গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে পড়ছে মৃত্যুর ফাঁদ: ঢাকার বাইরে বিক্রি হচ্ছে আটা-ময়দার ভেজাল ট্যাবলেট!
- আপডেট সময় : ০২:০৫:৩১ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ মে ২০২৫
- / 366
জুলাইয়ের রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে নকল ওষুধ ব্যবসায়ী চক্র আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে। শহর থেকে গ্রাম, সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে ভেজাল ওষুধ। অ্যালবুমিন ইঞ্জেকশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ওষুধও এখন ভেজালের দখলে। গবেষণা বলছে, ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতে ভেজাল ওষুধের হার প্রায় ২০ শতাংশ। আটা-ময়দা দিয়ে তৈরি বড়ি বিক্রি হচ্ছে চিকিৎসার নামে। আইন থাকলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না, অভিযোগ ভোক্তাদের।
রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে সক্রিয় চক্র
জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা এবং প্রশাসনের দুর্বলতার সুযোগে দেশে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে নকল ও ভেজাল ওষুধের কারবারিরা। বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, শহর থেকে গ্রামাঞ্চল—সবখানেই এসব ওষুধ ছড়িয়ে পড়ছে, যা নিয়ে চিকিৎসক ও রোগীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
চিকিৎসায় বিপর্যয়: অ্যালবুমিন ইঞ্জেকশন ভেজালের কবলে
চিকিৎসায় ব্যবহৃত একটি গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ অ্যালবুমিন ইঞ্জেকশন, যা অস্ত্রোপচার বা গুরুতর আঘাতের পর রক্তে প্লাজমা বাড়াতে ব্যবহৃত হয়, তা এখন ভেজাল ও নকলের সয়লাব। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডা. চঞ্চল কুমার ঘোষ বলেন, “বাজারে এত নকল যে, প্রায় বন্ধ করে দিয়েছি এই ওষুধের ব্যবহার।” সিলেটে এক রোগীর মৃত্যু ও ঢাকার হাসপাতালে জটিলতার পর পরীক্ষায় ধরা পড়ে ভেজাল ইনজেকশন।
চোখে দেখা যায় না পার্থক্য
ডা. ঘোষ জানান, নকল ইনজেকশনটি দেখতে হুবহু আসলের মতো হওয়ায় ডাক্তাররাও অনেক সময় বুঝে উঠতে পারেন না। রোগীরা তো আরও অসহায়। এজন্য চিকিৎসকরা এখন এই ওষুধটি ব্যবহার থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করছেন।
গবেষণায় চাঞ্চল্যকর তথ্য
বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী Nature-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকায় বিক্রি হওয়া অ্যান্টিবায়োটিকের ১০% ওষুধই ভেজাল। আর ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতে এই হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০ শতাংশে। গবেষণাটি পরিচালনায় যুক্ত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক, কানাজাওয়া ইউনিভার্সিটি (জাপান) এবং এবাহার্ড কার্ল ইউনিভার্সিটি (জার্মানি)।
আটা-ময়দায় তৈরি বড়ি!
গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু কিছু নকল ওষুধ তৈরি হচ্ছে আটা, ময়দা, এমনকি সুজি দিয়ে। ২০২৪ সালের মার্চে ঢাকা ও বরিশালে অভিযানে এসব উপাদানে তৈরি প্রায় পাঁচ লাখ নকল অ্যান্টিবায়োটিক উদ্ধার করে গোয়েন্দা পুলিশ। গ্রেফতার হওয়া চক্রটি প্রায় দশ বছর ধরে এসব ওষুধ তৈরি করে আসছিল।
বেশি চাহিদার ওষুধেই বেশি নকল
গ্যাস্ট্রিক ও অ্যান্টিবায়োটিক জাতীয় ওষুধ—যেমন ইসোমিপ্রাজল, সেফিক্সিম, অ্যামোক্সিসিলিন-ক্লাভুলানিক অ্যাসিড—এই ধরনের ওষুধেই বেশি দেখা যাচ্ছে ভেজাল। কারণ, সারা দেশে এগুলোর ব্যাপক চাহিদা এবং তুলনামূলক বেশি দাম রয়েছে।
আইন আছে, প্রয়োগ নেই
২০২৩ সালে বাংলাদেশ সরকার ‘ওষুধ ও কসমেটিক আইন’ পাস করে, যেখানে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত কাউকে এই আইনে সাজা দেওয়ার নজির নেই। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, “সরকার আন্তরিক নয় বলেই আইন কার্যকর হচ্ছে না।”
ফার্মেসি ব্যবস্থার অনিয়ম
বাংলাদেশে বর্তমানে অনুমোদনহীন ওষুধের দোকানের সংখ্যা লাখ ছাড়িয়ে গেছে। যেসব ফার্মেসির অনুমোদন আছে, তাদেরও অনেকেই ওষুধ সংরক্ষণে নিয়ম মানছে না। অধ্যাপক ভূঁইয়া বলেন, “বিশেষ করে মফস্বল এলাকায় ওষুধ সংরক্ষণের উপযুক্ত পরিবেশের অভাব রয়েছে।”
ভুক্তভোগীরা কারা?
অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল রোগীরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সস্তায় ওষুধ পাওয়ার আশায় তারা প্রতারিত হচ্ছেন এবং ঝুঁকিপূর্ণ নকল ওষুধ গ্রহণ করছেন। ফার্মেসিগুলোও কম মূল্যে লাভজনক এসব ওষুধ বিক্রি করে দায় এড়িয়ে যাচ্ছে।
নকল ওষুধের ভয়াবহ ছড়িয়ে পড়া বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইন থাকলেও তার কার্যকর প্রয়োগের অভাবে অসাধু চক্রের দৌরাত্ম্য থামানো যাচ্ছে না। সময় এসেছে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের। অন্যথায় স্বাস্থ্যব্যবস্থা ধসে পড়বে, আর জীবন বিপন্ন হবে নিরীহ মানুষের।





















