ঢাকা ০১:০৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ০২ মে ২০২৬, ১৯ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফরিদপুরের চরাঞ্চলে কৃষি বিপ্লব! রাসায়নিক বাদেই অবিশ্বাস্য উৎপাদন ও আয় বৃদ্ধি

দৈনিক জাগ্রত বাংলাদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ০৬:৫৮:৩৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ৮ ডিসেম্বর ২০২৫
  • / 379

ফরিদপুর সদর ও চরভদ্রাসন উপজেলার পদ্মা নদীতীরবর্তী চরাঞ্চলে টেকসই কৃষিপ্রযুক্তি এবং এগ্রো ইকোলজিক্যাল চাষ পদ্ধতি সম্প্রসারণের মাধ্যমে কৃষকদের জীবনে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা ‘আমরা কাজ করি (একেকে)’ এবং পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)-এর উদ্যোগে চালু হওয়া একটি প্রকল্পের সুবাদে উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে যথাসময়ে নিরাপদ সবজি বাজারে আনায় কৃষকদের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

এর ফলে চরাঞ্চলের কৃষকরা যেমন রাসায়নিক সার ও কীটনাশক নির্ভরতা কমিয়ে জৈব পদ্ধতিতে ফসল উৎপাদনে দক্ষ হচ্ছেন, তেমনি দেশের বাজারে নিরাপদ ও মানসম্মত সবজির সরবরাহ বাড়ছে।

চরাঞ্চলের অনিশ্চিত জীবন থেকে নতুন সম্ভাবনা

ডিক্রিরচর ও গাজীরটেক ইউনিয়ন দুটি প্রাকৃতিক চরাঞ্চল হওয়ায় প্রতিবছর বন্যা, ভাঙন ও দুর্বল অবকাঠামোর কারণে এখানকার কৃষি ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি ও বাজারজাতকরণ জ্ঞানের অভাবে স্থানীয় কৃষকরা পিছিয়ে ছিলেন।

উদ্যোগ: এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ২০২৪ সালের জুন মাসে ‘একেকে’, পিকেএসএফ, ইফাদ (IFAD) এবং ডানিডা (DANIDA)-এর সহযোগিতায় চালু করা হয় ‘চরাঞ্চলে এগ্রো ইকোলজিক্যাল ফার্মিং পদ্ধতিতে মিশ্র ও আন্তঃফসল চাষের মাধ্যমে নিরাপদ সবজি উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ’ শীর্ষক ভ্যালু চেইন উপপ্রকল্প।

প্রকল্পের সাফল্য ও কৃষকদের দক্ষতা উন্নয়ন

১৬ মাস আগে এক হাজার ১৫০ জন কৃষককে নিয়ে মাঠে কাজ শুরু হয়। প্রকল্পের প্রভাব কৃষকদের আয়, মাটির উর্বরতা ও বাজার সংযোগে স্পষ্ট হয়েছে।

প্রশিক্ষণ: কৃষকদের মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা, জৈব সার ও জৈব বালাইনাশক প্রস্তুত, এবং মিশ্র ও আন্তঃফসল চাষ পদ্ধতি বিষয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

সহযোগিতা: ১০০ জন কৃষকের মাটি পরীক্ষা করে উপযুক্ত ফসল নির্বাচন এবং সার প্রয়োগের পরামর্শ দেওয়া হয়।

অবকাঠামো: জৈব সার উৎপাদনে উৎসাহিত করতে ১৫টি কেঁচো সার প্লান্ট ও ছয়টি টাইকো কম্পোস্ট ইউনিট স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া, সেচের জন্য ছয়টি সোলার প্যানেলচালিত সেচ ব্যবস্থা ও ৪০টি ডিজেলচালিত পাম্প বসানো হয়েছে।

কৃষকরা এখন সফলভাবে জৈব ও এগ্রো ইকোলজিক্যাল পদ্ধতিতে কৃষি চর্চা করছেন। কিষানি রাহেলা বেগম বলেন, “আগে শুধু খরচ হতো, এখন আয় হচ্ছে। বাড়িতেই কেঁচো সার তৈরি করি, এতে মাটি উর্বর থাকে।” কৃষক সাগর মিয়া জানান, তিনি এখন কোকোপিটে সবজি চারা উৎপাদন করছেন, যা অন্যদের কাছে বিক্রি করে বাড়তি আয় করছেন।

আয় বৃদ্ধি ও উৎপাদন ব্যয় হ্রাস

প্রকল্পের কোঅর্ডিনেটর ফুয়াদ হোসেন জানান, এই প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষকদের মধ্যে মৌলিক পরিবর্তন এসেছে:

আয় বৃদ্ধি: প্রায় ৭০ শতাংশ কৃষকের আয় বৃদ্ধি পেয়েছে।

উৎপাদন বৃদ্ধি: ৪০ শতাংশ কৃষক ও উদ্যোক্তার সবজি উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তারা উচ্চমূল্যের সবজি উৎপাদনে দক্ষ হয়েছেন।

ব্যয় হ্রাস: সোলার সেচ, কম খরচে ডিজেল ইঞ্জিন এবং জৈব সার ব্যবহারের ফলে উৎপাদন ব্যয় ১৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

নিরাপদ বাজার: বর্তমানে পাঁচটি আউটলেট ও ভ্রাম্যমাণ বিক্রয়কেন্দ্রে জৈব সবজি বিক্রির মাধ্যমে বাজারে নিরাপদ সবজি বিক্রয় ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) উপব্যবস্থাপনা পরিচালক আকন্দ মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম মন্তব্য করেন, এটি একটি টেকসই উন্নয়নের দৃষ্টান্ত, যা দেশের অন্যান্য চরাঞ্চলেও সম্প্রসারণযোগ্য।

ফরিদপুরের চরাঞ্চলে কৃষি বিপ্লব! রাসায়নিক বাদেই অবিশ্বাস্য উৎপাদন ও আয় বৃদ্ধি

আপডেট সময় : ০৬:৫৮:৩৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ৮ ডিসেম্বর ২০২৫

ফরিদপুর সদর ও চরভদ্রাসন উপজেলার পদ্মা নদীতীরবর্তী চরাঞ্চলে টেকসই কৃষিপ্রযুক্তি এবং এগ্রো ইকোলজিক্যাল চাষ পদ্ধতি সম্প্রসারণের মাধ্যমে কৃষকদের জীবনে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা ‘আমরা কাজ করি (একেকে)’ এবং পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)-এর উদ্যোগে চালু হওয়া একটি প্রকল্পের সুবাদে উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে যথাসময়ে নিরাপদ সবজি বাজারে আনায় কৃষকদের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

এর ফলে চরাঞ্চলের কৃষকরা যেমন রাসায়নিক সার ও কীটনাশক নির্ভরতা কমিয়ে জৈব পদ্ধতিতে ফসল উৎপাদনে দক্ষ হচ্ছেন, তেমনি দেশের বাজারে নিরাপদ ও মানসম্মত সবজির সরবরাহ বাড়ছে।

চরাঞ্চলের অনিশ্চিত জীবন থেকে নতুন সম্ভাবনা

ডিক্রিরচর ও গাজীরটেক ইউনিয়ন দুটি প্রাকৃতিক চরাঞ্চল হওয়ায় প্রতিবছর বন্যা, ভাঙন ও দুর্বল অবকাঠামোর কারণে এখানকার কৃষি ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি ও বাজারজাতকরণ জ্ঞানের অভাবে স্থানীয় কৃষকরা পিছিয়ে ছিলেন।

উদ্যোগ: এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ২০২৪ সালের জুন মাসে ‘একেকে’, পিকেএসএফ, ইফাদ (IFAD) এবং ডানিডা (DANIDA)-এর সহযোগিতায় চালু করা হয় ‘চরাঞ্চলে এগ্রো ইকোলজিক্যাল ফার্মিং পদ্ধতিতে মিশ্র ও আন্তঃফসল চাষের মাধ্যমে নিরাপদ সবজি উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ’ শীর্ষক ভ্যালু চেইন উপপ্রকল্প।

প্রকল্পের সাফল্য ও কৃষকদের দক্ষতা উন্নয়ন

১৬ মাস আগে এক হাজার ১৫০ জন কৃষককে নিয়ে মাঠে কাজ শুরু হয়। প্রকল্পের প্রভাব কৃষকদের আয়, মাটির উর্বরতা ও বাজার সংযোগে স্পষ্ট হয়েছে।

প্রশিক্ষণ: কৃষকদের মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা, জৈব সার ও জৈব বালাইনাশক প্রস্তুত, এবং মিশ্র ও আন্তঃফসল চাষ পদ্ধতি বিষয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

সহযোগিতা: ১০০ জন কৃষকের মাটি পরীক্ষা করে উপযুক্ত ফসল নির্বাচন এবং সার প্রয়োগের পরামর্শ দেওয়া হয়।

অবকাঠামো: জৈব সার উৎপাদনে উৎসাহিত করতে ১৫টি কেঁচো সার প্লান্ট ও ছয়টি টাইকো কম্পোস্ট ইউনিট স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া, সেচের জন্য ছয়টি সোলার প্যানেলচালিত সেচ ব্যবস্থা ও ৪০টি ডিজেলচালিত পাম্প বসানো হয়েছে।

কৃষকরা এখন সফলভাবে জৈব ও এগ্রো ইকোলজিক্যাল পদ্ধতিতে কৃষি চর্চা করছেন। কিষানি রাহেলা বেগম বলেন, “আগে শুধু খরচ হতো, এখন আয় হচ্ছে। বাড়িতেই কেঁচো সার তৈরি করি, এতে মাটি উর্বর থাকে।” কৃষক সাগর মিয়া জানান, তিনি এখন কোকোপিটে সবজি চারা উৎপাদন করছেন, যা অন্যদের কাছে বিক্রি করে বাড়তি আয় করছেন।

আয় বৃদ্ধি ও উৎপাদন ব্যয় হ্রাস

প্রকল্পের কোঅর্ডিনেটর ফুয়াদ হোসেন জানান, এই প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষকদের মধ্যে মৌলিক পরিবর্তন এসেছে:

আয় বৃদ্ধি: প্রায় ৭০ শতাংশ কৃষকের আয় বৃদ্ধি পেয়েছে।

উৎপাদন বৃদ্ধি: ৪০ শতাংশ কৃষক ও উদ্যোক্তার সবজি উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তারা উচ্চমূল্যের সবজি উৎপাদনে দক্ষ হয়েছেন।

ব্যয় হ্রাস: সোলার সেচ, কম খরচে ডিজেল ইঞ্জিন এবং জৈব সার ব্যবহারের ফলে উৎপাদন ব্যয় ১৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

নিরাপদ বাজার: বর্তমানে পাঁচটি আউটলেট ও ভ্রাম্যমাণ বিক্রয়কেন্দ্রে জৈব সবজি বিক্রির মাধ্যমে বাজারে নিরাপদ সবজি বিক্রয় ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) উপব্যবস্থাপনা পরিচালক আকন্দ মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম মন্তব্য করেন, এটি একটি টেকসই উন্নয়নের দৃষ্টান্ত, যা দেশের অন্যান্য চরাঞ্চলেও সম্প্রসারণযোগ্য।