ঢাকা ০৩:০০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬, ১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর থেকে ছাত্রশক্তি নেত্রী: ফরিদপুরের বর্ষার সম্মুখে কোন নিয়তি?

দৈনিক জাগ্রত বাংলাদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ০৭:৫৭:০৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১ জুন ২০২৬
  • / 114

ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার একটি সাধারণ কৃষক পরিবারে জন্ম নেওয়া এক অকুতোভয় তরুণীর নাম বৈশাখী ইসলাম বর্ষা। বয়সে তরুণ হলেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে বজ্রকণ্ঠ, প্রতিবাদী মনোভাব এবং সামাজিক সচেতনতার কারণে ইতোমধ্যে তিনি ফরিদপুর জেলাজুড়ে এক পরিচিত নাম। ইভটিজিংয়ের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য প্রতিবাদ, জুলাই আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক সচেতনতা এবং নিজের স্বপ্ন পূরণের অবিরাম সংগ্রাম—সব মিলিয়ে বৈশাখী ইসলাম বর্ষার জীবন যেন এক জীবন্ত লড়াইয়ের গল্প।

মেধাবী ছাত্রীর উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন:

২০০৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর ফরিদপুর জেলার নগরকান্দা উপজেলার ডাঙ্গী ইউনিয়নের ভবুকদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন বৈশাখী ইসলাম বর্ষা। তাঁর বাবা মো. ছাবু শেখ কৃষিকাজের পাশাপাশি গাছের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত এবং মা একজন সাধারণ গৃহিণী। চার ভাই-বোনের মধ্যে বৈশাখী সবার বড়। মেঝো বোন চৈতী বর্তমানে এসএসসি পরীক্ষার্থী, ছোট ভাই ফাহিম নবম শ্রেণিতে এবং মাহিম পঞ্চম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত।

ছোটবেলা থেকেই অসম্ভব মেধাবী ও স্বপ্নবাজ ছিলেন বৈশাখী। ভবুকদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ২০১৭ সালে পিএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৪.৮৩ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। এরপর ফুলসুতি আব্দুল আলেম চৌধুরী মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ২০২৩ সালে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৪.৮৯ এবং ফরিদপুরের ঐতিহ্যবাহী সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ থেকে ২০২৫ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৩.৮৯ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। বর্তমানে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির লক্ষ্যে ফরিদপুরের ‘তুষারস কেয়ার’ নামক একটি কোচিং সেন্টারে ভর্তি হয়ে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য নিরলস পরিশ্রম করছেন।

জুলাই আন্দোলন ও রাজপথের সেই সাহসী দিনগুলো:

বৈশাখীর পরিচয় শুধু একজন সাধারণ শিক্ষার্থীর মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন তাঁর জীবনদর্শনে এক বড় পরিবর্তন এনে দেয়। সেই আন্দোলনের অভিজ্ঞতা তাঁকে বৈষম্যহীন ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখায়। জুলাই আন্দোলনের সময় রাজপথে সম্মুখ সারিতে থেকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন বৈশাখী। আন্দোলনের পর তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ফরিদপুর জেলার সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

ইভটিজিংয়ের প্রতিবাদ ও হামলার শিকার:

বৈশাখীর জীবনের সবচেয়ে আলোচিত ও বেদনাদায়ক ঘটনাটি ঘটে ২০২৫ সালের ৩০ মে। সেদিন তাঁর ছোট বোন চৈতীকে স্থানীয় কয়েকজন বখাটে ইভটিজিং করে। বিষয়টি জানতে পেরে বৈশাখী রাজপথে প্রকাশ্যে এর তীব্র প্রতিবাদ করেন। এর জের ধরে স্থানীয় কিছু বখাটে এবং রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের হাতে নির্মম হামলার শিকার হন তিনি।

ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে কান্নাজড়িত কণ্ঠে লাইভে এসে বৈশাখী প্রশ্ন তুলেছিলেন, “জুলাই আন্দোলন করা কি আমার ভুল ছিল? ইভটিজিংয়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় আমাকে রাস্তায় ফেলে মারধর করা হলো!” তাঁর সেই আবেগঘন বক্তব্য দ্রুত ভাইরাল হয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে বৈশাখী বাদী হয়ে নগরকান্দা থানায় দুটি এবং পুলিশ একটি পৃথক মামলা দায়ের করে, যার বিচারিক কার্যক্রম এখনও চলমান।

সংগঠিত শক্তি ও রাজনীতিতে পদার্পণ:

এই ঘটনার পর বৈশাখী উপলব্ধি করেন, সমাজ পরিবর্তনের জন্য একা লড়াই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন সংগঠিত শক্তি। সেই উপলব্ধি থেকেই তিনি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সহযোগী ছাত্র সংগঠন ‘জাতীয় ছাত্রশক্তি’-তে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি সংগঠনটির ফরিদপুর জেলা শাখার সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর মতে, রাজনীতি হওয়া উচিত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার হাতিয়ার।

বর্ষাকে নিয়ে গুণীজনদের মূল্যায়ন:

বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক এমআরএস লাভলী এই তরুণীর সাহসের প্রশংসা করে প্রখ্যাত প্রাবন্ধিক মোতাহের হোসেন চৌধুরীর বিখ্যাত উক্তিটি স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, “’মানুষ তার স্বপ্নের চেয়েও বড়’। বর্ষা যে স্বপ্নের কথা প্রকাশ করেছে, ইতিমধ্যে ও সেই স্বপ্নের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। বর্ষা যদি আগামী ১০টা বছর ধৈর্য ধরে নিজের সিদ্ধান্তে অটুট থেকে পড়াশোনাটা শেষ করতে পারে এবং নিজেকে সুশিক্ষিত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারে, তবে ও নিজেও জানে না ওর জন্য ভবিষ্যতে কত বড় সুসংবাদ অপেক্ষা করছে।”

প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর থেকে ছাত্রশক্তি নেত্রী: ফরিদপুরের বর্ষার সম্মুখে কোন নিয়তি?

আপডেট সময় : ০৭:৫৭:০৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১ জুন ২০২৬

ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার একটি সাধারণ কৃষক পরিবারে জন্ম নেওয়া এক অকুতোভয় তরুণীর নাম বৈশাখী ইসলাম বর্ষা। বয়সে তরুণ হলেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে বজ্রকণ্ঠ, প্রতিবাদী মনোভাব এবং সামাজিক সচেতনতার কারণে ইতোমধ্যে তিনি ফরিদপুর জেলাজুড়ে এক পরিচিত নাম। ইভটিজিংয়ের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য প্রতিবাদ, জুলাই আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক সচেতনতা এবং নিজের স্বপ্ন পূরণের অবিরাম সংগ্রাম—সব মিলিয়ে বৈশাখী ইসলাম বর্ষার জীবন যেন এক জীবন্ত লড়াইয়ের গল্প।

মেধাবী ছাত্রীর উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন:

২০০৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর ফরিদপুর জেলার নগরকান্দা উপজেলার ডাঙ্গী ইউনিয়নের ভবুকদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন বৈশাখী ইসলাম বর্ষা। তাঁর বাবা মো. ছাবু শেখ কৃষিকাজের পাশাপাশি গাছের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত এবং মা একজন সাধারণ গৃহিণী। চার ভাই-বোনের মধ্যে বৈশাখী সবার বড়। মেঝো বোন চৈতী বর্তমানে এসএসসি পরীক্ষার্থী, ছোট ভাই ফাহিম নবম শ্রেণিতে এবং মাহিম পঞ্চম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত।

ছোটবেলা থেকেই অসম্ভব মেধাবী ও স্বপ্নবাজ ছিলেন বৈশাখী। ভবুকদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ২০১৭ সালে পিএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৪.৮৩ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। এরপর ফুলসুতি আব্দুল আলেম চৌধুরী মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ২০২৩ সালে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৪.৮৯ এবং ফরিদপুরের ঐতিহ্যবাহী সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ থেকে ২০২৫ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৩.৮৯ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। বর্তমানে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির লক্ষ্যে ফরিদপুরের ‘তুষারস কেয়ার’ নামক একটি কোচিং সেন্টারে ভর্তি হয়ে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য নিরলস পরিশ্রম করছেন।

জুলাই আন্দোলন ও রাজপথের সেই সাহসী দিনগুলো:

বৈশাখীর পরিচয় শুধু একজন সাধারণ শিক্ষার্থীর মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন তাঁর জীবনদর্শনে এক বড় পরিবর্তন এনে দেয়। সেই আন্দোলনের অভিজ্ঞতা তাঁকে বৈষম্যহীন ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখায়। জুলাই আন্দোলনের সময় রাজপথে সম্মুখ সারিতে থেকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন বৈশাখী। আন্দোলনের পর তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ফরিদপুর জেলার সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

ইভটিজিংয়ের প্রতিবাদ ও হামলার শিকার:

বৈশাখীর জীবনের সবচেয়ে আলোচিত ও বেদনাদায়ক ঘটনাটি ঘটে ২০২৫ সালের ৩০ মে। সেদিন তাঁর ছোট বোন চৈতীকে স্থানীয় কয়েকজন বখাটে ইভটিজিং করে। বিষয়টি জানতে পেরে বৈশাখী রাজপথে প্রকাশ্যে এর তীব্র প্রতিবাদ করেন। এর জের ধরে স্থানীয় কিছু বখাটে এবং রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের হাতে নির্মম হামলার শিকার হন তিনি।

ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে কান্নাজড়িত কণ্ঠে লাইভে এসে বৈশাখী প্রশ্ন তুলেছিলেন, “জুলাই আন্দোলন করা কি আমার ভুল ছিল? ইভটিজিংয়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় আমাকে রাস্তায় ফেলে মারধর করা হলো!” তাঁর সেই আবেগঘন বক্তব্য দ্রুত ভাইরাল হয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে বৈশাখী বাদী হয়ে নগরকান্দা থানায় দুটি এবং পুলিশ একটি পৃথক মামলা দায়ের করে, যার বিচারিক কার্যক্রম এখনও চলমান।

সংগঠিত শক্তি ও রাজনীতিতে পদার্পণ:

এই ঘটনার পর বৈশাখী উপলব্ধি করেন, সমাজ পরিবর্তনের জন্য একা লড়াই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন সংগঠিত শক্তি। সেই উপলব্ধি থেকেই তিনি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সহযোগী ছাত্র সংগঠন ‘জাতীয় ছাত্রশক্তি’-তে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি সংগঠনটির ফরিদপুর জেলা শাখার সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর মতে, রাজনীতি হওয়া উচিত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার হাতিয়ার।

বর্ষাকে নিয়ে গুণীজনদের মূল্যায়ন:

বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক এমআরএস লাভলী এই তরুণীর সাহসের প্রশংসা করে প্রখ্যাত প্রাবন্ধিক মোতাহের হোসেন চৌধুরীর বিখ্যাত উক্তিটি স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, “’মানুষ তার স্বপ্নের চেয়েও বড়’। বর্ষা যে স্বপ্নের কথা প্রকাশ করেছে, ইতিমধ্যে ও সেই স্বপ্নের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। বর্ষা যদি আগামী ১০টা বছর ধৈর্য ধরে নিজের সিদ্ধান্তে অটুট থেকে পড়াশোনাটা শেষ করতে পারে এবং নিজেকে সুশিক্ষিত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারে, তবে ও নিজেও জানে না ওর জন্য ভবিষ্যতে কত বড় সুসংবাদ অপেক্ষা করছে।”