই গোপনে।

কেস স্টাডি:

দ্বীপ জেলা ভোলার চরফ্যাসনের দরিদ্র পরিবারের মেয়ে খাদিজার বয়স ১৪, তার বান্ধবী নাজমার বয়স ১৩। পড়ালেখা হয়নি। মানুষের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ ছাড়া তার কোনো বিকল্প কিছু জানা নেই। এদের মতো মেয়েদেরকেই টার্গেট করা হয় পাচারের জন্য। তাদের ভালো কাজ দেওয়ার প্রলোভন দেখায় নার্গিস ওরফে কল্পনা (৩৮) এবং রাবেয়া (৩৫) নামে শিশু পাচার চক্রের দুই নারী দালাল। এরপর ফরিদপুর এনে তাদের নিয়ে আসা হয় রথখোলার রেড জোনে। জয়নাল বাড়িওয়ালার বাড়িতে রীতা নামে এক সর্দারনীর কাছে বিক্রি করা হয় তাদের।

সমুদ্রপাড়ের মেয়ে বলেই হয়তো প্রতিকূল পরিবেশে বিদ্রোহের নিয়ম জানা ছিল ওদের। ফরিদপুরের যৌনপল্লীতে বিক্রি হওয়ার ১২ দিন পরেও তাদের কাবু করা যায়নি। তেরো দিনে তাদের একজনের ঘরে যায় এক যুবক খদ্দের। ছেলেটি তাদের বিষয়টি টের পেয়ে সাহায্যের আশ্বাস দেয়। সেখান থেকে বেরিয়ে স্থানীয় সাংবাদিকদের জানায় এ তথ্য। এরপর পুলিশ নিয়ে তাদের উদ্ধার করা হয়।

পরের ঘটনা:

মেয়ে দু’টিকে রেড জোন হতে উদ্ধারের সময়েই গ্রেফতার করা হয় রাবেয়া ও কল্পনা নামে দু’জনকে, যারা তাদের কিনে দেহ ব্যবসা করাচ্ছিল। তবে কিছুদিন না যেতেই আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে কারাগার থেকে বেরিয়ে আসে তারা। রাবেয়া ও কল্পনারা আবার ডেরায় ফিরে এসে নতুন করে ধান্দায় নেমেছে। দু’টি শিকার হাতছাড়া হওয়ায় তাদের অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। বেশ কিছু টাকা গচ্চা গেছে। তবে কাজ এতোটুকুই হয়েছে, লাইনঘাটটা আরও একটু ভালো মতো চিনেছে। কাকে দিয়ে কীভাবে কাজ হবে সেই অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে ভুক্তভোগী হয়ে।

এখন তারা আবার নতুন শিকারের সন্ধানে নেমেছে। বিপুল জনসংখ্যার এই দারিদ্র্যপীড়িত দেশে কাজের সন্ধানে মুখিয়ে আছে অনেক কিশোরী মেয়ে। পারিবারিক নিগ্রহ, ক্ষুধা কিংবা রঙিন জগতের নেশায় তারা সামান্য প্রলোভনেই ঘর ছাড়তে প্রস্তুত। এদেরই টার্গেট করা হয় দেশব্যাপী বিস্তৃত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে।

শহরের বাখুন্ডা এলাকার কুদ্দুস মিয়া, মেয়ে শিশু পাচার সিন্ডিকেটের সক্রিয় এজেন্ট সে। রোজিনা নামে এক মেয়েকে বিয়ের অভিনয় করে নিয়ে এসেছে রথখোলায়। বউ বানিয়ে প্রথমে রাজবাড়ি ও কানাইপুরের বিভিন্ন স্থানে তাকে নিয়ে মৌজ-মাস্তি করেছে। এরপর সুযোগ বুঝে হাই ও আনোয়ার এই চক্রের দুই সহযোগীর মাধ্যমে রোজিনাকে বিক্রি করে দিয়েছে সিএন্ডবি ঘাটের রেড জোনে। রোজিনাকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পরে উদ্ধার করা গেলেও কুদ্দুস মিয়া লাপাত্তা। তাকে আটক করা যায়নি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এইসব সংঘবদ্ধ পাচার চক্রের মাধ্যমে খাদিজা, নাজমা ও রোজিনার মতো শত শত শিশু ও মেয়েকে নানা প্রলোভনে নিয়ে আসার পর ফরিদপুরের পতিতাপল্লীর সর্দারনীদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। এসব কিশোরীর বোবা কান্না ছোট্ট কুঠুরির বাইরে আসে না। আর এখানে নিয়ে আসার পর প্রথম ক’দিন তাদের উপর দিয়ে যেই ঝড় বয়ে যায় তা ভাষায় বর্ণনাতীত। তারপর অনেকে এই অন্ধকার জগতে মিশে যায়। অনেকে পালিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে। দৌলতদিয়া, রথখোলা ও সিএন্ডবি ঘাট পতিতাপল্লীতে বিভিন্ন বয়সী প্রায় আড়াই হাজার যৌন দাসী রয়েছে।

একজন সর্দারনী বলেন, “বাপুরে, খদ্দের আসে বলেই তো ব্যবসা চলে। তবে টাকা পয়সায় রফা না হলে পুলিশ আটকে দেয়। থানায় নিয়ে যায়। মামলা দেয়।”

নতুন কোনো মেয়েকে আনার পর প্রথমেই মেয়েটির শারীরিক ফিটনেস নেয় টিআই এর মাধ্যমে। বয়স কম মেয়েদের এফিডেভিট করে বয়স বেশি দেখিয়ে ফিটনেস সার্টিফিকেট সংগ্রহ করা হয়। সংশ্লিষ্ট দপ্তর হতেই এসব করা হয়।

পরিতাপের বিষয় হলো, দেশে মেয়েদের সুরক্ষায় যাদের বেতন দিয়ে চাকরিতে পুষছে সরকার, তাদেরই একটি অংশ দুর্নীতির টাকার লোভে সরকারের আইনী সুরক্ষার ব্যবস্থা করে দিচ্ছে।

প্রাপ্ত তথ্য মতে, পাচার করে আনা অনেক মেয়েকে সরাসরি সড়ক পথে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে পাশের দেশে। মোটা অঙ্কের বিনিময়ে তাদের হাতবদল করা হয়। নারী পাচার রোধে গঠিত বিশেষ টাস্কফোর্সের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী মেয়ে ও কিশোরীসহ আদম পাচারের একটি অন্যতম প্রধান রুট হচ্ছে ফরিদপুর। এখানকার আবাসিক হোটেল, বিভিন্ন ফ্ল্যাটবাড়িও রয়েছে লাল তালিকায়।