ঢাকা ০৪:৫৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ৩ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিদায়বেলা যে দৃষ্টান্ত রেখে গেলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ মাসুদ হোসেন

হারুন আনসারী ফরিদপুর:
  • আপডেট সময় : ১২:১১:২১ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ মে ২০২৫
  • / 196

রোববার বিকেলে ফরিদপুরের রাজেন্দ্র কলেজ মাঠে হাজারো মানুষ অশ্রুসিক্ত নয়নে শেষ বিদায় জানাতে সমবেত হন। মেঘলা আকাশে বিকেলের শেষ আলো ম্লান হয়ে আসছিল, চারপাশে যেন ছড়িয়ে ছিল এক অসীম বিষাদের ছায়া। উপস্থিত জনতার চোখেমুখে ছিল প্রিয়জন হারানোর গভীর বেদনা। সেই মুহূর্তটি আরও হৃদয়বিদারক করে তোলে বিদায়ের আবেগঘন পরিবেশ।

ভালোবাসার মানুষের সম্মিলিত শ্রদ্ধা

জানাযায় অংশ নেন সৈয়দ মাসুদ হোসেনের পরিবার-পরিজন, আত্মীয়স্বজন ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুবান্ধবসহ ফরিদপুরের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সহযোদ্ধা, রাজনৈতিক সহকর্মী এবং ভিন্নমতাবলম্বী রাজনৈতিক ব্যক্তিরাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। সকলেই ব্যথিত হৃদয়ে তাঁর অন্তিমযাত্রায় অংশ নেন। আবেগমাখা ভালোবাসা ও করুণ প্রার্থনায় মুখরিত ছিল রাজেন্দ্র কলেজ মাঠ।

গার্ড অব অনার ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বিদায়

জানাযার পূর্বে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. শরিফুল ইসলামের নেতৃত্বে সৈয়দ মাসুদ হোসেনকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। পুলিশের একটি চৌকস দল তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সশস্ত্র সালাম জানায়। বিউগলের বিষাদময় সুরে বিদায়ের মুহূর্ত হয়ে ওঠে আরও ভারী।

কিশোর আথিরের আবেগঘন বক্তব্য

জানাযায় সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী মুহূর্ত তৈরি করে সৈয়দ মাসুদ হোসেনের বড় পৌত্র আথিরের সংক্ষিপ্ত বক্তব্য। কিশোর বয়সেই বাবাকে হারানো আথির বলেন,
“ভুলত্রুটি মানুষের একটি স্বাভাবিক গুণ, এটি আল্লাহ প্রদত্ত। আমার দাদা যদি কারো মনে কষ্ট দিয়ে থাকেন, আমি তাঁর পক্ষ থেকে ক্ষমা চাচ্ছি। দয়া করে তাঁকে ক্ষমা করে দিবেন। কারো কাছে কোন দেনাপাওনা থাকলে আমাদের জানাবেন।”
এই কথাগুলো আবেগময় কণ্ঠে বলা মাত্রই উপস্থিত জনতা স্তব্ধ হয়ে যান। বছরখানেক আগে সবাইকে কাঁদিয়ে বিদায় নেওয়া সৈয়দ মুঈদ হাসান আসিফের কণ্ঠ যেন ফিরে আসে আথিরের কণ্ঠে।

রাজনৈতিক, সামাজিক ও ব্যক্তিগত জীবনের স্মৃতিচারণ

পরিবারের পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন সৈয়দ মাসুদ হোসেনের বড় ভগ্নিপতি সৈয়দ আলম। তাঁর বাল্যবন্ধু হামিম গ্রুপের কর্ণধার একে আজাদ, ফরিদপুর মুসলিম মিশনের সম্পাদক অধ্যাপক এমএ সামাদ, জামায়াতের কেন্দ্রীয় সদস্য অধ্যাপক আব্দুত তাওয়াব, জেলা বিএনপির সদস্য সচিব একে কিবরিয়া স্বপন, যুগ্ম আহ্বায়ক সৈয়দ জুলফিকার হোসেন জুয়েল, জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার আবুল ফয়েজ শাহনেওয়াজ সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন। সঞ্চালনা করেন এমএ বাতেন।

বক্তারা বলেন, “সৈয়দ মাসুদ হোসেন ছিলেন একজন সাহসী রাজনৈতিক নেতা ও নিঃস্বার্থ সমাজসেবক। তিনি কখনোই ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজের ভাগ্য উন্নয়নের চেষ্টা করেননি। তার মতো মানুষ রাজনীতিতে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।”
তাঁর রাজনৈতিক জীবনের ত্যাগ ও দলের অভ্যন্তরে নিপীড়নের বিষয়গুলোও স্মৃতিচারণে উঠে আসে।

জীবন ও পারিবারিক পটভূমি

সৈয়দ মাসুদ হোসেনের পিতার নাম সৈয়দ আলী আহমেদ, তাদের আদি নিবাস গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার রাতইল ঘোণাপাড়া গ্রামে। তিনি তরুণ বয়সেই পিতাকে হারিয়ে পারিবারিক ব্যবসা পরিচালনার পাশাপাশি পরিবারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক, চকবাজার বণিক সমিতির সাবেক সভাপতি ও সেক্রেটারি ছিলেন তিনি। তার সহধর্মিণী আইভি মাসুদ ছিলেন জেলা মহিলা লীগের সাবেক সদস্য সচিব।

তাদের একমাত্র ছেলে সৈয়দ মুঈদ হাসান আসিফ গত বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি মাত্র ৪৬ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর রেখে যাওয়া তিন সন্তান—আথির, আফসির ও আফসিন। সৈয়দ মাসুদের একমাত্র কন্যা স্বাতিও বিবাহিতা।

মৃত্যুর শেষ মুহূর্ত ও হৃদয়স্পর্শী স্ট্যাটাস

এক সপ্তাহ আগে ঢাকায় মেয়ের বাসায় অবস্থানকালে হঠাৎ স্ট্রোক করেন সৈয়দ মাসুদ হোসেন। রাত ১২টার দিকে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগে তাঁর ফেসবুক দেওয়ালে দেখা যায় “আস্তাগফিরুল্লাহ” নামের একটি পেজ থেকে পোস্ট শেয়ার করা, যেখানে লেখা—
“সবচেয়ে সুখি মানুষ সে, যে অল্পতেই সন্তুষ্ট হয় এবং অল্পতেই বলতে পারে আলহামদুলিল্লাহ।”
আরেকটি শেয়ার ছিল—
“তওবা করে ফিরে আসলে, পূর্বের গুনাহগুলো আল্লাহ নেকি দ্বারা পূর্ণ করে দিবেন।” [সূরা ফুরকান: ৭০]

দোয়া মাহফিল ও শোকবার্তা

তার রুহের মাগফেরাত কামনায় শুক্রবার বাদ আসর দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক চৌধুরী নায়াব ইউসুফ এবং জেলা বিএনপির আহ্বায়ক সৈয়দ মোদাররেস আলী ঈসা শোকবার্তা পাঠিয়ে সমবেদনা জানান।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন, বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ মাসুদ হোসেনকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন।

বিদায়বেলা যে দৃষ্টান্ত রেখে গেলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ মাসুদ হোসেন

আপডেট সময় : ১২:১১:২১ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ মে ২০২৫

রোববার বিকেলে ফরিদপুরের রাজেন্দ্র কলেজ মাঠে হাজারো মানুষ অশ্রুসিক্ত নয়নে শেষ বিদায় জানাতে সমবেত হন। মেঘলা আকাশে বিকেলের শেষ আলো ম্লান হয়ে আসছিল, চারপাশে যেন ছড়িয়ে ছিল এক অসীম বিষাদের ছায়া। উপস্থিত জনতার চোখেমুখে ছিল প্রিয়জন হারানোর গভীর বেদনা। সেই মুহূর্তটি আরও হৃদয়বিদারক করে তোলে বিদায়ের আবেগঘন পরিবেশ।

ভালোবাসার মানুষের সম্মিলিত শ্রদ্ধা

জানাযায় অংশ নেন সৈয়দ মাসুদ হোসেনের পরিবার-পরিজন, আত্মীয়স্বজন ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুবান্ধবসহ ফরিদপুরের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সহযোদ্ধা, রাজনৈতিক সহকর্মী এবং ভিন্নমতাবলম্বী রাজনৈতিক ব্যক্তিরাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। সকলেই ব্যথিত হৃদয়ে তাঁর অন্তিমযাত্রায় অংশ নেন। আবেগমাখা ভালোবাসা ও করুণ প্রার্থনায় মুখরিত ছিল রাজেন্দ্র কলেজ মাঠ।

গার্ড অব অনার ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বিদায়

জানাযার পূর্বে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. শরিফুল ইসলামের নেতৃত্বে সৈয়দ মাসুদ হোসেনকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। পুলিশের একটি চৌকস দল তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সশস্ত্র সালাম জানায়। বিউগলের বিষাদময় সুরে বিদায়ের মুহূর্ত হয়ে ওঠে আরও ভারী।

কিশোর আথিরের আবেগঘন বক্তব্য

জানাযায় সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী মুহূর্ত তৈরি করে সৈয়দ মাসুদ হোসেনের বড় পৌত্র আথিরের সংক্ষিপ্ত বক্তব্য। কিশোর বয়সেই বাবাকে হারানো আথির বলেন,
“ভুলত্রুটি মানুষের একটি স্বাভাবিক গুণ, এটি আল্লাহ প্রদত্ত। আমার দাদা যদি কারো মনে কষ্ট দিয়ে থাকেন, আমি তাঁর পক্ষ থেকে ক্ষমা চাচ্ছি। দয়া করে তাঁকে ক্ষমা করে দিবেন। কারো কাছে কোন দেনাপাওনা থাকলে আমাদের জানাবেন।”
এই কথাগুলো আবেগময় কণ্ঠে বলা মাত্রই উপস্থিত জনতা স্তব্ধ হয়ে যান। বছরখানেক আগে সবাইকে কাঁদিয়ে বিদায় নেওয়া সৈয়দ মুঈদ হাসান আসিফের কণ্ঠ যেন ফিরে আসে আথিরের কণ্ঠে।

রাজনৈতিক, সামাজিক ও ব্যক্তিগত জীবনের স্মৃতিচারণ

পরিবারের পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন সৈয়দ মাসুদ হোসেনের বড় ভগ্নিপতি সৈয়দ আলম। তাঁর বাল্যবন্ধু হামিম গ্রুপের কর্ণধার একে আজাদ, ফরিদপুর মুসলিম মিশনের সম্পাদক অধ্যাপক এমএ সামাদ, জামায়াতের কেন্দ্রীয় সদস্য অধ্যাপক আব্দুত তাওয়াব, জেলা বিএনপির সদস্য সচিব একে কিবরিয়া স্বপন, যুগ্ম আহ্বায়ক সৈয়দ জুলফিকার হোসেন জুয়েল, জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার আবুল ফয়েজ শাহনেওয়াজ সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন। সঞ্চালনা করেন এমএ বাতেন।

বক্তারা বলেন, “সৈয়দ মাসুদ হোসেন ছিলেন একজন সাহসী রাজনৈতিক নেতা ও নিঃস্বার্থ সমাজসেবক। তিনি কখনোই ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজের ভাগ্য উন্নয়নের চেষ্টা করেননি। তার মতো মানুষ রাজনীতিতে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।”
তাঁর রাজনৈতিক জীবনের ত্যাগ ও দলের অভ্যন্তরে নিপীড়নের বিষয়গুলোও স্মৃতিচারণে উঠে আসে।

জীবন ও পারিবারিক পটভূমি

সৈয়দ মাসুদ হোসেনের পিতার নাম সৈয়দ আলী আহমেদ, তাদের আদি নিবাস গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার রাতইল ঘোণাপাড়া গ্রামে। তিনি তরুণ বয়সেই পিতাকে হারিয়ে পারিবারিক ব্যবসা পরিচালনার পাশাপাশি পরিবারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক, চকবাজার বণিক সমিতির সাবেক সভাপতি ও সেক্রেটারি ছিলেন তিনি। তার সহধর্মিণী আইভি মাসুদ ছিলেন জেলা মহিলা লীগের সাবেক সদস্য সচিব।

তাদের একমাত্র ছেলে সৈয়দ মুঈদ হাসান আসিফ গত বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি মাত্র ৪৬ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর রেখে যাওয়া তিন সন্তান—আথির, আফসির ও আফসিন। সৈয়দ মাসুদের একমাত্র কন্যা স্বাতিও বিবাহিতা।

মৃত্যুর শেষ মুহূর্ত ও হৃদয়স্পর্শী স্ট্যাটাস

এক সপ্তাহ আগে ঢাকায় মেয়ের বাসায় অবস্থানকালে হঠাৎ স্ট্রোক করেন সৈয়দ মাসুদ হোসেন। রাত ১২টার দিকে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগে তাঁর ফেসবুক দেওয়ালে দেখা যায় “আস্তাগফিরুল্লাহ” নামের একটি পেজ থেকে পোস্ট শেয়ার করা, যেখানে লেখা—
“সবচেয়ে সুখি মানুষ সে, যে অল্পতেই সন্তুষ্ট হয় এবং অল্পতেই বলতে পারে আলহামদুলিল্লাহ।”
আরেকটি শেয়ার ছিল—
“তওবা করে ফিরে আসলে, পূর্বের গুনাহগুলো আল্লাহ নেকি দ্বারা পূর্ণ করে দিবেন।” [সূরা ফুরকান: ৭০]

দোয়া মাহফিল ও শোকবার্তা

তার রুহের মাগফেরাত কামনায় শুক্রবার বাদ আসর দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক চৌধুরী নায়াব ইউসুফ এবং জেলা বিএনপির আহ্বায়ক সৈয়দ মোদাররেস আলী ঈসা শোকবার্তা পাঠিয়ে সমবেদনা জানান।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন, বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ মাসুদ হোসেনকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন।