কনডেম সেল থেকে লাইব্রেরি: কেমন আছেন বাবা-মা খুনের দণ্ডিত ঐশী?
- আপডেট সময় : ১১:১৫:২৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬
- / 197
বিখ্যাত পুলিশ কর্মকর্তা বাবা মাহফুজুর রহমানের স্বপ্ন ছিল মেয়ে বড় হয়ে চিকিৎসক হবে, সাদা অ্যাপ্রন গায়ে জড়িয়ে মানুষের সেবা করবে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস আর এক বিপথগামী মুহূর্তের সিদ্ধান্তে সেই স্বপ্ন চিরতরে ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। বাবা-মাকে নির্মমভাবে হত্যার দায়ে দণ্ডিত ঐশী রহমানের জীবন এখন কাটছে অন্ধকার কারাগারের চার দেয়ালের মাঝে। তবে সময়ের ব্যবধানে বদলেছে তার বন্দিজীবনের আবহ। গাজীপুরের কাশিমপুর মহিলা কারাগারে বর্তমানে একজন ‘লাইব্রেরিয়ান’ হিসেবে দিন কাটছে তার।
কারাজীবনের ১৩ বছর পার, বাকি আরও ১৭ বছর
কারা কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, মাত্র ১৯ বছর বয়সে কারাজীবন শুরু হয়েছিল ঐশীর। দণ্ডবিধির ৫৭ ধারা অনুযায়ী যাবজ্জীবন কারাদণ্ড মানে ৩০ বছর। সেই হিসেবে ইতিমধ্যে তার বন্দিজীবনের ১৩ বছর কেটে গেছে। কারাগারের নিয়মানুযায়ী, ভালো আচরণ ও শৃঙ্খলার জন্য সরকার চাইলে সাজাপ্রাপ্ত বন্দির সাজা কিছুটা মওকুফ করতে পারে। তবে সেই সুযোগ পেলেও স্বাভাবিক নিয়মে তাকে আরও প্রায় ১৭ বছর চার দেয়ালের ভেতরেই কাটাতে হবে। আর তখন তার বয়স গিয়ে ঠেকবে প্রায় ৪৯ বছরে।
অন্ধকার কনডেম সেলে কেটেছিল দেড় বছর
২০১৩ সালের ১৬ আগস্ট ঢাকার চামেলীবাগের বাসা থেকে পুলিশ কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রীর ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করা হয়। ঘটনার পরদিন ঐশী নিজে পল্টন থানায় আত্মসমর্পণ করে বাবা-মাকে খুনের কথা স্বীকার করলে স্তম্ভিত হয়ে যায় পুরো দেশ।
২০১৫ সালের ১২ নভেম্বর নিম্ন আদালত ঐশীকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয়। এই রায়ের পর উচ্চ আদালতে আপিলের আগ পর্যন্ত প্রায় ১ বছর ৬ মাস কনডেম সেলের একাকী ও ভয়াবহ অন্ধকার পরিবেশে কাটাতে হয়েছিল তাকে। পরবর্তীতে ২০১৭ সালের ৫ জুন হাইকোর্ট তার সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিলে তাকে সাধারণ ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়।
এখন কেমন কাটে ঐশীর প্রতিদিনের জীবন?
কাশিমপুর মহিলা কারাগারের ৭ নম্বর ওয়ার্ডে থাকেন ঐশী। ইংরেজি মাধ্যমের ছাত্রী হওয়ায় ইংরেজি বই ও উপন্যাসের প্রতি তার দারুণ ঝোঁক। কারা অভ্যন্তরে তার এই মেধা ও ভালো আচরণ বিবেচনা করে তাকে কারাগারের লাইব্রেরি দেখভালের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
লাইব্রেরিয়ানের রুটিন:
সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা: লাইব্রেরিতে বই নিবন্ধনের কাজ এবং পাঠকদের বই দেওয়া।
দুপুর ১টা থেকে বিকেল ৫টা: গোসল, খাবার এবং দুপুরের বিশ্রামের সময়।
বিকেল ৫টা থেকে রাত ৮টা: দ্বিতীয় দফায় লাইব্রেরির দায়িত্ব পালন।
কারারক্ষীদের সূত্রে জানা গেছে, ঐশী এখন বেশ শান্ত ও কমভাষী। অবসরে তিনি কারাগারের ভেতরের ফুলের বাগান পরিচর্যা করতে ভালোবাসেন। দিন যত যাচ্ছে, ততই তিনি মুক্তির প্রহর গুনছেন। তবে তার মুক্তির আইনি প্রক্রিয়া এখনও দীর্ঘ পথ।
যে ৫ কারণে ফাঁসি থেকে যাবজ্জীবন হয়েছিল ঐশীর
হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছিল, অপরাধের গভীরতা বিবেচনায় ঐশীর ফাঁসিই উপযুক্ত শাস্তি ছিল। কিন্তু বিশেষ ৫টি মানবিক ও পারিপার্শ্বিক দিক বিবেচনা করে আদালত তার সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন দেয়। কারণগুলো হলো:
মানসিক বিচ্যুতি ও উদ্দেশ্যহীনতা: হত্যাকাণ্ডটি কোনো সুনির্দিষ্ট সুদূরপ্রসারী উদ্দেশ্য ছাড়া এবং তীব্র মানসিক বিচ্যুতির কারণে ঘটেছিল।
পারিবারিক মানসিক রোগের ইতিহাস: বিএসএমএমইউ-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঐশীর দাদি ও মামা আগে থেকেই মানসিক ভারসাম্যহীনতায় ভুগছিলেন, যা বংশগতভাবে তার ওপর প্রভাব ফেলেছিল।
বয়স ও শারীরিক অবস্থা: অপরাধের সময় তার বয়স ছিল মাত্র ১৯ বছর (সাবালকত্বের সন্ধিক্ষণ) এবং তিনি অ্যাজমাসহ বিভিন্ন শারীরিক রোগে আক্রান্ত ছিলেন।
কোনো অপরাধের রেকর্ড না থাকা: অতীতে তার বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ফৌজদারি অপরাধের নজির ছিল না এবং ঘটনার দুদিন পরই তিনি স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করেছিলেন।
অভিভাবকদের অসচেতনতা: রায়ে বলা হয়, ঐশীর বাবা পুলিশে ও মা ডেসটিনিতে কর্মব্যস্ত থাকায় সন্তানকে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেননি। সন্তানদের জন্য বাবা-মা-ই প্রথম শিক্ষক, কিন্তু ঐশী সেই পারিবারিক পরিবেশ থেকে বঞ্চিত ছিলেন।
বর্তমানে কাশিমপুর কারাগারেই কাটছে তার অনুশোচনা আর বন্দিত্বের দিনগুলো। মাঝে মাঝে মায়ের দিকের কিছু আত্মীয় (নানা-নানি পক্ষের) তাকে দেখতে এলেও, বাবার পক্ষের কেউ আর তার খোঁজ নিতে আসেন না।











