ফরিদপুরে ব্যাংক কর্মকর্তাকে অপহরণ: হাতুড়িপেটা করে আদায় ১ লাখ টাকা
- আপডেট সময় : ০১:৪৩:৫৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬
- / 46
ফাঁকা মহাসড়ক, দিনের আলো ফুটতেই ছদ্মবেশী যাত্রীবাহী এক সাদা প্রাইভেটকার! চালকের মিষ্টি আশ্বাসে গাড়িতে পা রাখাই যেন ডেকে আনল নারকীয় তাণ্ডব। দুই মিনিটের মাথায় মুখ গামছায় শক্ত করে বেঁধে চলন্ত গাড়ির ভেতরেই হাতুড়ি দিয়ে শুরু হলো বেদম পেটানো। মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচতে পরিবারের পাঠানো মুক্তিপণের ১ লাখ টাকা পেয়ে শেষমেশ রক্তভেজা অসচেতন শরীরটা মহাসড়কে আছড়ে ফেলে দিয়ে সটকে পড়ল দুষ্কৃতকারীরা—ফরিদপুরের ভাঙ্গায় এমন এক দুর্ধর্ষ অপহরণ যেন কোনো ক্রাইম থ্রিলারের চিত্রনাট্য!
ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলায় দিনের আলোতেই চরম নিরাপত্তা শঙ্কার ঘটনা ঘটেছে। এক বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তাকে যাত্রী তোলার ছলে প্রাইভেটকারে তুলে অস্ত্রের মুখে অপহরণ, চলন্ত গাড়িতে হাতুড়িপেটা ও জিম্মি করে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে এক লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায়ের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে এক সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে।
গতকাল সোমবার (২ নভেম্বর ২০২৬) দুপুরে ফরিদপুর-বরিশাল মহাসড়কের পাশে আশঙ্কাজনক ও অসচেতন অবস্থায় ওই ব্যাংক কর্মকর্তাকে ফেলে রেখে যায় দুর্বৃত্তরা। এর আগে সকাল সোয়া সাতটার দিকে ভাঙ্গা পৌরসভার দক্ষিণপাড়া বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে তাঁকে কৌশলে প্রাইভেটকারে তুলে নেওয়া হয়েছিল।
নির্যাতনের শিকার ব্যাংক কর্মকর্তার নাম বাহাউদ্দিন শেখ (৩৪)। তিনি ভাঙ্গা পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ছিলাধরচর মহল্লার বাসিন্দা এবং প্রতিবেশী মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলার পাচ্চর এলাকার একটি বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত রয়েছেন। বর্তমানে তিনি ভাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন।
প্রাইভেটকারের ছদ্মবেশী ফাঁদ ও চলন্ত গাড়িতে নরকযাতনা
হাসপাতালের বেডে শুয়ে ঘটনার রোমহর্ষক বিবরণ দিয়ে ভুক্তভোগী বাহাউদ্দিন শেখ জানান, সোমবার সকাল সোয়া সাতটার দিকে জরুরি প্রয়োজনে ঢাকা যাওয়ার উদ্দেশে তিনি ভাঙ্গা পৌরসভার দক্ষিণপাড়া বাসস্ট্যান্ডে বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। এমন সময় একটি সাদা রঙের প্রাইভেটকার এসে তাঁর সামনে থামে। চালক নিজেকে ঢাকার যাত্রী বহনকারী উল্লেখ করে তাঁকে দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার প্রস্তাব দেন। গাড়ির ভেতরে আগে থেকেই বসা ৩ জন নিজেদের সাধারণ যাত্রী হিসেবে পরিচয় দিলে বাহাউদ্দিন সরল বিশ্বাসে গাড়িতে উঠে পড়েন।
কিন্তু গাড়িতে ওঠার ঠিক দুই মিনিটের মাথায় পাল্টে যায় পরিস্থিতি। বাহাউদ্দিনের বিবরণ অনুযায়ী, “কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই পেছনের সিটে থাকা দুজন আমার মুখ শক্ত করে বেঁধে ফেলে এবং এলোপাতাড়ি মারধর শুরু করে। তারা অস্ত্রের মুখে হুমকি দিয়ে পরিবারের কাছ থেকে ক্যাশ টাকা পাঠানোর চাপ দেয়। বাধা দিতে গেলে শক্ত হাতুড়ি দিয়ে আমার বুক, হাত ও পায়ে একের পর এক আঘাত করতে থাকে।”
তিনি জানান, প্রাইভেটকারটি প্রথমে ঢাকার দিকে কিছুদূর গিয়ে দিক পরিবর্তন করে আবার ভাঙ্গা হয়ে ফরিদপুর শহরের দিকে যায়। পরে লোকচক্ষুর আড়ালে থাকার জন্য গ্রামের কাঁচা রাস্তা দিয়েও ঘোরাঘুরি করতে থাকে অপহরণকারীরা।
১ লাখ টাকা মুক্তিপণ ও নিঃস্ব করে ফেলে যাওয়া
ঘটনা চলাকালীন বাহাউদ্দিনকে মারধরের ফোনকলের মাধ্যমেই চাঞ্চল্য ছড়ায় তাঁর পরিবারে। ভুক্তভোগীর চাচাতো ভাই সোহাগ শেখ জানান, “বাহাউদ্দিন ভাইকে অস্ত্রের মুখে রেখে আমাদের কাছে ফোন করে টাকা চায় দুষ্কৃতকারীরা। ভাইয়ের কান্না ও আকুতি শুনে বাধ্য হয়ে আমরা দ্রুত ১ লাখ টাকা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ওদের দেওয়া নম্বরে পাঠিয়ে দিই।”
মোবাইল ব্যাংকিংয়ে টাকা পৌঁছানো নিশ্চিত হওয়ার পর নির্জন মহাসড়কের পাশে অসচেতন ও রক্তাক্ত বাহাউদ্দিনকে ছুঁড়ে ফেলে দেয় দুর্বৃত্তরা। যাওয়ার সময় তাঁর মোবাইল ফোনের সিমটি খুলে নিয়ে যায় তারা, যাতে তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশ বা স্বজনদের অবস্থান ট্র্যাকিং না করা যায়।
চিকিৎসকের বক্তব্য ও আইনি পদক্ষেপ
ভাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসা সহকারী মো. আখতারুজ্জামান জানান, “আহত বাহাউদ্দিনের বুক, হাত ও পায়ের বিভিন্ন স্থানে তীব্র মারধরের ও কোপের জখম রয়েছে। শারীরিক আঘাতের ধরন দেখে প্রাথমিকভাবে স্পষ্ট ধারণা করা হচ্ছে যে, তাঁকে শক্ত হাতুড়ি বা কোনো ভারী বস্তু দিয়ে মারাত্মকভাবে আঘাত করা হয়েছে।”
বিষয়টি নিয়ে ভাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, “ঘটনাটি সম্পর্কে আমরা মৌখিকভাবে অবগত হয়েছি এবং প্রাথমিক তদন্ত শুরু করা হয়েছে। তবে লিখিত অভিযোগ পাওয়া মাত্রই জড়িত দুষ্কৃতকারী চক্রটিকে শনাক্ত ও গ্রেফতারের জন্য কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”












