ফরিদপুরে যৌতুকের বলি গৃহবধূ নির্যাতনে মৃত্যু
- আপডেট সময় : ০৮:৫০:৫৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৫
- / 342
ফরিদপুরে যৌতুকের দাবিতে স্বামীর বাড়ির পাশবিক নির্যাতনের শিকার তুমুল আলোচিত গৃহবধূ কাকলী বেগম (৩৫) চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেছেন। প্রায় এক মাস ধরে সংকটাপন্ন অবস্থায় থাকার পর গত বুধবার দিবাগত রাতে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়।
বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১০টার দিকে ফরিদপুর সদরের কানাইপুর ইউনিয়নের বসুরনসিংহদিয়া গ্রামে বাবার বাড়িতে তাঁকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। তবে, কাকলীকে শেষ বিদায় জানাতে স্বামী এরশাদ শেখ (৪০) ও শ্বশুরবাড়ির কেউ উপস্থিত ছিলেন না; একমাত্র ছোট মেয়ে মীম (৫) ছাড়া স্বামী এরশাদ ও তাঁদের বড় ছেলে ইব্রাহিম (১৫) পলাতক রয়েছেন।
যেভাবে শুরু হয় বর্বরোচিত নির্যাতন
নিহত কাকলী বেগমের বাবার অভিযোগ এবং মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, তাঁর ওপর চালানো নির্যাতন ছিল চরম অমানবিক ও পাশবিক।
প্রথম দফা যৌতুক: প্রায় ১৪/১৫ বছর আগে বিয়ের কিছুদিন পর এরশাদ শেখ পাঁচ লক্ষ টাকা যৌতুক দাবি করেন। মেয়ের সুখের কথা ভেবে কাকলীর বাবা সেই টাকা দেন, যা দিয়ে এরশাদ শেখ দুবাই যান।
দ্বিতীয় দফা দাবি ও নির্যাতন: চলতি বছরের এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে এরশাদ দেশে ফিরে আসেন এবং সম্প্রতি দ্বিতীয়বারের মতো আরও পাঁচ লক্ষ টাকা যৌতুক দাবি করেন। আর্থিক অবস্থা খারাপ থাকায় কাকলী সেই টাকা দিতে অস্বীকার করেন।
অমানবিক অত্যাচার: যৌতুক দিতে অস্বীকৃতি জানালে গত ১৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় স্বামী এরশাদ শেখ, শাশুড়ি জমেলা খাতুন (৬০) এবং শ্বশুর তোঁতা শেখ (৬৮) মিলে কাকলীর ওপর অমানবিক নির্যাতন শুরু করেন। তাঁকে টানা চার দিন একটি ঘরে আটকে রাখা হয় এবং কোনো খাবার দেওয়া হয়নি।
বিষপান: শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে একপর্যায়ে কাকলী বেগম কৃষিকাজে ব্যবহৃত কীটনাশক (ঘাস মারা বিষ) খেয়ে ফেলেন।
চিকিৎসা ও মৃত্যুর ঘটনাপ্রবাহ
বিষপানে অসুস্থ হয়ে পড়লে স্বামী এরশাদ শেখ কাকলীকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। এরপর কাকলীর বাবা-চাচাকে খবর দিয়ে তাঁকে ফেলে রেখে এরশাদ পালিয়ে যান। অবস্থার অবনতি হলে পরিবারের সদস্যরা কাকলীকে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
মামলা ও শোকের মাতম
যৌতুকের জন্য পাশবিক নির্যাতনের এই ঘটনা স্থানীয়ভাবে তুমুল আলোচিত ছিল এবং বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
মামলা দায়ের: বর্বরোচিত নির্যাতনের ঘটনায় ভুক্তভোগীর বাবা মো. আক্কাছ আলী পাটোয়ারী বাদী হয়ে ফরিদপুর কোতোয়ালি থানায় নারী ও শিশু নির্বাচন দমন আইনে একটি মামলা (মামলা নং ৫৭) দায়ের করেন। মামলায় স্বামী এরশাদ শেখকে প্রধান আসামি করা হয়।
পুলিশের বক্তব্য: ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আসাদ উজ্জামান মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, “মামলাটি যথেষ্ট গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত করছে পুলিশ।”
দাফন ও শোক: বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কাকলী বেগমের মরদেহ বাবার বাড়িতে পৌঁছালে সেখানে শোকের মাতম নামে। এলাকাবাসী, আত্মীয়-স্বজন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা তাঁর জানাজায় অংশ নেন।
নিষ্ঠুর অমানবিক ও পৈশাচিক নির্যাতনের শিকার এই মা’য়ের জন্য হয়তো চরম পরিস্থিতিতে মৃত্যুটাই শ্রেয় পথ মনে হয়েছিল।





















