ঢাকা ১২:০০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬, ৬ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফরিদপুরে দরপত্র কেনেন ১৯ জন, জমা পড়ে একটি

ফরিদপুরে বালু মহাল ইজারা: যুবলীগ নেতাকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ কৃষকদল নেতার বিরুদ্ধে

ফরিদপুর প্রতিনিধি:
  • আপডেট সময় : ১২:০২:৪১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৫ মার্চ ২০২৫
  • / 888

ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার ঘোষপুর ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত গড়াই নদীর লংকারচর বালু মহালের ইজারা নিয়ে লঙ্কাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটেছে। বিএনপি পন্থী ঠিকাদারদের ক্রয়কৃত দরপত্র জমা দিতে বাঁধা সৃষ্টি করে যুবলীগ নেতাকে ইজারা পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্বয়ং দলটির সাবেক সংসদ সদস্যের ও কৃষকদলের কেন্দ্রীয় নেতার বিরুদ্ধে। এতে বিক্রিত ১৯টি দরপত্রের মধ্যে জমা পড়ে মাত্র একটি দরপত্র।

দরপত্র প্রক্রিয়া ও ইজারা প্রদান:

গত ৬ ফেব্রুয়ারি জেলা প্রশাসন বোয়ালমারী উপজেলার গড়াই নদীর লংকারচর বালু মহালসহ তিনটি মধুখালী ও আলফাডাঙ্গার তিনটি বালু মহালের দরপত্রের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। লংকারচর বালু মহালের সরকারি মূল্য নির্ধারণ করা হয় ১ কোটি ২০ লাখ ৭৩ হাজার ৪১৮ টাকা। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, দরপত্র বিক্রয়ের শেষ দিন ছিল ২৫ ফেব্রুয়ারি এবং জমা দেওয়ার শেষ দিন ছিল ২৬ ফেব্রুয়ারি। ১৯টি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান দরপত্র ক্রয় করলেও জমা পড়ে মাত্র একটি দরপত্র। মেসার্স রবিউল ট্রেডার্সের স্বত্ত্বাধিকারী রবিউল ইসলাম দরপত্র জমা দেন। জেলা বালুমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সিদ্ধান্তে সরকার নির্ধারিত মূল্য থেকে প্রায় ৩৬ লাখ টাকা বেশি হওয়ায় ইজারাটি তাকে দেওয়া হয়।

অভিযোগ ও হুমকি:

বঞ্চিত ঠিকাদারদের অভিযোগ, ফরিদপুর-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও কৃষক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি খন্দকার নাসিরুল ইসলাম হুমকি-ধমকি ও ভয়ভীতি দেখিয়েছেন। তিনি যুবলীগ নেতা রবিউল ইসলামকে ইজারা পাইয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। রবিউল ইসলাম ফরিদপুর-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মজিবুর রহমান নিক্সন চৌধুরীর ঘনিষ্ঠজন এবং বোয়ালমারী উপজেলা যুবলীগের সদস্য ও ময়না ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি।

অভিযোগপত্র ও দাবি:

মেসার্স মোহনা ট্রেডার্সের স্বত্ত্বাধিকারী শেখ আজিজুল হক জেলা প্রশাসকের কাছে অভিযোগ করেন। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, রবিউলের সাথে বিএনপির ঊর্ধ্বতন নেতা জড়িত হয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে দরপত্র জমা দিতে বাধা দিয়েছেন এবং গুন্ডা বাহিনী দিয়ে দরপত্র ছিনিয়ে নিয়ে প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছেন। আজিজুল হক আরও বলেন, খন্দকার নাসিরুলের সাথে শর্ত ছিল আওয়ামী লীগের কেউ ইজারা নিতে পারবে না। কিন্তু বেশি টাকার বিনিময়ে যুবলীগ নেতাকে ইজারা দেওয়া হয়েছে। দরপত্র ক্রয়কারী প্রত্যেককে হুমকি দেওয়া হয়েছে এবং একজনকে তুলে নিয়ে ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে।

রবিউল ইসলামের বক্তব্য:

ইজারা পাওয়ার বিষয়ে রবিউল ইসলাম দাম্ভিকতার সুরে বলেন, “এই বালু মহাল আমার। বিগত দিনের মালিক আমি, বর্তমান মালিক আমি এবং ভবিষ্যতের মালিকও আমি। আমি সরকারের রাজস্ব বিভাগে ৫০ লাখ টাকা বেশি দিয়েছি। তাহলে আমাকে দিবে না, কাকে দিবে।”

খন্দকার নাসিরুলের প্রতিক্রিয়া:

অভিযোগ অস্বীকার করে খন্দকার নাসিরুল ইসলাম বলেন, “আমি তো কোনো বালুর ব্যবসা করি না। আমি কেন বাধা দিতে যাব। আমি বাধা দিয়েছি কোনো প্রমাণ দিতে পারবে? যারা আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে তারা মূলত আওয়ামী লীগ ও বিএনএমের লোক। ষড়যন্ত্র করে শিডিউল কিনে আমাকে হয়রানি করতেছে।”

 জেলা প্রশাসকের বক্তব্য:

জেলা প্রশাসক মো. কামরুল হাসান মোল্যা জানান, বিষয়টি নিয়ে কোনো অভিযোগ পাননি। তিনি বলেন, “আমার কাছে অভিযোগ আসেনি এবং আর এলেও এ অভিযোগ আমলে নেয়ার কিছু নেই। শিডিউল কিনে কেউ যদি ডিসি, ইউএনও অফিসে না দিতে পারে তাৎক্ষণিকভাবে আমাদের জানাবে কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে জানায়নি। তারা যদি আমার দপ্তরে এসে বাঁধার সৃষ্টি হয়ে আমাকে জানাতো তাহলে আমি দেখতাম কোন সেই পাওয়ারফুল লোক, কে সেই মাস্তান। বাইরে থেকে কেউ যদি বাঁধা সৃষ্টি করে সে বিষয়তো আমার মাথা ব্যাথার না। জমা দেয়ার পরে কেউ যদি ক্ষতিগ্রস্থ হয় বা অন্যায় অবিচারের শিকার হয় তাহলে আমার দেখার বিষয়।” তিনি আরও বলেন, বালু মহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় সিদ্ধান্তে নীতিমালা অনুযায়ী ইজারা দেওয়া হয়েছে এবং সরকারি মূল্যের চেয়ে প্রায় ৩৬ লাখ টাকা বেশি পাওয়ায় ইজারা দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম হয়নি।

এলাকাবাসীর প্রতিক্রিয়া:

এই ঘটনা এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।

ফরিদপুরে দরপত্র কেনেন ১৯ জন, জমা পড়ে একটি

ফরিদপুরে বালু মহাল ইজারা: যুবলীগ নেতাকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ কৃষকদল নেতার বিরুদ্ধে

আপডেট সময় : ১২:০২:৪১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৫ মার্চ ২০২৫

ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার ঘোষপুর ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত গড়াই নদীর লংকারচর বালু মহালের ইজারা নিয়ে লঙ্কাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটেছে। বিএনপি পন্থী ঠিকাদারদের ক্রয়কৃত দরপত্র জমা দিতে বাঁধা সৃষ্টি করে যুবলীগ নেতাকে ইজারা পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্বয়ং দলটির সাবেক সংসদ সদস্যের ও কৃষকদলের কেন্দ্রীয় নেতার বিরুদ্ধে। এতে বিক্রিত ১৯টি দরপত্রের মধ্যে জমা পড়ে মাত্র একটি দরপত্র।

দরপত্র প্রক্রিয়া ও ইজারা প্রদান:

গত ৬ ফেব্রুয়ারি জেলা প্রশাসন বোয়ালমারী উপজেলার গড়াই নদীর লংকারচর বালু মহালসহ তিনটি মধুখালী ও আলফাডাঙ্গার তিনটি বালু মহালের দরপত্রের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। লংকারচর বালু মহালের সরকারি মূল্য নির্ধারণ করা হয় ১ কোটি ২০ লাখ ৭৩ হাজার ৪১৮ টাকা। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, দরপত্র বিক্রয়ের শেষ দিন ছিল ২৫ ফেব্রুয়ারি এবং জমা দেওয়ার শেষ দিন ছিল ২৬ ফেব্রুয়ারি। ১৯টি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান দরপত্র ক্রয় করলেও জমা পড়ে মাত্র একটি দরপত্র। মেসার্স রবিউল ট্রেডার্সের স্বত্ত্বাধিকারী রবিউল ইসলাম দরপত্র জমা দেন। জেলা বালুমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সিদ্ধান্তে সরকার নির্ধারিত মূল্য থেকে প্রায় ৩৬ লাখ টাকা বেশি হওয়ায় ইজারাটি তাকে দেওয়া হয়।

অভিযোগ ও হুমকি:

বঞ্চিত ঠিকাদারদের অভিযোগ, ফরিদপুর-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও কৃষক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি খন্দকার নাসিরুল ইসলাম হুমকি-ধমকি ও ভয়ভীতি দেখিয়েছেন। তিনি যুবলীগ নেতা রবিউল ইসলামকে ইজারা পাইয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। রবিউল ইসলাম ফরিদপুর-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মজিবুর রহমান নিক্সন চৌধুরীর ঘনিষ্ঠজন এবং বোয়ালমারী উপজেলা যুবলীগের সদস্য ও ময়না ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি।

অভিযোগপত্র ও দাবি:

মেসার্স মোহনা ট্রেডার্সের স্বত্ত্বাধিকারী শেখ আজিজুল হক জেলা প্রশাসকের কাছে অভিযোগ করেন। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, রবিউলের সাথে বিএনপির ঊর্ধ্বতন নেতা জড়িত হয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে দরপত্র জমা দিতে বাধা দিয়েছেন এবং গুন্ডা বাহিনী দিয়ে দরপত্র ছিনিয়ে নিয়ে প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছেন। আজিজুল হক আরও বলেন, খন্দকার নাসিরুলের সাথে শর্ত ছিল আওয়ামী লীগের কেউ ইজারা নিতে পারবে না। কিন্তু বেশি টাকার বিনিময়ে যুবলীগ নেতাকে ইজারা দেওয়া হয়েছে। দরপত্র ক্রয়কারী প্রত্যেককে হুমকি দেওয়া হয়েছে এবং একজনকে তুলে নিয়ে ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে।

রবিউল ইসলামের বক্তব্য:

ইজারা পাওয়ার বিষয়ে রবিউল ইসলাম দাম্ভিকতার সুরে বলেন, “এই বালু মহাল আমার। বিগত দিনের মালিক আমি, বর্তমান মালিক আমি এবং ভবিষ্যতের মালিকও আমি। আমি সরকারের রাজস্ব বিভাগে ৫০ লাখ টাকা বেশি দিয়েছি। তাহলে আমাকে দিবে না, কাকে দিবে।”

খন্দকার নাসিরুলের প্রতিক্রিয়া:

অভিযোগ অস্বীকার করে খন্দকার নাসিরুল ইসলাম বলেন, “আমি তো কোনো বালুর ব্যবসা করি না। আমি কেন বাধা দিতে যাব। আমি বাধা দিয়েছি কোনো প্রমাণ দিতে পারবে? যারা আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে তারা মূলত আওয়ামী লীগ ও বিএনএমের লোক। ষড়যন্ত্র করে শিডিউল কিনে আমাকে হয়রানি করতেছে।”

 জেলা প্রশাসকের বক্তব্য:

জেলা প্রশাসক মো. কামরুল হাসান মোল্যা জানান, বিষয়টি নিয়ে কোনো অভিযোগ পাননি। তিনি বলেন, “আমার কাছে অভিযোগ আসেনি এবং আর এলেও এ অভিযোগ আমলে নেয়ার কিছু নেই। শিডিউল কিনে কেউ যদি ডিসি, ইউএনও অফিসে না দিতে পারে তাৎক্ষণিকভাবে আমাদের জানাবে কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে জানায়নি। তারা যদি আমার দপ্তরে এসে বাঁধার সৃষ্টি হয়ে আমাকে জানাতো তাহলে আমি দেখতাম কোন সেই পাওয়ারফুল লোক, কে সেই মাস্তান। বাইরে থেকে কেউ যদি বাঁধা সৃষ্টি করে সে বিষয়তো আমার মাথা ব্যাথার না। জমা দেয়ার পরে কেউ যদি ক্ষতিগ্রস্থ হয় বা অন্যায় অবিচারের শিকার হয় তাহলে আমার দেখার বিষয়।” তিনি আরও বলেন, বালু মহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় সিদ্ধান্তে নীতিমালা অনুযায়ী ইজারা দেওয়া হয়েছে এবং সরকারি মূল্যের চেয়ে প্রায় ৩৬ লাখ টাকা বেশি পাওয়ায় ইজারা দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম হয়নি।

এলাকাবাসীর প্রতিক্রিয়া:

এই ঘটনা এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।