ঢাকা ০২:৫১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬, ১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ: অসুস্থতা নাকি সুগভীর রাজনৈতিক চাপ?

দৈনিক জাগ্রত বাংলাদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ০৯:৫৮:৫১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১ জুন ২০২৬
  • / 63

মাত্র সাড়ে তিন মাসের মাথায় সরকারের পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের আকস্মিক পদত্যাগে পাহাড়ি রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণ ও তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দীপেন দেওয়ান কী কারণে এমন নাটকীয় সিদ্ধান্ত নিলেন, তা নিয়ে বিএনপির রাজনৈতিক মহল এবং পাহাড়ের সচেতন জনগোষ্ঠীর মধ্যে নানা প্রশ্নের ডালপালা মেলছে।

আজ সোমবার (১ জুন) শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন দীপেন দেওয়ান। তবে তাঁর এই আকস্মিক পদত্যাগ মেনে নিতে পারছেন না অনুসারীরা। পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার ও পুনর্বহালের দাবিতে রাঙামাটিতে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন তাঁর সমর্থকেরা। বিক্ষোভকারীদের দাবি—অদৃশ্য কোনো শক্তির তীব্র চাপের মুখেই পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন মন্ত্রী।

রেকর্ড ভোটে জয় থেকে মন্ত্রিত্ব:

যুগ্ম জেলা জজের চাকরি ছেড়ে রাজনীতিতে আসা দীপেন দেওয়ান এবারই প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের সবচেয়ে বড় ব্যবধানে জয়ী হওয়ার রেকর্ড গড়েন তিনি। বিএনপি সরকার গঠন করার পর পাহাড়ের সংবেদনশীলতা ও গুরুত্ব বিবেচনায় তাঁকে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। উল্লেখ্য, তাঁর বাবা সুবিমল দেওয়ান ছিলেন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উপজাতিবিষয়ক উপদেষ্টা।

চাপের মুখে পদত্যাগ?

যদিও পদত্যাগপত্রে দীপেন দেওয়ান শারীরিক জটিলতার কথা উল্লেখ করেছেন, তবে স্থানীয় দলীয় নেতাকর্মীরা এই যুক্তি মানতে নারাজ। কাউখালী উপজেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি সাজামং মারমা স্পষ্ট দাবি করেন, “শারীরিক ও মানসিকভাবে তিনি মন্ত্রিত্ব চালানোর মতো সম্পূর্ণ সক্ষম। গত ৫ আগস্টের পর ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগকে যারা লালন-পালন করছিল, তাদের চাপের মুখে তিনি সাময়িকভাবে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন।”

অন্যদিকে, রাঙামাটি জেলা বিএনপির সহসভাপতি সাইফুল ইসলাম ভুট্টো বলেন, “দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ পাহাড়ে ‘রংধনু জাতি’ গঠনের প্রক্রিয়ায় প্রভূত ক্ষতি করবে। তিনি শারীরিকভাবে মোটেও অসুস্থ নন। বিএনপির কিছু নেতা প্রধানমন্ত্রীকে ভুল বুঝিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছেন।”

অভ্যন্তরীণ কোন্দল নাকি নীতিগত দ্বন্দ্ব?

মন্ত্রণালয় পরিচালনা, রাঙামাটির রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলা পরিষদগুলোতে প্রশাসক নিয়োগপ্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট দ্বন্দ্বের জেরে এই পদত্যাগ কি না, তা নিয়ে গুঞ্জন রয়েছে। তবে জেলা বিএনপির সভাপতি দীপন তালুকদার দলীয় বিরোধের বিষয়টি অস্বীকার করে জানান, এটি মন্ত্রীর একান্তই ব্যক্তিগত বিষয় এবং এ ব্যাপারে তিনি আগে থেকে কোনো ইঙ্গিত পাননি। একই সুর শোনা গেছে খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভূঁইয়ার কণ্ঠেও। তিনি জানান, দীপেন দেওয়ানের সঙ্গে তাঁর অত্যন্ত আন্তরিক সম্পর্ক রয়েছে।

১৯৯৮ সালের ঐতিহাসিক পার্বত্য শান্তি চুক্তির ধারা অনুযায়ী গঠিত এই সংবেদনশীল মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দীপেন দেওয়ান পাহাড়ে পারস্পরিক আস্থার সংকট দূরীকরণে কাজ শুরু করেছিলেন। তাঁর এই আকস্মিক প্রস্থান পাহাড়ের শান্তি প্রক্রিয়া এবং বিএনপির রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় কোনো বড় ধাক্কা কি না, তা-ই এখন দেখার বিষয়।

দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ: অসুস্থতা নাকি সুগভীর রাজনৈতিক চাপ?

আপডেট সময় : ০৯:৫৮:৫১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১ জুন ২০২৬

মাত্র সাড়ে তিন মাসের মাথায় সরকারের পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের আকস্মিক পদত্যাগে পাহাড়ি রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণ ও তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দীপেন দেওয়ান কী কারণে এমন নাটকীয় সিদ্ধান্ত নিলেন, তা নিয়ে বিএনপির রাজনৈতিক মহল এবং পাহাড়ের সচেতন জনগোষ্ঠীর মধ্যে নানা প্রশ্নের ডালপালা মেলছে।

আজ সোমবার (১ জুন) শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন দীপেন দেওয়ান। তবে তাঁর এই আকস্মিক পদত্যাগ মেনে নিতে পারছেন না অনুসারীরা। পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার ও পুনর্বহালের দাবিতে রাঙামাটিতে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন তাঁর সমর্থকেরা। বিক্ষোভকারীদের দাবি—অদৃশ্য কোনো শক্তির তীব্র চাপের মুখেই পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন মন্ত্রী।

রেকর্ড ভোটে জয় থেকে মন্ত্রিত্ব:

যুগ্ম জেলা জজের চাকরি ছেড়ে রাজনীতিতে আসা দীপেন দেওয়ান এবারই প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের সবচেয়ে বড় ব্যবধানে জয়ী হওয়ার রেকর্ড গড়েন তিনি। বিএনপি সরকার গঠন করার পর পাহাড়ের সংবেদনশীলতা ও গুরুত্ব বিবেচনায় তাঁকে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। উল্লেখ্য, তাঁর বাবা সুবিমল দেওয়ান ছিলেন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উপজাতিবিষয়ক উপদেষ্টা।

চাপের মুখে পদত্যাগ?

যদিও পদত্যাগপত্রে দীপেন দেওয়ান শারীরিক জটিলতার কথা উল্লেখ করেছেন, তবে স্থানীয় দলীয় নেতাকর্মীরা এই যুক্তি মানতে নারাজ। কাউখালী উপজেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি সাজামং মারমা স্পষ্ট দাবি করেন, “শারীরিক ও মানসিকভাবে তিনি মন্ত্রিত্ব চালানোর মতো সম্পূর্ণ সক্ষম। গত ৫ আগস্টের পর ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগকে যারা লালন-পালন করছিল, তাদের চাপের মুখে তিনি সাময়িকভাবে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন।”

অন্যদিকে, রাঙামাটি জেলা বিএনপির সহসভাপতি সাইফুল ইসলাম ভুট্টো বলেন, “দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ পাহাড়ে ‘রংধনু জাতি’ গঠনের প্রক্রিয়ায় প্রভূত ক্ষতি করবে। তিনি শারীরিকভাবে মোটেও অসুস্থ নন। বিএনপির কিছু নেতা প্রধানমন্ত্রীকে ভুল বুঝিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছেন।”

অভ্যন্তরীণ কোন্দল নাকি নীতিগত দ্বন্দ্ব?

মন্ত্রণালয় পরিচালনা, রাঙামাটির রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলা পরিষদগুলোতে প্রশাসক নিয়োগপ্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট দ্বন্দ্বের জেরে এই পদত্যাগ কি না, তা নিয়ে গুঞ্জন রয়েছে। তবে জেলা বিএনপির সভাপতি দীপন তালুকদার দলীয় বিরোধের বিষয়টি অস্বীকার করে জানান, এটি মন্ত্রীর একান্তই ব্যক্তিগত বিষয় এবং এ ব্যাপারে তিনি আগে থেকে কোনো ইঙ্গিত পাননি। একই সুর শোনা গেছে খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভূঁইয়ার কণ্ঠেও। তিনি জানান, দীপেন দেওয়ানের সঙ্গে তাঁর অত্যন্ত আন্তরিক সম্পর্ক রয়েছে।

১৯৯৮ সালের ঐতিহাসিক পার্বত্য শান্তি চুক্তির ধারা অনুযায়ী গঠিত এই সংবেদনশীল মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দীপেন দেওয়ান পাহাড়ে পারস্পরিক আস্থার সংকট দূরীকরণে কাজ শুরু করেছিলেন। তাঁর এই আকস্মিক প্রস্থান পাহাড়ের শান্তি প্রক্রিয়া এবং বিএনপির রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় কোনো বড় ধাক্কা কি না, তা-ই এখন দেখার বিষয়।