ঢাকা ০৮:৩২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফরিদপুরের ২৪ তরুণ লিবিয়ায় নিখোঁজ: ধরাছোঁয়ার বাইরে কেন পাচারকারী পারভেজ?

দৈনিক জাগ্রত বাংলাদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ১২:০০:১৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬
  • / 136

মাথার ওপর ঝুলছিল ঋণের বোঝা, ভিটেমাটি আর সম্বল বিক্রি করে জমানো শেষ সঞ্চয়টুকু তুলে দেওয়া হয়েছিল গ্রামের দালালের হাতে। স্বপ্ন ছিল প্রবাসে রক্ত পানি করে সংসারের অভাব দূর করার। কিন্তু সেই স্বপ্নই যে নিঃশব্দে এক দীর্ঘমেয়াদী অভিশাপ আর বুকভাঙা ক্রন্দনে পরিণত হবে, তা কে জানত!

ফরিদপুরের সালথা, নগরকান্দা ও বোয়ালমারী—এই তিন উপজেলার অন্তত ২৪ জন আশাবাদী তরুণ ২০২৩ সালে অবৈধ উপায়ে বা প্রলোভনে পড়ে লিবিয়া পাড়ি দিয়েছিলেন। কিন্তু তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে তাঁদের কোনো হদিস মিলছে না। তাঁরা কি লিবিয়ার কোনো গোপন বন্দিশালায় কাতরাচ্ছেন, নাকি অন্য কোনো অমানবিক পরিণতির শিকার হয়েছেন—সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত নিঃস্ব পরিবারগুলো।

নিখোঁজ তরুণের তালিকায় রয়েছেন সালথা উপজেলার রিয়াজ মোল্লা, তুহিন সরদার, ফিরোজ মোল্লা, তানভীর মোল্লা, মো. হাচিবুল হাসান, রবিউল ও সালমান মোল্লাসহ অন্তত ২৪ জন পথহারা সন্তান।

ঘরে ঘরে সন্তান হারানোর অঝোর অশ্রু

সালথার মাঝারদিয়া ইউনিয়নের নওয়াপাড়া গ্রামের নিখোঁজ মো. হাচিবুল হাচানের মা প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা দুয়ারে বসে প্রহর গোনেন। বুকচাপা কান্নায় তিনি বললেন—

“তিনটা বছর পার হয়ে গেল, আমার বাপটার কোনো খবর পাই না! প্রতিদিন ভাবি এই বুঝি ফোনের রিং বেজে উঠবে, ছেলেটা বলবে—‘মা, আমি বেঁচে আছি!’ সরকারের কাছে দুটি হাত জোড় করে ভিক্ষা চাই, আমার বুকের মানিককে জীবিত অবস্থায় দেশে ফিরিয়ে এনে দিন।”

একই আকুতি ভাওয়াল ইউনিয়নের বারখাদিয়া গ্রামের নিখোঁজ রবিউল ইসলামের বাবা নান্নু খানের। নিজের শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে ভিটেছাড়া হওয়ার উপক্রম তিনি। অশ্রুসিক্ত চোখে আক্ষেপ করে বলেন—

“জমিজমা বিক্রি করেছি, মানুষের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে ছেলেকে বিদেশে পাঠালাম। আজ টাকা-পয়সা সব শেষ, এদিকে ছেলেরও কোনো খোঁজ নেই! টাকা চাই না, আমি শুধু আমার সন্তানকে ফেরত চাই।”

কাঠগড়ায় দালাল পারভেজ, গা-ঢাকা দিয়ে পলাতক

ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর আঙুল এক সুরেই উঠছে সালথা এলাকার দালাল পারভেজ মোল্লার দিকে। অভিযোগ, ভালো চাকরি, আকর্ষণীয় বেতন ও নিরাপদ জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে পারভেজ এই তরুণদের লিবিয়ায় পাঠায়। এরপর থেকেই একে একে সবার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হতে থাকে।

অভিযোগের ব্যাপারে কথা বলতে বার খাইদিয়া গ্রামের বাসিন্দা পারভেজ মোল্লার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। পরে তাঁর বাড়িতে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সূত্র নিশ্চিত করেছে, ঘটনা চাউর হতেই দালাল পারভেজ এলাকা ছেড়ে চম্পট দিয়েছে।

পাচারের শিকার মানব উদ্ধার ও শিশু সুরক্ষা সংস্থার চেয়ারম্যান সৈয়দ খাইরুল ইসলাম জানান, ২৪টি পরিবারের সবাই আজ সহায়-সম্বল হারিয়ে পথে বসার উপক্রম। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে জরুরি কূটনৈতিক তৎপরতা ছাড়া এই তরুণদের উদ্ধার করা সম্ভব নয়।

প্রশাসনের পদক্ষেপ ও আশ্বাস

নগরকান্দা উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, স্বজনদের আবেদন পাওয়ার পর নিখোঁজদের পরিচয় ও নাগরিকত্ব যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলছে। ইতিবাচক রিপোর্ট জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।

এ বিষয়ে নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা আফরিন আশ্বাস দিয়ে জানান—

“এটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ও মানবিক একটি বিষয়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সাথে দ্রুত সমন্বয় করে নিখোঁজদের ফিরিয়ে আনতে সরকারিভাবে সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান করা হবে।”

অন্যদিকে, নগরকান্দা সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মুহাম্মদ আল ফাহাদ জানান, আন্তর্জাতিক ট্রাফিকিং বা প্রবাসীদের ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে একাধিক দপ্তরের সমন্বয় প্রয়োজন। স্থানীয় থানা ও সার্কেল অফিসের মাধ্যমে আইনানুগ আইনি কার্যক্রম চলমান রয়েছে। পাশাপাশি অভিযুক্ত মানবপাচারকারী দালাল চক্রের তথ্য সংগ্রহ ও তাদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশ তৎপর রয়েছে।

ফরিদপুরের ২৪ তরুণ লিবিয়ায় নিখোঁজ: ধরাছোঁয়ার বাইরে কেন পাচারকারী পারভেজ?

আপডেট সময় : ১২:০০:১৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬

মাথার ওপর ঝুলছিল ঋণের বোঝা, ভিটেমাটি আর সম্বল বিক্রি করে জমানো শেষ সঞ্চয়টুকু তুলে দেওয়া হয়েছিল গ্রামের দালালের হাতে। স্বপ্ন ছিল প্রবাসে রক্ত পানি করে সংসারের অভাব দূর করার। কিন্তু সেই স্বপ্নই যে নিঃশব্দে এক দীর্ঘমেয়াদী অভিশাপ আর বুকভাঙা ক্রন্দনে পরিণত হবে, তা কে জানত!

ফরিদপুরের সালথা, নগরকান্দা ও বোয়ালমারী—এই তিন উপজেলার অন্তত ২৪ জন আশাবাদী তরুণ ২০২৩ সালে অবৈধ উপায়ে বা প্রলোভনে পড়ে লিবিয়া পাড়ি দিয়েছিলেন। কিন্তু তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে তাঁদের কোনো হদিস মিলছে না। তাঁরা কি লিবিয়ার কোনো গোপন বন্দিশালায় কাতরাচ্ছেন, নাকি অন্য কোনো অমানবিক পরিণতির শিকার হয়েছেন—সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত নিঃস্ব পরিবারগুলো।

নিখোঁজ তরুণের তালিকায় রয়েছেন সালথা উপজেলার রিয়াজ মোল্লা, তুহিন সরদার, ফিরোজ মোল্লা, তানভীর মোল্লা, মো. হাচিবুল হাসান, রবিউল ও সালমান মোল্লাসহ অন্তত ২৪ জন পথহারা সন্তান।

ঘরে ঘরে সন্তান হারানোর অঝোর অশ্রু

সালথার মাঝারদিয়া ইউনিয়নের নওয়াপাড়া গ্রামের নিখোঁজ মো. হাচিবুল হাচানের মা প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা দুয়ারে বসে প্রহর গোনেন। বুকচাপা কান্নায় তিনি বললেন—

“তিনটা বছর পার হয়ে গেল, আমার বাপটার কোনো খবর পাই না! প্রতিদিন ভাবি এই বুঝি ফোনের রিং বেজে উঠবে, ছেলেটা বলবে—‘মা, আমি বেঁচে আছি!’ সরকারের কাছে দুটি হাত জোড় করে ভিক্ষা চাই, আমার বুকের মানিককে জীবিত অবস্থায় দেশে ফিরিয়ে এনে দিন।”

একই আকুতি ভাওয়াল ইউনিয়নের বারখাদিয়া গ্রামের নিখোঁজ রবিউল ইসলামের বাবা নান্নু খানের। নিজের শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে ভিটেছাড়া হওয়ার উপক্রম তিনি। অশ্রুসিক্ত চোখে আক্ষেপ করে বলেন—

“জমিজমা বিক্রি করেছি, মানুষের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে ছেলেকে বিদেশে পাঠালাম। আজ টাকা-পয়সা সব শেষ, এদিকে ছেলেরও কোনো খোঁজ নেই! টাকা চাই না, আমি শুধু আমার সন্তানকে ফেরত চাই।”

কাঠগড়ায় দালাল পারভেজ, গা-ঢাকা দিয়ে পলাতক

ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর আঙুল এক সুরেই উঠছে সালথা এলাকার দালাল পারভেজ মোল্লার দিকে। অভিযোগ, ভালো চাকরি, আকর্ষণীয় বেতন ও নিরাপদ জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে পারভেজ এই তরুণদের লিবিয়ায় পাঠায়। এরপর থেকেই একে একে সবার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হতে থাকে।

অভিযোগের ব্যাপারে কথা বলতে বার খাইদিয়া গ্রামের বাসিন্দা পারভেজ মোল্লার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। পরে তাঁর বাড়িতে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সূত্র নিশ্চিত করেছে, ঘটনা চাউর হতেই দালাল পারভেজ এলাকা ছেড়ে চম্পট দিয়েছে।

পাচারের শিকার মানব উদ্ধার ও শিশু সুরক্ষা সংস্থার চেয়ারম্যান সৈয়দ খাইরুল ইসলাম জানান, ২৪টি পরিবারের সবাই আজ সহায়-সম্বল হারিয়ে পথে বসার উপক্রম। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে জরুরি কূটনৈতিক তৎপরতা ছাড়া এই তরুণদের উদ্ধার করা সম্ভব নয়।

প্রশাসনের পদক্ষেপ ও আশ্বাস

নগরকান্দা উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, স্বজনদের আবেদন পাওয়ার পর নিখোঁজদের পরিচয় ও নাগরিকত্ব যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলছে। ইতিবাচক রিপোর্ট জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।

এ বিষয়ে নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা আফরিন আশ্বাস দিয়ে জানান—

“এটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ও মানবিক একটি বিষয়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সাথে দ্রুত সমন্বয় করে নিখোঁজদের ফিরিয়ে আনতে সরকারিভাবে সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান করা হবে।”

অন্যদিকে, নগরকান্দা সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মুহাম্মদ আল ফাহাদ জানান, আন্তর্জাতিক ট্রাফিকিং বা প্রবাসীদের ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে একাধিক দপ্তরের সমন্বয় প্রয়োজন। স্থানীয় থানা ও সার্কেল অফিসের মাধ্যমে আইনানুগ আইনি কার্যক্রম চলমান রয়েছে। পাশাপাশি অভিযুক্ত মানবপাচারকারী দালাল চক্রের তথ্য সংগ্রহ ও তাদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশ তৎপর রয়েছে।