ঢাকা ০৫:০০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬, ১৮ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রক্তের পেয়ালায় দোসরসমেত নিয়াজির শেষ চুমুক

হারুন আনসারী
  • আপডেট সময় : ০৪:৫৬:৪৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ২০ ডিসেম্বর ২০২৩
  • / 808

মুক্তিযুদ্ধের শেষ কয়েকদিনে ঢাকার পরিস্থিতি কেমন ছিলো তা জানিয়েছেন বিবিসির সংবাদদাতা অ্যালান হার্ট। সেসময় তিনি অন্যান্য বিদেশি সাংবাদিকদের সাথে ঢাকায় অবস্থান করছিলেন।

হোটেল কন্টিনেন্টালের নিরাপদ বেষ্টনীতে আটকে পড়া এই বিদেশি সাংবাদিক সামরিক প্রশাসকের নির্দেশনা অনুযায়ী বাইরে যেতে পারতেন না। তিনি সেখানে থেকেই ভিডিও ধারণ করে যথাসাধ্য চেষ্টা করেন পরিস্থিতি তুলে ধরার। তার বর্ণনাতে রয়েছে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হত্যার তথ্যও।

মুক্তিযুদ্ধকালে ঢাকার বুকে হানাদার ও তাদের দোসরদের সবচেয়ে কাপুরুষোচিত ঘটনা ছিল বুদ্ধিজীবী হত্যাযজ্ঞ। যুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি নিরীহ নারী-পুরুষদেরও হত্যা করা হয়েছে। আর পরাজয় আঁচ করতে পেরে পূর্বাঞ্চলের রণাঙ্গনের সামরিক কমান্ডার জেনারেল নিয়াজি ঢাকায় অবস্থানরত স্বাধীন বাংলাদেশের নেতা হতে পারেন এমন সম্ভাব্য ব্যক্তিদের রাতের আধারে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে চোখ বেঁধে নৃশংসভাবে হত্যার মিশন বাস্তবায়ন করেন। ২৫ মার্চের কালোরাতের পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকাশ্যে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে ছাত্র-শিক্ষকদের হত্যা করা হয়।

সে বর্ণনাও উঠে আসে লন্ডনের দ্য টেলিগ্রাফের সাংবাদিক সাইমন ড্রিং এর প্রতিবেদনে। মার্চের শুরুতে তাকে ঢাকা পাঠানো হয় তার পত্রিকার অফিস থেকে। ২৫ মার্চের কালোরাতে তিনি আটকা পড়েন হোটেলে। একদিন পর কারফিউ শিথিল হলে তিনি প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে ২৭ মার্চ সকালে হোটেলের কর্মচারীদের সহযোগিতায় ছোট্ট একটি মোটরভ্যানে করে ঘুরে দেখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হল, রাজারবাগ পুলিশ ব্যারাক ও পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকা। এরপর ৩০ মার্চ লন্ডনের ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় সেটা ছাপা হয় ‘ট্যাংকস ক্র্যাশ রিভল্ট ইন পাকিস্তান’ শিরোনামে তার বিখ্যাত প্রতিবেদনটি।

এভাবে যুদ্ধের শুরুতে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বেছে নেয়ার পর শেষাবধি দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীদের হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে এটি প্রমাণিত হয়েছে যে, মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকেই পাকিস্তান বাহিনীর টার্গেটে ছিলেন এদেশের এইসব মেধাবী ও শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবীরা যারা দেশ পরিচালনায় নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতা রাখতেন।

এসব নৃশংসতা পরবর্তী প্রজন্ম সরাসরি প্রত্যক্ষ করিনি বলেই হয়তো এই গণহত্যার ভয়াবহ ক্ষতির তীব্রতা অনুমান করতে পারি না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই দুঃসহ ক্ষতির রেশ আজও বয়ে চলেছি আমরা।

অ্যালান হার্ট দেখান, হানাদার বাহিনীকে পরাস্ত করতে ৪ ডিসেম্বর ঢাকার বিমানবন্দরে ভারতীয় মিত্র বাহিনী বোমা বর্ষণের মাধ্যমে রাজধানী কব্জার চেষ্টা শুরু করে। এতে অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়। একটি এতিমখানায় বিমান থেকে ভারতীয় পাইলটের বোমা বর্ষণে বেসামরিক লোকজন নিহত হন। এসব ঘটনায় আরো রক্তাক্ত হয়ে উঠে ঢাকার মাটি। আবার ব্রিটিশ বিমান সেদেশের নাগরিকদের ফেরত নেয়ার যে প্রচেষ্টা শুরু করে তাও ব্যহত হয় এতে। যদিও শেষ পর্যন্ত রানওয়েতে পড়ে থাকা বোমার ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে ব্রিটেন থেকে আসা একটি বিমান চারশ’ যাত্রী নিয়ে ফেরত যেতে সক্ষম হয়।

এদিকে স্থলপথে মিত্র বাহিনী রওনা হয় ঢাকা অভিমুখে। মূলত তারপর থেকেই যুদ্ধের পরিণতি কি হতে যাচ্ছে তা অনেকে অনুমান করতে পারেন। সেটি জেনেই হানাদার বাহিনী মরণ কামড় বসায় বাংলাদেশের মাটিতে।

এই সময়ে ঢাকা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে হত্যাযজ্ঞ চলতে থাকে। ৯ ডিসেম্বর ফরিদপুরের করিমপুরে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধ যুদ্ধের সময় শহিদ হন কাজী সালাউদ্দিন ও মেজবাহউদ্দিন নৌফেলসহ তার সাথী মুক্তিযোদ্ধারা। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের আশ্রয় দানকারী নিরীহ গ্রামবাসীকে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের ভয়ঙ্কর ও বেদনাহত ইতিহাস এসব।

বিবিসির ঐ সাংবাদিক জানান, ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের শেষদিকে ডিসেম্বরের শুরু থেকেই দিনদিন পরিস্থিতির অবনতি হতে থাকে। একপর্যায়ে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় রেডক্রসের মাধ্যমে হোটেল কন্টিনেন্টালকে যুদ্ধমুক্ত অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ঢাকাস্থ বিদেশি নাগরিকেরা সবাই সেখানে আশ্রয় নেয়। তার আগে সেখানে অল্পকিছু বিদেশি নাগরিকের সঙ্গে মূলত: যুদ্ধের নিউজ কাভার করতে আসা বিদেশি সাংবাদিকেরাই অবস্থান করছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে হোটেল কন্টিনেন্টালে সাংবাদিকেরা জেনারেল নিয়াজিকে একাধিকবার মিত্র বাহিনীর ঢাকায় আসার বার্তা স্মরণ করিয়ে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার শক্তি ও সেনা রয়েছে কিনা জিজ্ঞেস করেন। কিন্ত তথ্যভিত্তিক জবাবের বদলে নিয়াজি ধুর্ততার সঙ্গে প্রশ্ন এড়িয়ে যান। তাকে জিজ্ঞেস করা হয় আত্মসমর্পণ করবেন কিনা? জবাবে বিস্মিত নয়নে আমৃত্যু লড়াই করবেন বলে দম্ভোক্তি করতে থাকেন। তিনি বিবিসিকে ব্রাক্ষণ ব্রডকাস্টিং সেন্টার বলেও তাচ্ছিল্য করেন।

বিবিসির ঐ সাংবাদিক অ্যালান হার্ট জানান, ১৫ ডিসেম্বর দুপুরে জেনারেল নিয়াজি জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় আত্মসমর্পণে রাজি হওয়ার কথা জানান। নিয়াজি দাবি করেন, তার আগেরদিন বিকেলে তিনি গভর্নরের নিকট থেকে এই সম্মতি জানতে পেরেছেন। এক প্রশ্নের উত্তরে নিয়াজি জানান, প্রেসিডেন্ট থেকে গভর্নরের কাছে তারপর গভর্নরের নিকট থেকে সামরিক প্রশাসক হিসেবে তার কাছে বার্তা পাঠানো হয়। ফলে তিনি নিজে আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত জানাতে পারেন না বলে কালক্ষেপণ করতে থাকেন। তার দাবি ছিল, যোগাযোগ নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়ায় করাচির সঙ্গে তাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

শেষ পর্যায়ে দেখা গেলো, কালবিলম্বের এই সময়টি ছিল তাদের সেই মুহূর্ত যখন তারা বাঙালির নেতৃস্থানীয়দের খতমের নীলনকশা বাস্তবায়ন করে রক্তের পেয়ালায় শেষ চুমুক দিচ্ছিল।

১৯৭১ সালে নয় মাস বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতা আড়ালে রাখতে সম্ভাব্য সব ধরনের চেষ্টাই করেছিল পাকিস্তান সামরিক জান্তা। তারা বিদেশি সংবাদমাধ্যমদেরও স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেয়নি। তাদের হোটেল ছেড়ে বাইরে বেরুতে দেওয়া হতো না। তারপরেও জীবন বাজি রেখে অনেক বিদেশি সাংবাদিক মুক্তিযুদ্ধকালীন পরিস্থিতির সংবাদ সংগ্রহ করেছিলেন। সেগুলো প্রকাশ করেছিলেন বিভিন্ন গণমাধ্যমে।

একাত্তরের ১৩ জুন সানডে টাইমস ‘জেনোসাইড’ শিরোনামে দুই পৃষ্ঠাজুড়ে একটি প্রতিবেদনটি ছাপে। করাচির মর্নিং নিউজের সাংবাদিক ও ব্রিটেনের সানডে টাইমস পত্রিকার সংবাদদাতা অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তার ঐ প্রতিবেদনে লেখেন ‘পূর্ব বাংলার শ্যামল প্রান্তরজুড়ে আমি আমার প্রথম চাহনিতেই জমাট রক্তপুঞ্জের দাগ দেখতে পেয়েছিলাম। এই সংঘবদ্ধ নিপীড়নের শিকার কেবল হিন্দুরাই নয়, হাজার হাজার বাঙালি মুসলমানও এ নির্মমতার শিকার।’

কিছু স্থির চিত্র ও বিদেশি সাংবাদিকদের অল্পকিছু ভিডিও ডকুমেন্টারি ব্যতিত মুক্তিযুদ্ধকালের বেশিরভাগ ইতিহাস আমাদের জানা হয়েছে বই-পুস্তক কিংবা পত্রপত্রিকা পড়ে। প্রবীণদের মুখে যেসব শুনেছি তার বেশিরভাগই খণ্ডিত। আবার অনেকেই নিজ নিজ অবস্থান থেকে তাদের স্মৃতির বর্ণনা করেছেন যা সবটুকু তুলে ধরতে পারেনি।

হয়তো এজন্য মুক্তিযুদ্ধোত্তোর পরবর্তী প্রজন্মের একটি অংশ ৭১ সালে পাকিস্তান বাহিনী ও তাদের দোসরদের নৃশংসতার সঠিক চিত্র উপলব্ধি করতে পারিনি।

যার বাস্তব চিত্র ছিল অনেক ভয়াবহ ও কষ্টের। পাকসেনাদের হাতে অসংখ্য মানুষ শহিদ হয়েছেন, অগণিত মা-বোনের সম্ভ্রমহানি হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সেই ভয়াল স্মৃতি অনেক বেদনার।

জীবনবাজি রেখে এদেশের ভুখা নাঙা মানুষ যুদ্ধে গেছে। যুদ্ধ শেষে ফিরে এসে অনেকেই তাদের প্রিয়জনদের দেখা পায়নি। যার প্রকৃত চিত্র আমাদের অনেকের কাছে আজও অজানা।

মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের মিত্র বাহিনীর সহযোগিতা এবং সেদেশে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত হয়ে প্রশিক্ষণ ব্যতিত আমাদের বিজয় অর্জন বিলম্বিত হতো। এতে আরো অনেক বেশি রক্ত ক্ষয় হতো। এজন্য মহান মুক্তিযুদ্ধের মিত্র দেশ ভারতের প্রতি স্বাধীন বাংলাদেশের কৃতজ্ঞতা রয়ে গেছে। যদিও বর্তমান সময়ের নিরিখে হিসেব-নিকেশ আগের মতো নেই। বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশ হিসেবে ভারত আমাদের সমপর্যায়ের বন্ধুরাষ্ট্র মনে করে না। যেই স্থান তারা চির শত্রু পাকিস্তানকে দিতে প্রস্তুত সেটি বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য বলে তারা মনে করে না। এ আরেক বিতর্ক।

তবু অনস্বীকার্য হলো, ভারতের হস্তক্ষেপেই ১৬ ডিসেম্বর আমাদের বিজয় অর্জিত হয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশে পাকিস্তানিরা রেখে গেছে ঘৃণা আর রক্তের দাগ। এই ইতিহাস বিস্মৃত হওয়া মানে বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে অস্বীকার করা। নির্মম সত্য এটাই। বাংলাদেশ আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি। আমরা যেন আমাদের প্রিয় মাতৃভূমির সেই প্রসবকালীন ভয়ঙ্কর যন্ত্রণা ভুলে না যাই।

ট্যাগস :

রক্তের পেয়ালায় দোসরসমেত নিয়াজির শেষ চুমুক

আপডেট সময় : ০৪:৫৬:৪৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ২০ ডিসেম্বর ২০২৩

মুক্তিযুদ্ধের শেষ কয়েকদিনে ঢাকার পরিস্থিতি কেমন ছিলো তা জানিয়েছেন বিবিসির সংবাদদাতা অ্যালান হার্ট। সেসময় তিনি অন্যান্য বিদেশি সাংবাদিকদের সাথে ঢাকায় অবস্থান করছিলেন।

হোটেল কন্টিনেন্টালের নিরাপদ বেষ্টনীতে আটকে পড়া এই বিদেশি সাংবাদিক সামরিক প্রশাসকের নির্দেশনা অনুযায়ী বাইরে যেতে পারতেন না। তিনি সেখানে থেকেই ভিডিও ধারণ করে যথাসাধ্য চেষ্টা করেন পরিস্থিতি তুলে ধরার। তার বর্ণনাতে রয়েছে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হত্যার তথ্যও।

মুক্তিযুদ্ধকালে ঢাকার বুকে হানাদার ও তাদের দোসরদের সবচেয়ে কাপুরুষোচিত ঘটনা ছিল বুদ্ধিজীবী হত্যাযজ্ঞ। যুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি নিরীহ নারী-পুরুষদেরও হত্যা করা হয়েছে। আর পরাজয় আঁচ করতে পেরে পূর্বাঞ্চলের রণাঙ্গনের সামরিক কমান্ডার জেনারেল নিয়াজি ঢাকায় অবস্থানরত স্বাধীন বাংলাদেশের নেতা হতে পারেন এমন সম্ভাব্য ব্যক্তিদের রাতের আধারে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে চোখ বেঁধে নৃশংসভাবে হত্যার মিশন বাস্তবায়ন করেন। ২৫ মার্চের কালোরাতের পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকাশ্যে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে ছাত্র-শিক্ষকদের হত্যা করা হয়।

সে বর্ণনাও উঠে আসে লন্ডনের দ্য টেলিগ্রাফের সাংবাদিক সাইমন ড্রিং এর প্রতিবেদনে। মার্চের শুরুতে তাকে ঢাকা পাঠানো হয় তার পত্রিকার অফিস থেকে। ২৫ মার্চের কালোরাতে তিনি আটকা পড়েন হোটেলে। একদিন পর কারফিউ শিথিল হলে তিনি প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে ২৭ মার্চ সকালে হোটেলের কর্মচারীদের সহযোগিতায় ছোট্ট একটি মোটরভ্যানে করে ঘুরে দেখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হল, রাজারবাগ পুলিশ ব্যারাক ও পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকা। এরপর ৩০ মার্চ লন্ডনের ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় সেটা ছাপা হয় ‘ট্যাংকস ক্র্যাশ রিভল্ট ইন পাকিস্তান’ শিরোনামে তার বিখ্যাত প্রতিবেদনটি।

এভাবে যুদ্ধের শুরুতে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বেছে নেয়ার পর শেষাবধি দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীদের হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে এটি প্রমাণিত হয়েছে যে, মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকেই পাকিস্তান বাহিনীর টার্গেটে ছিলেন এদেশের এইসব মেধাবী ও শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবীরা যারা দেশ পরিচালনায় নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতা রাখতেন।

এসব নৃশংসতা পরবর্তী প্রজন্ম সরাসরি প্রত্যক্ষ করিনি বলেই হয়তো এই গণহত্যার ভয়াবহ ক্ষতির তীব্রতা অনুমান করতে পারি না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই দুঃসহ ক্ষতির রেশ আজও বয়ে চলেছি আমরা।

অ্যালান হার্ট দেখান, হানাদার বাহিনীকে পরাস্ত করতে ৪ ডিসেম্বর ঢাকার বিমানবন্দরে ভারতীয় মিত্র বাহিনী বোমা বর্ষণের মাধ্যমে রাজধানী কব্জার চেষ্টা শুরু করে। এতে অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়। একটি এতিমখানায় বিমান থেকে ভারতীয় পাইলটের বোমা বর্ষণে বেসামরিক লোকজন নিহত হন। এসব ঘটনায় আরো রক্তাক্ত হয়ে উঠে ঢাকার মাটি। আবার ব্রিটিশ বিমান সেদেশের নাগরিকদের ফেরত নেয়ার যে প্রচেষ্টা শুরু করে তাও ব্যহত হয় এতে। যদিও শেষ পর্যন্ত রানওয়েতে পড়ে থাকা বোমার ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে ব্রিটেন থেকে আসা একটি বিমান চারশ’ যাত্রী নিয়ে ফেরত যেতে সক্ষম হয়।

এদিকে স্থলপথে মিত্র বাহিনী রওনা হয় ঢাকা অভিমুখে। মূলত তারপর থেকেই যুদ্ধের পরিণতি কি হতে যাচ্ছে তা অনেকে অনুমান করতে পারেন। সেটি জেনেই হানাদার বাহিনী মরণ কামড় বসায় বাংলাদেশের মাটিতে।

এই সময়ে ঢাকা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে হত্যাযজ্ঞ চলতে থাকে। ৯ ডিসেম্বর ফরিদপুরের করিমপুরে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধ যুদ্ধের সময় শহিদ হন কাজী সালাউদ্দিন ও মেজবাহউদ্দিন নৌফেলসহ তার সাথী মুক্তিযোদ্ধারা। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের আশ্রয় দানকারী নিরীহ গ্রামবাসীকে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের ভয়ঙ্কর ও বেদনাহত ইতিহাস এসব।

বিবিসির ঐ সাংবাদিক জানান, ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের শেষদিকে ডিসেম্বরের শুরু থেকেই দিনদিন পরিস্থিতির অবনতি হতে থাকে। একপর্যায়ে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় রেডক্রসের মাধ্যমে হোটেল কন্টিনেন্টালকে যুদ্ধমুক্ত অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ঢাকাস্থ বিদেশি নাগরিকেরা সবাই সেখানে আশ্রয় নেয়। তার আগে সেখানে অল্পকিছু বিদেশি নাগরিকের সঙ্গে মূলত: যুদ্ধের নিউজ কাভার করতে আসা বিদেশি সাংবাদিকেরাই অবস্থান করছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে হোটেল কন্টিনেন্টালে সাংবাদিকেরা জেনারেল নিয়াজিকে একাধিকবার মিত্র বাহিনীর ঢাকায় আসার বার্তা স্মরণ করিয়ে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার শক্তি ও সেনা রয়েছে কিনা জিজ্ঞেস করেন। কিন্ত তথ্যভিত্তিক জবাবের বদলে নিয়াজি ধুর্ততার সঙ্গে প্রশ্ন এড়িয়ে যান। তাকে জিজ্ঞেস করা হয় আত্মসমর্পণ করবেন কিনা? জবাবে বিস্মিত নয়নে আমৃত্যু লড়াই করবেন বলে দম্ভোক্তি করতে থাকেন। তিনি বিবিসিকে ব্রাক্ষণ ব্রডকাস্টিং সেন্টার বলেও তাচ্ছিল্য করেন।

বিবিসির ঐ সাংবাদিক অ্যালান হার্ট জানান, ১৫ ডিসেম্বর দুপুরে জেনারেল নিয়াজি জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় আত্মসমর্পণে রাজি হওয়ার কথা জানান। নিয়াজি দাবি করেন, তার আগেরদিন বিকেলে তিনি গভর্নরের নিকট থেকে এই সম্মতি জানতে পেরেছেন। এক প্রশ্নের উত্তরে নিয়াজি জানান, প্রেসিডেন্ট থেকে গভর্নরের কাছে তারপর গভর্নরের নিকট থেকে সামরিক প্রশাসক হিসেবে তার কাছে বার্তা পাঠানো হয়। ফলে তিনি নিজে আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত জানাতে পারেন না বলে কালক্ষেপণ করতে থাকেন। তার দাবি ছিল, যোগাযোগ নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়ায় করাচির সঙ্গে তাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

শেষ পর্যায়ে দেখা গেলো, কালবিলম্বের এই সময়টি ছিল তাদের সেই মুহূর্ত যখন তারা বাঙালির নেতৃস্থানীয়দের খতমের নীলনকশা বাস্তবায়ন করে রক্তের পেয়ালায় শেষ চুমুক দিচ্ছিল।

১৯৭১ সালে নয় মাস বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতা আড়ালে রাখতে সম্ভাব্য সব ধরনের চেষ্টাই করেছিল পাকিস্তান সামরিক জান্তা। তারা বিদেশি সংবাদমাধ্যমদেরও স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেয়নি। তাদের হোটেল ছেড়ে বাইরে বেরুতে দেওয়া হতো না। তারপরেও জীবন বাজি রেখে অনেক বিদেশি সাংবাদিক মুক্তিযুদ্ধকালীন পরিস্থিতির সংবাদ সংগ্রহ করেছিলেন। সেগুলো প্রকাশ করেছিলেন বিভিন্ন গণমাধ্যমে।

একাত্তরের ১৩ জুন সানডে টাইমস ‘জেনোসাইড’ শিরোনামে দুই পৃষ্ঠাজুড়ে একটি প্রতিবেদনটি ছাপে। করাচির মর্নিং নিউজের সাংবাদিক ও ব্রিটেনের সানডে টাইমস পত্রিকার সংবাদদাতা অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তার ঐ প্রতিবেদনে লেখেন ‘পূর্ব বাংলার শ্যামল প্রান্তরজুড়ে আমি আমার প্রথম চাহনিতেই জমাট রক্তপুঞ্জের দাগ দেখতে পেয়েছিলাম। এই সংঘবদ্ধ নিপীড়নের শিকার কেবল হিন্দুরাই নয়, হাজার হাজার বাঙালি মুসলমানও এ নির্মমতার শিকার।’

কিছু স্থির চিত্র ও বিদেশি সাংবাদিকদের অল্পকিছু ভিডিও ডকুমেন্টারি ব্যতিত মুক্তিযুদ্ধকালের বেশিরভাগ ইতিহাস আমাদের জানা হয়েছে বই-পুস্তক কিংবা পত্রপত্রিকা পড়ে। প্রবীণদের মুখে যেসব শুনেছি তার বেশিরভাগই খণ্ডিত। আবার অনেকেই নিজ নিজ অবস্থান থেকে তাদের স্মৃতির বর্ণনা করেছেন যা সবটুকু তুলে ধরতে পারেনি।

হয়তো এজন্য মুক্তিযুদ্ধোত্তোর পরবর্তী প্রজন্মের একটি অংশ ৭১ সালে পাকিস্তান বাহিনী ও তাদের দোসরদের নৃশংসতার সঠিক চিত্র উপলব্ধি করতে পারিনি।

যার বাস্তব চিত্র ছিল অনেক ভয়াবহ ও কষ্টের। পাকসেনাদের হাতে অসংখ্য মানুষ শহিদ হয়েছেন, অগণিত মা-বোনের সম্ভ্রমহানি হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সেই ভয়াল স্মৃতি অনেক বেদনার।

জীবনবাজি রেখে এদেশের ভুখা নাঙা মানুষ যুদ্ধে গেছে। যুদ্ধ শেষে ফিরে এসে অনেকেই তাদের প্রিয়জনদের দেখা পায়নি। যার প্রকৃত চিত্র আমাদের অনেকের কাছে আজও অজানা।

মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের মিত্র বাহিনীর সহযোগিতা এবং সেদেশে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত হয়ে প্রশিক্ষণ ব্যতিত আমাদের বিজয় অর্জন বিলম্বিত হতো। এতে আরো অনেক বেশি রক্ত ক্ষয় হতো। এজন্য মহান মুক্তিযুদ্ধের মিত্র দেশ ভারতের প্রতি স্বাধীন বাংলাদেশের কৃতজ্ঞতা রয়ে গেছে। যদিও বর্তমান সময়ের নিরিখে হিসেব-নিকেশ আগের মতো নেই। বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশ হিসেবে ভারত আমাদের সমপর্যায়ের বন্ধুরাষ্ট্র মনে করে না। যেই স্থান তারা চির শত্রু পাকিস্তানকে দিতে প্রস্তুত সেটি বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য বলে তারা মনে করে না। এ আরেক বিতর্ক।

তবু অনস্বীকার্য হলো, ভারতের হস্তক্ষেপেই ১৬ ডিসেম্বর আমাদের বিজয় অর্জিত হয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশে পাকিস্তানিরা রেখে গেছে ঘৃণা আর রক্তের দাগ। এই ইতিহাস বিস্মৃত হওয়া মানে বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে অস্বীকার করা। নির্মম সত্য এটাই। বাংলাদেশ আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি। আমরা যেন আমাদের প্রিয় মাতৃভূমির সেই প্রসবকালীন ভয়ঙ্কর যন্ত্রণা ভুলে না যাই।