লোডশেডিং–আব্দুল্লাহ আফিফ (রাজ)
- আপডেট সময় : ১০:১০:৫৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৩
- / 623
লোডশেডিং এর জন্য হয়তো আর থাকা যাবে না। জানালা দিয়ে চাঁদের আলো আসছে, এগিয়ে গিয়ে জানালা পুরোটা খুলতেই চাঁদের আলোর সাথে সাথে আশপাশের বাড়ির লাইটের আলো এসে চোখে পড়লো। তখনি বুঝে নিলাম যে,আমার লাইনটাতেই সমস্যা। বাহিরে ফিউস চেক করতে যাবো আর তখনই মনে হলো আমি ছাড়াও অন্য কেউ আমার সাথেই আছে। ড্রয়ার থেকে টর্চের সাথে আমার 9mm(সরকার অনুমোদিত) পিস্তলটা নিয়ে নিলাম। একটু এগিয়ে যেতেই পিছন থেকে কোনো মানুষের হাটার আওয়াজ পেলাম। সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেলাম। নাহ! আমার কোনো ভুল হচ্ছে না। স্পষ্ট বুঝতে পারছি কারা যেন একে অপরের সাথে হাতাহাতির মত কিছু করছে।
পিছন ঘুরে দাড়ানোর মনস্থির করলাম। আর তখনই দু’জোড়া সেন্ডেলের আওয়াজ পেলাম। তাই সাথে সাথে’ই পিছনে ঘুরে গেলাম। অদ্ভুত ব্যাপার! আমার থেকে প্রায় ২২ কদম দূরে কাদা মাখা দু’জনের পদ চিহ্ন। আর ফিউসের দিকে না এগিয়ে সে পদচিহ্নের দিকে এগিয়ে গেলাম। পদচিহ্নের কাছে আসতে না আসতেই আবার অদ্ভূত একটা শব্দ কানে আসলো। মনে হলো কেউ পেছনের দেয়াল টপকালো। সাথে সাথেই টর্চটা দেয়ালের দিকে ধরলাম কিন্তু কিছুই দেখলাম না। শুধু দেখলাম দুটো ছায়া মূহুর্তেই ভ্যানিশ হয়ে গেলো।
9mm রিলোড করলাম। চ্যাঞ্জিং ম্যাগের সময় দেখলাম ৬ টি বুলেট রয়েছে। আমিও সেই দেয়াল টপকিয়ে এগিয়ে গেলাম। দেয়াল টপকিয়ে নামতেই যা দেখলাম তাতে গা শিউরে উঠলো। কারণ মাটিতে রক্ত পড়ে আছে। দেখে মনে হচ্ছে মাত্রই এখানে কাউকে খুন করে লাশ সরানো হয়েছে।একটু ঝুকে রক্তটায় হাত দিয়ে দেখলাম রক্তটা একদম টাটকা। মানে আমার অনুমান ভুল নয়। আমার বাড়ি পুরোটার চারদিকে দেয়াল দিয়ে বাউন্ডারি করা। সুতরাং, লাশটা এতো দ্রুত সরানো সম্ভব নয়। তাছাড়া আমার বাড়িতে আমি একাই থাকি। তাই এখানে অন্য কেউ থাকার কথা না। কিন্তু আমার সামনেই প্রমাণ পড়ে আছে। যা দেখে স্পষ্ট আমি ছাড়াও অন্য কেউ আমার সাথেই আছে। কিন্তু কে! আর লাশই বা কোথায়!
রক্তের সামনে দাড়িয়ে ভাবছি। আর তখনই বুঝতে পারলাম আমার বা পাশে থাকা গাছের পিছে কেউ লুকিয়ে আছে। সাথে সাথেই গাছের দিকে তাকালাম। কিন্তু সেটা দেখলাম তাতে অবাক না হয়ে পাড়লাম না। কারণ, গাছে রক্ত দিয়ে লেখা ” আমি তাকে মেরেছি। দয়া করে আপনি এতে নিজেকে জড়াবেন না।” লেখাটা দেখে বুঝা যাচ্ছে মাত্রই লেখা হয়েছে।
পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে গাছটার এবং মাটিতে পড়ে থাকা রক্তের কিছু ছবিও তুলে নিলাম। ছবি তুলে পকেটে মোবাইলটা রাখতেই আমার বাড়ির আলো জ্বলে উঠলো। বাহ দারুণ তো। আমার বাড়ির ফিউজ নিজে থেকেই ঠিক হয়ে গেলো। সেখানে দাড়িয়ে না থেকে এগিয়ে গেলাম বাড়ির দিকে। বাড়িতে এসেই আবারও অবাক হলাম। কারণ বাড়ির সব গুলো লাইট জ্বলছে। কিন্তু আমি তো সব গুলো লাইট অন করে রাখিনি।
উফফ! কিছু বুঝে উঠতে পারছি না। আমার সাথে হচ্ছেটা কি! আর কেই বা নিখুঁত ভাবে এসব ঘটাচ্ছে! ভাবনায় তলিয়ে যাচ্ছি। আর তখনই আবার পুরো ঘরের লাইট অফ হয়ে গেলো। সাথে জানালা-দরজা সব খুলে গেলো। পুরো ঘরে শীতল বাসাত বইতে শুরু করলো। আমি কখনো ভয় পাই নি। কিন্তু এখন অনুভব করছি আমার বুকের ধুকধুক আগের থেকে বেড়ে গেছে।
হঠাৎ লাইট গুলো জ্বলতে নিভতে শুরু করে। আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি জানালার কাঁচ গুলো কাপছে। হাতের টর্চটা জ্বালানোর চেষ্টা করলাম। অদ্ভুত! এখন আবার টর্চটা জ্বলছে না। আর জ্বলছে না বাড়ির কোনো লাইট। আর দাড়িয়ে না থেকে অনুমানের উপর এগিয়ে গেলাম বাড়ির উপরের আমার সিক্রেট রুমে। সিড়ি বেয়ে উপরে উঠার সময় দেখলাম দরজা আর জানালা সব আবার নিজ থেকেই বন্ধ হয়ে গেছে। আর পাশের স্বতিস বাবুর বাড়ি থেকে একটা মেয়ে কন্ঠের কান্নার শব্দ আসছে।কান্নার শব্দ কানে আসতেই আমার মনে হলো,
আরে স্বতিস বাবুর সাথে তো কয়েকদিন ধরে দেখা হচ্ছে না। আমি আর স্বতিস বাবু একই সংস্থায় কাজ করি। সে সুবাদে সংস্থা থেকেই পাশাপাশি বাড়ি দিয়েছে। আর আমরা দু’জন একই পদবিতে আছি। কিন্তু হঠাৎ স্বতিস বাবু কোথায় হারালো! তাছাড়া স্বতিস বাবু বাড়ি থেকে কান্নার শব্দ আসছে মানে ওনার স্ত্রীই কান্না করছে। ব্যাপারটা বুঝতে পারছি না বলে পকেট থেকে ফোনটা বের করে কল দিলাম স্বতিস বাবু কে…
” হ্যালো স্বতিস বাবু! আপনি কোথায়?” ফোন রিছিভ করতেই আমি ওনাকে প্রশ্ন করলাম। স্বতিস বাবু কিছুক্ষণ চুপ থেকে অনেকটা ভয়ার্থ কণ্ঠে বললেন…
“রাজ সাহেব, আমি তো একটু গ্রামের বাড়িতে এসেছি। তবে চিন্তা করবেন না। চলে আসবে কিছুদিনের মধ্যেই। আর হ্যাঁ! রাজ সাহেব আপনি কষ্ট করে মেজর জেনারেল স্যার কে একটু বলে দিয়েন।” কতোটুকু বলেই স্বতিস বাবু ফোন কেটে দিলেন। কিন্তু আমার তো আরো কিছু বলার ছিলো। তাই আবার স্বতিস বাবুকে কল দিলাম। কিন্তু দ্বিতীয় বার কল দিয়ে অনেকটাই অবাক হলাম। কারণ, স্বতিস বাবুর ফোন অফ। গ্রামের দিকে নেটওয়ার্ক এর অবস্থা ভালো থাকে না। তাই আরো দুবার কল দিলাম। কিন্তু ফলাফল একি। ফোন বন্ধ। কিন্তু এতো দ্রুত তিনি ফোন বন্ধ করে দিলেন কেন! হঠাৎ ভাবনার ঘোর ভাঙলো স্বতিস বাবুর বাড়ি থেকে আসা সেই কান্নার শব্দটায়। কিন্তু এখন আর কান্নার শব্দ না। এখন মনে হচ্ছে কেউ মৃদুস্বরে কান্নারত কন্ঠে গুনগুনিয়ে গান গাইছে…
“তুমি শান্তিচুক্তির নামে,
বার বার এসেছো আমার আছে।
আমি অতীতে করেছি ক্ষমা,
কিন্তু করবো না আর আসো যদি পরে।
তুমি বিশ্বাস নিয়ে করেছো খেলা,
আঘাত দিলে অন্তর মধ্যভাগে।
আমি অতীতে নীরব ছিলাম,
কিন্তু এখন এসেছি প্রতিশোধ নিতে।
তাই যাচ্ছি না চলে ক্ষমা করেই তোমায়।
আমার সমাধী করলে না তুমি সমাপ্ত।
তাই রয়ে গেছি প্রতিশোধ নিতে,
হয়ে না হয় অভিশপ্ত।”
স্বতিস বাবুর বাড়িতে কি হচ্ছে! নাহ, ব্যাপারটা একটু খতিয়ে দেখা দরকার। কিন্তু এখন ওনার বাড়ি যাই কি করে!তখনই মাথায় নতুন আইডিয়া আসলো। তাই সিক্রেট রুমের ভিতরে যাওয়ার জন্য সিক্রেট রুমের সামনে ঝুলন্ত সাইকেল টি উপর থেকে নিচে টান দিলাম। আর সাথে সাথে রুমের দরজার সামনের প্যান্টিং কার্ড টি সড়ে গেলো। তারপর রুমের দরজা খুলে ঢুকে 9mm পিস্তলটা রেখে দিলাম। রুমের চেয়ারে বসে মনিটর চেক করতে লাগলাম। বাড়ির সব সিসিটিভি ক্যামেরা ঠিক আছে কি না! কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার! রাত ৯ টা থেকে ১০:২১ পর্যন্ত সিসিটিভি ক্যামেরায় কোনো ফুটেজ রেকর্ড হয়নি! সব গায়েব কিন্তু লোডশেডিং হলে একদমই সমস্যা নেই। আমার তো ইন্সটেন্ট পাওয়ার সাপ্লাই (IPS) আছে। যেটার সাহায্যে আমার ফুটেজ রেকর্ড হওয়ার কথা।
এবার আর চুপ করে বসে থাকা সম্ভব নয়। কোনো কিছুই স্বাভাবিক নেই। আমার বর্তমানে এতো কিছু হয়ে গেলো কিন্তু কিছুই টের পেলাম না! তাই সিক্রেট রুমের বাম পাশে আমার Armory (অস্ত্রাগার) কক্ষে প্রবেশ করে SMG (Short Machine Gun) আর LMG (Light Machine Gun) চেক করতেছি। তারপর সেখান থেকে SMG এর মধ্যে PDW অস্ত্রটি হাতে নিলাম। PDW এর একটি রেড ডোট এবং একটি সাইলেন্সার আর একটি স্মুথ গ্রিফ্ট লাগিয়ে নিলাম।
তারপর সিক্রেট রুম থেকে বেরিয়ে সোজা স্বতিস বাবুর বাড়ির দিকে এগিয়ে গেলাম। স্বতিস বাবুর বাড়ির সামনে এসেই দেখলাম বাড়ির মূল গেইট তালা মারা। তাই পাশ দিয়ে দেয়াল টপকিয়ে বাড়ির আঙ্গিনায় দাঁড়িয়ে রইলাম। ভাবছি যদি মেইন গেইট অফ থাকে তাহলে তো বাড়ির দরজাও অফ থাকবে। এটা ভাবেই স্বতিস বাবুর বাড়ির দরজার দিকে এগিয়ে গেলাম। দরজার কাছে আসতেই নুপুর পায়ে দৌড়াদৌড়ি করার শব্দ পেলাম। ব্যাপারটা ভালো ঠেকলো না। স্বতিস বাবুকে জানানো দরকার। কোনো জঠিল ব্যাপার তো আছেই। তাই পকেট থেকে ফোনটা বের করে আবার স্বতিস বাবুকে ফোন দিলাম। কিন্তু এখনো স্বতিস বাবুর ফোন অফ। কল যাচ্ছে না। ফোন পকেটে রাখতে না রাখতেই মাথার পিছন দিকে তীব্র ব্যথা অনুভব করলাম। আহ্! সাথে সাথে চোখে অন্ধকার নেমে এলো। মাটিতে লুটিয়ে পড়লাম। মাটিতে পড়েই ঝাপসা চোখে মানুষের একটা ছায়া দেখলাম।





















