ঢাকা ০৬:৩৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিএমডিসির অনুমোদন ছাড়াই হাজারীবাগে চেম্বার খুলে রোগী দেখছেন ডিপ্লোমাধারী গিয়াস উদ্দিন

‘নিউজ করলে পরিণতি খারাপ হবে, ভাই বিচারপতি!’—ভুয়া ডাক্তারের দাপট

দৈনিক জাগ্রত বাংলাদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ০১:০৫:০৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / 103

প্রেসক্রিপশনের পাতায় ডিগ্রির লম্বাচওড়া বহর—ডি.এম.এফ (ঢাকা), বি.এইচ.এস (স্বাস্থ্য), ডি.আই.এম.এস (ঢাকা)! নিচে শিশু ও স্ত্রীরোগে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হিসেবেও নিজেকে জাহির করার খামতি নেই। কিন্তু সেই প্রেসক্রিপশনের পেছনের সত্যিটা জানলে চমকে উঠতে হয়। রাজধানীর হাজারীবাগের বউবাজার জিগাতলা এলাকায় ‘মেসার্স বরিশাল ফার্মেসী’র আড়ালে দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে কোনো স্বীকৃত বিএমডিসি নিবন্ধন ছাড়াই নিয়মিত রোগী দেখে আসছেন গিয়াস উদ্দিন মিয়া নামের এক ব্যক্তি।

একটি সাধারণ ডিপ্লোমা কোর্স সম্পন্ন করেই নামের আগে ‘ডাক্তার’ পদবি ব্যবহার করে প্রতিদিন হাজারীবাগের নিরক্ষর ও দরিদ্র মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছেন তিনি। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) আইন অনুযায়ী যা স্পষ্টত দণ্ডনীয় অপরাধ।

বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় সরেজমিনে ওই ফার্মেসিতে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিদিনের মতো গিয়াস উদ্দিনের চেম্বারে রোগীদের উপচে পড়া ভিড়। প্রতি রোগীর থেকে ১০০ থেকে ২০০ টাকা ভিজিট নিয়ে সেদিনও অর্ধশতাধিক রোগী সামলেছেন তিনি।

স্বীকারোক্তি ও ‘বিচারপতি ভাই’-এর হুমকি!

অভিযোগের মুখোমুখি হতে গিয়াস উদ্দিন অকপটে স্বীকার করেন—১৯৮২ সালে মহাখালী ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে মাত্র একটি ডিপ্লোমা করেছিলেন তিনি। সেই সম্বল করেই চার দশক ধরে এই ব্যবসা ফেঁদে বসেছেন। আইনগতভাবে কোনো প্রেসক্রিপশন লেখার বা চিকিৎসা দেওয়ার অধিকার তাঁর নেই—একপর্যায়ে তাও মেনে নেন তিনি।

তবে ভুয়া ডাক্তারির কারণ হিসেবে নিজেকে ‘গরিবের ডাক্তার’ দাবি করার পর সাংবাদিকের প্রশ্নের মুখে আচমকাই চড়াও হন গিয়াস উদ্দিন। হুমকি দিয়ে বলেন—

“আমার ভাই বিচারপতি। নিউজ করার আগে সাবধান!”

স্থানীয় অধিবাসীদের ক্ষোভের অন্ত নেই। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন জানান, কোনো বিএমডিসি সনদ না থাকলেও প্রভাবশালীদের ভয় দেখিয়ে বছরের পর বছর ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন গিয়াস উদ্দিন। ভুল চিকিৎসায় কারও ক্ষতি হলেও তাঁর ‘বিচারপতি ভাই’-এর দাপটে কেউ মুখ খোলার সাহস পায় না।

সর্বশান্ত সাধারণ রোগী বনাম চিকিৎসকদের ক্ষোভ

ফাতেমা আক্তার নামের ১০ বছরের এক শিশুকন্যাকে নিয়ে এসেছিলেন তার বাবা। সারা শরীরে লালচে ছোপ ও প্রচণ্ড জ্বর নিয়ে আসা ফাতেমার বাবার ভাষ্য, নিরক্ষর হওয়ায় ডাক্তার আসল না ভুয়া তা যাচাইয়ের সুযোগ তাঁর নেই, তাই প্রতিবেশীদের কথায় ভরসা করেছেন।

এই বেআইনি কারবার নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)-এর মহাসচিব ডা. মোঃ জহিরুল ইসলাম শাকিল। তিনি কড়া ভাষায় জানান—

“বিএমডিসি-র সুনির্দিষ্ট সনদ ও বৈধ নিবন্ধন ছাড়া চিকিৎসা দেওয়া বা ‘ডাক্তার’ পদবি ব্যবহার করা আইনের চোখে চরম অপরাধ। এ ধরনের প্রতারক চক্র দেশের সমগ্র চিকিৎসা ব্যবস্থাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। অনতিবিলম্বে এদের বিরুদ্ধে বিএমডিসি ও সরকারের আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।”

বিএমডিসির অনুমোদন ছাড়াই হাজারীবাগে চেম্বার খুলে রোগী দেখছেন ডিপ্লোমাধারী গিয়াস উদ্দিন

‘নিউজ করলে পরিণতি খারাপ হবে, ভাই বিচারপতি!’—ভুয়া ডাক্তারের দাপট

আপডেট সময় : ০১:০৫:০৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রেসক্রিপশনের পাতায় ডিগ্রির লম্বাচওড়া বহর—ডি.এম.এফ (ঢাকা), বি.এইচ.এস (স্বাস্থ্য), ডি.আই.এম.এস (ঢাকা)! নিচে শিশু ও স্ত্রীরোগে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হিসেবেও নিজেকে জাহির করার খামতি নেই। কিন্তু সেই প্রেসক্রিপশনের পেছনের সত্যিটা জানলে চমকে উঠতে হয়। রাজধানীর হাজারীবাগের বউবাজার জিগাতলা এলাকায় ‘মেসার্স বরিশাল ফার্মেসী’র আড়ালে দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে কোনো স্বীকৃত বিএমডিসি নিবন্ধন ছাড়াই নিয়মিত রোগী দেখে আসছেন গিয়াস উদ্দিন মিয়া নামের এক ব্যক্তি।

একটি সাধারণ ডিপ্লোমা কোর্স সম্পন্ন করেই নামের আগে ‘ডাক্তার’ পদবি ব্যবহার করে প্রতিদিন হাজারীবাগের নিরক্ষর ও দরিদ্র মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছেন তিনি। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) আইন অনুযায়ী যা স্পষ্টত দণ্ডনীয় অপরাধ।

বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় সরেজমিনে ওই ফার্মেসিতে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিদিনের মতো গিয়াস উদ্দিনের চেম্বারে রোগীদের উপচে পড়া ভিড়। প্রতি রোগীর থেকে ১০০ থেকে ২০০ টাকা ভিজিট নিয়ে সেদিনও অর্ধশতাধিক রোগী সামলেছেন তিনি।

স্বীকারোক্তি ও ‘বিচারপতি ভাই’-এর হুমকি!

অভিযোগের মুখোমুখি হতে গিয়াস উদ্দিন অকপটে স্বীকার করেন—১৯৮২ সালে মহাখালী ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে মাত্র একটি ডিপ্লোমা করেছিলেন তিনি। সেই সম্বল করেই চার দশক ধরে এই ব্যবসা ফেঁদে বসেছেন। আইনগতভাবে কোনো প্রেসক্রিপশন লেখার বা চিকিৎসা দেওয়ার অধিকার তাঁর নেই—একপর্যায়ে তাও মেনে নেন তিনি।

তবে ভুয়া ডাক্তারির কারণ হিসেবে নিজেকে ‘গরিবের ডাক্তার’ দাবি করার পর সাংবাদিকের প্রশ্নের মুখে আচমকাই চড়াও হন গিয়াস উদ্দিন। হুমকি দিয়ে বলেন—

“আমার ভাই বিচারপতি। নিউজ করার আগে সাবধান!”

স্থানীয় অধিবাসীদের ক্ষোভের অন্ত নেই। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন জানান, কোনো বিএমডিসি সনদ না থাকলেও প্রভাবশালীদের ভয় দেখিয়ে বছরের পর বছর ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন গিয়াস উদ্দিন। ভুল চিকিৎসায় কারও ক্ষতি হলেও তাঁর ‘বিচারপতি ভাই’-এর দাপটে কেউ মুখ খোলার সাহস পায় না।

সর্বশান্ত সাধারণ রোগী বনাম চিকিৎসকদের ক্ষোভ

ফাতেমা আক্তার নামের ১০ বছরের এক শিশুকন্যাকে নিয়ে এসেছিলেন তার বাবা। সারা শরীরে লালচে ছোপ ও প্রচণ্ড জ্বর নিয়ে আসা ফাতেমার বাবার ভাষ্য, নিরক্ষর হওয়ায় ডাক্তার আসল না ভুয়া তা যাচাইয়ের সুযোগ তাঁর নেই, তাই প্রতিবেশীদের কথায় ভরসা করেছেন।

এই বেআইনি কারবার নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)-এর মহাসচিব ডা. মোঃ জহিরুল ইসলাম শাকিল। তিনি কড়া ভাষায় জানান—

“বিএমডিসি-র সুনির্দিষ্ট সনদ ও বৈধ নিবন্ধন ছাড়া চিকিৎসা দেওয়া বা ‘ডাক্তার’ পদবি ব্যবহার করা আইনের চোখে চরম অপরাধ। এ ধরনের প্রতারক চক্র দেশের সমগ্র চিকিৎসা ব্যবস্থাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। অনতিবিলম্বে এদের বিরুদ্ধে বিএমডিসি ও সরকারের আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।”