ফরিদপুরে স্বাস্থ্য সহকারী নিয়োগে বিতর্ক: যোগদান করতে এসে ফিরলেন রাজিব হোসেন
- আপডেট সময় : ১১:৩৭:৪৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ জুন ২০২৫
- / 563
ফরিদপুর সিভিল সার্জনের কার্যালয়ে স্বাস্থ্য সহকারী হিসেবে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হয়েছিলেন রাজিব হোসেন। তবে যোগদানের দিনে তাকে ডেকে নিয়ে ‘চাকরি হবে না’ বলে জানিয়ে দেন সিভিল সার্জন ডা. মাহামুদুল হাসান। এমনকি তাকে আশ্বস্ত করে বলেন, “তুমি এর চেয়ে ভালো কিছু পাবে।”
রাজিব হোসেন জানান, চূড়ান্ত ফলাফলের ভিত্তিতে তাকে নিয়োগপত্র দেওয়ার কথা থাকলেও, কোনো কারণ ছাড়াই তার নামের পাশে “ফলাফল স্থগিত” বলে একটি নোটিশ ঝুলিয়ে দেওয়া হয়।
রাজিব হোসেনের পটভূমি ও সংগ্রাম
রাজিব হোসেন ফরিদপুর সদর উপজেলার পদ্মা নদীবেষ্টিত নর্থচ্যানেল ইউনিয়নের মোহাম্মাদ মাতুব্বরের ডাঙ্গীর বাসিন্দা এবং কৃষক সোহরাব জমাদ্দারের ছেলে। তিনি রাজেন্দ্র কলেজ থেকে বাংলা বিভাগে ২০১৮ সালে অনার্স এবং ২০১৯ সালে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। পাশাপাশি এক চিকিৎসকের সহকারী হিসেবে কাজ করে অল্প আয়ে স্ত্রী, সন্তান ও বাবা-মায়ের খরচ চালান।
স্বপ্ন ছিল সরকারি চাকরিতে যুক্ত হয়ে পরিবারের আর্থিক অবস্থা পরিবর্তন করার। তাই তিনি আবেদন করেন ২০২৩ সালের ২৫ মার্চ প্রকাশিত স্বাস্থ্য সহকারী নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে।
চূড়ান্ত ফলাফলে নির্বাচিত, তারপরও বাধা
গত ২৩ মে রাজিব লিখিত পরীক্ষায় এবং ২৬ মে মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ২৯ মে চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশিত হয়, যেখানে সাবেক ১ নম্বর ওয়ার্ডের চূড়ান্ত প্রার্থী হিসেবে তার নাম প্রকাশ করা হয়। ১ জুন রাজিবকে এসএমএস-এর মাধ্যমে যোগদানের আহ্বান জানানো হয়।
তবে যোগদানের দিনে সিভিল সার্জনের কক্ষে ডেকে নিয়ে তাকে জানানো হয়, “চাকরিটা হবে না।” রাজিব বলেন, “আমি কারণ জানতে চাইলে বলেন, ‘আমরা যেকোনো সময় ফলাফল পরিবর্তন করতে পারি।’ এরপর বলেন, ‘তুমি ভাল কিছু পাবে।’”
আইনি পদক্ষেপের হুমকি ও সিভিল সার্জনের অবস্থান
রাজিব জানান, তিনি কক্ষে ফিরে গিয়ে বলেন, “স্যার, আমি আইনানুগ ব্যবস্থা নেব।” তখন সিভিল সার্জন বলেন, “তোমার ইউনিয়নে দ্বিতীয় হওয়ায় পাশের ওয়ার্ডে তোমাকে রাখা হয়েছিল, কিন্তু সেখানে একজন পঞ্চম স্থানে থাকলেও তাকেই নেওয়া হবে।”
এই ঘটনার পর রাজিব কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “আমার চাকরির বয়স শেষ। টাকা না থাকায় কি আমার চাকরিটা হবে না?”
তিনি জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগও জমা দিয়েছেন।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধির প্রতিক্রিয়া ও জনমতের চাপ
নর্থ চ্যানেল ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. জুনায়েদ হোসেন বলেন, “আমার স্ত্রী পরীক্ষায় অংশ নিলেও উত্তীর্ণ হয়নি। কিন্তু রাজিব হোসেনের নিয়োগ প্রক্রিয়া ছিল স্বচ্ছ। তাকে যোগদান করতে এসএমএস পাঠানো হয়েছিল। এরপরও তাকে বাধা দেওয়া হয়েছে। এটা খুবই দুঃখজনক।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, “মনে হচ্ছে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে অন্য কাউকে সুযোগ দেওয়া হয়েছে।”
সিভিল সার্জনের ব্যাখ্যা ও নিয়মবিধির বিপরীত বক্তব্য
সিভিল সার্জন ডা. মাহামুদুল হাসান বলেন, “যা কিছু হয়েছে, নিয়ম অনুযায়ী হয়েছে। রাজিব ৩ নম্বর ওয়ার্ডের হলেও ভুলক্রমে ১ নম্বর ওয়ার্ডে নিয়োগ দেখানো হয়। প্রকৃতপক্ষে পার্শ্ববর্তী ওয়ার্ড বলতে ২ নম্বর হওয়ার কথা ছিল।”
তবে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির শর্তে বলা আছে, সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডে যোগ্য প্রার্থী না পেলে একই ইউনিয়নের অন্য ওয়ার্ডের প্রার্থী বিবেচনা করা যাবে—সেখানে ‘পার্শ্ববর্তী’ শব্দের উল্লেখ নেই।
সমাজের প্রতিক্রিয়া ও রাজিবের দাবি
এই ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, রাজিব হোসেনের সঙ্গে অবিচার করা হয়েছে এবং দুর্নীতির আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
রাজিবের স্পষ্ট দাবি, “আমার চাকরি ফিরিয়ে দিন, না হলে পুরো নিয়োগ বাতিল করুন।”











