‘দুই হাতে পিস্তল, পাশে এসএমজি রেখে ঘুম!’ ‘গলাকাটা মোবারক’
- আপডেট সময় : ০২:৩২:২৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬
- / 128
প্রকাশ্য দিবালোকে ব্যস্ত রাজপথে দুই হাতে পিস্তল উঁচিয়ে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে মানুষ হত্যা, চাঁদা না পেয়ে কোটিপতির বাড়িতে একের পর এক আগ্নেয়াস্ত্রের তাণ্ডব, আর সিসিটিভি ক্যামেরায় চোখ রেখে ধরাকে সরা জ্ঞান করে বীরদর্পে হেঁটে যাওয়া—চট্টগ্রামজুড়ে যার নাম শুনলেই আতঙ্কে কেঁপে উঠত মানুষ, সেই রক্তহিম করা ‘গলাকাটা মোবারক’ অবশেষে পুলিশের জালে বন্দি।
ফটিকছড়ি ও রাউজানের দুর্গম পাহাড়ের গভীর গহিন থেকে গত বুধবার (২৭ আগস্ট) এক রুদ্ধশ্বাস ও রক্তক্ষয়ী অভিযানের পর মো. মোবারক ওরফে ‘গলাকাটা মোবারক’কে তাঁর ৩ বিশ্বস্ত সহযোগীসহ গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
আটকের সময় ওয়াশরুমের ছাদ থেকে পুলিশকে লক্ষ্য করে একাধারে ৬ রাউন্ড গুলি ছোড়ে মোবারক। পাল্টা গুলি চালিয়ে তাঁকে কাবু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। উদ্ধার করা হয় ৩টি পিস্তল, ২৩ রাউন্ড পিস্তলের তাজা গুলি ও ৪টি শটগানের গুলি। তাজ্জব বানানোর বিষয় হলো—গ্রেপ্তারের সময় মোবারকের হাতে যে পিস্তলটি ছিল, সেটি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট নগরীর কোতোয়ালি থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র!
আটক অপর তিন সহযোগীকেও একই সঙ্গে কড়া হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ।
রংমিস্ত্রি থেকে ত্রাস: শিবিরের হাত ধরে ‘ডেভিড ইমন’ গ্যাংয়ে উত্থান
ফটিকছড়ির কাঞ্চননগর ইউনিয়নের হাছি চৌধুরী বাড়ির মো. লোকমানের ছেলে মোবারকের অপরাধ দুনিয়ায় হাতেখড়ি বেশ চমকপ্রদ। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বলতে শুধু নিজের নামটুকু স্বাক্ষর করতে পারেন, পড়তে জানেন না এক বর্ণও। কর্মজীবন শুরু করেছিলেন একজন সাধারণ রংমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে। তবে ২০১৪ সালে ফটিকছড়িতে বাবু নামের এক ব্যক্তিকে নৃশংসভাবে গলা কেটে হত্যা করার পর থেকে তাঁর নামের পাশে পাকাপাকিভাবে যুক্ত হয় ‘গলাকাটা’ বিশেষণ।
পুলিশি তথ্য মতে, শিবিরের ক্যাডার হিসেবে পরিচিত নাছিরের হাত ধরে অপরাধের চোরাগলিতে পা রাখেন মোবারক। পরবর্তীতে উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী আবু তৈয়ব এবং কাঞ্চননগরের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ও বিতর্কিত নেতা আবুল কাশেমের ছায়াতলে থেকে নিজের সম্রাজ্য বিস্তৃত করেন।
সবশেষ ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর তিনি যোগ দেন শীর্ষ সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ‘ডেভিড ইমন’ (বর্তমানে জেলে) এবং বিদেশে পলাতক ‘বড় সাজ্জাদ’ গ্যাংয়ে। সাজ্জাদ বাহিনীতে অস্ত্র চালনায় অত্যন্ত দক্ষ ও দুর্ধর্ষ ক্যাডার হিসেবে ডেভিড ইমনের ‘সেকেন্ড-ইন-কমান্ড’ পদ বাগিয়ে নেন মোবারক।
‘দু-হাতে গুলি চালানো শখ’, সাথে ঘুমাতেন সাব-মেশিনগান নিয়ে!
গ্রেপ্তারের পর পুলিশকে দেওয়া প্রাথমিক স্বীকারোক্তিতে উঠে এসেছে মোবারকের দুর্ধর্ষ মনস্তত্ত্ব। তিনি জানান—দুই হাতে একসঙ্গে পিস্তল উঁচিয়ে গুলি চালানো তাঁর এক অদ্ভুত ‘শখ’। গত ১৩ জুন রাউজানের চৌমুহনী বাজারে প্রকাশ্যে উপজেলা যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুদুল হক চৌধুরীকে তাড়া করে এবং ফেলে দিয়ে সিসিটিভির সামনে দুই হাতে গুলি চালিয়ে বীরদর্পে চলে যান মোবারক। মাথায় গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করার পর সিএনজি হাঁকিয়ে চম্পট দেন তিনি।
শুধু তাই নয়, ধরাছোঁয়া থেকে বাঁচতে মোবারক শোয়ার ঘরে বালিশের পাশে বা হাতের নাগালের মধ্যেই রাখতেন এসএমজি (সাব-মেশিনগান)। ঘুমানোর সময়ও অত্যাধুনিক অস্ত্র সঙ্গে রাখা ছিল তাঁর বিশেষ অভ্যাস। পুলিশের তল্লাশিতে প্রাপ্ত এক ছবিতেও দেখা যায়, এসএমজি কোলে নিয়ে ঘুমিয়ে আছেন মোবারক।
চট্টগ্রাম জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজী মো. তারেক আজিজ জানান—
“জিজ্ঞাসাবাদে মোবারক স্বীকার করেছেন ছবিতে থাকা এসএমজিটি বর্তমানে পলাতক সন্ত্রাসী রায়হানের কাছে রয়েছে। সেটি উদ্ধারে আমাদের অভিযান জোরদার করা হয়েছে।”
৭টি খুন, কোটি টাকার চাঁদাবাজি ও পাহাড়ি বিচ্ছিন্নতাবাদী যোগসূত্র
কেবল যুবদল নেতা মাসুদুল হকই নন—রাউজানের গাজীপাড়ায় ইব্রাহিম খুন, পতেঙ্গা সৈকতে ঢাকাইয়া আকবর হত্যা, বাকলিয়া এক্সেস রোডে জোড়া খুন, অক্সিজেন-পশ্চিম কুয়াইশে জোড়া খুন এবং চান্দগাঁওয়ে ব্যবসায়ী তাহসীন হত্যাসহ অন্তত ৭টি চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি মোবারকের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ।
পাশাপাশি চন্দনপুরায় 스마트 গ্রুপের মালিক ও সাবেক এমপির বাড়িতে এবং হাটহাজারীর মেখলে ইটভাটার মালিকের বাড়িতে কোটি টাকা ও ৫০ লাখ টাকার চাঁদার দাবিতে প্রকাশ্যে এসএমজি ও চায়নিজ রাইফেল নিয়ে গুলি চালানোর সিসিটিভি ফুটেজেও শনাক্ত হয়েছেন এই সন্ত্রাসী।
পাহাড়ের নিরাপদ আশ্রয়ের রহস্য:
নগরে খুন বা তাণ্ডব চালিয়েই মোবারক লুকিয়ে পড়তেন ফটিকছড়ি ও রাউজানের গভীর পাহাড়ে। পুলিশ জানায়, মোবারকের প্রথম স্ত্রী ডলি চাকমার মাধ্যমে পাহাড়ি একটি সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ট সখ্য গড়ে ওঠে। সেই সুবাদেই দুর্গম পাহাড়কে তিনি নিরাপদ আস্তানা এবং অবৈধ অস্ত্র কেনাবেচার ট্রানজিট পয়েন্ট বানিয়েছিলেন।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন—
“মোবারক বড় সাজ্জাদের নির্দেশনা অক্ষরে অক্ষরে পালন করতেন। বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের সাথে তাঁর যোগাযোগের বিষয়টি আমরা গভীর গুরুত্বের সাথে তদন্ত করছি।”














