ঢাকা ০২:০৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আবাসিক হোটেলে অভিযান

‘সব খোল, ঢাকলে মাইর হবে!’ কাঁদতে থাকা নারীর উদ্দেশে পুলিশ

দৈনিক জাগ্রত বাংলাদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ১০:২৬:০৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / 198

আদালতের কোনো রায় হয়নি, অপরাধও প্রমাণিত হয়নি। অথচ বিচার শুরুর আগেই একদল নারীদের ধরে এনে ক্যামেরার সামনে কাপড় টেনে মুখ উন্মুক্ত করার নারকীয় উৎসব চলল! কেউ শাড়ির আঁচল দিয়ে, কেউ মাস্ক ধরে, আবার কেউ দু’হাত দিয়ে নিজের সম্ভ্রম ও মুখমণ্ডল ঢেকে রাখার আকুতি জানাচ্ছিলেন। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নারী সদস্যদের কড়া হুংকার—‘সব খোল, সব খোল, এই মাস্ক খোল, ঢাকবি না, ঢাকলে কিন্তু মাইর হবে!’

রাজধানীর উত্তরায় গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) এক অভিযানে আটক নারীদের ওপর চালানো এমন অনৈতিক ও অমানবিক আচরণের একটি ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই দেশজুড়ে তোলপাড় ও তীব্র ধিক্কারের ঝড় উঠেছে।

১২ আগস্টের সেই রুদ্ধশ্বাস অভিযান ও ক্যামেরার পেছনে ‘ভিউ বাণিজ্য’

অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ১২ আগস্ট রাজধানীর আবদুল্লাহপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকার ‘নিউ রংধনু আবাসিক হোটেলে’ অভিযান চালায় ডিবি উত্তরা বিভাগের একটি দল। অভিযানের খবর সংগ্রহ করতে বা নিরপেক্ষ কোনো উদ্দেশ্যে নয়, বরং ঢাকঢোল পিটিয়ে ‘ভিউ’ অর্জনের জন্য আগে থেকেই ডেকে আনা হয়েছিল একদল ইউটিউবার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরকে।

প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, ডিবির নারী সদস্যরা আটক নারীদের হাত ও মুখের পোশাক জোর করে সরিয়ে ক্যামেরার দিকে মুখ ঘোরাতে বাধ্য করছেন। এই সময় এক নারীকে অঝোরে কাঁদতে দেখা গেলেও রেহাই মেলেনি।

ডিবি উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইলিয়াস কবিরের উপস্থিতিতেই এমন ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ। ভিডিওতে তাঁকেও মাস্ক পরা অবস্থায় মুখ সরানোর নির্দেশনা দিতে শোনা যায়।

যদিও অভিযোগ অস্বীকার করে ডিসি ইলিয়াস কবির পরে দাবি করেন, পরিচয় নিশ্চিত হতে মাস্ক সরাতে বলা হতে পারে এবং বিষয়টি কনটেন্ট ক্রিয়েটর বা মিডিয়ার কাজ। নিজের দায় এড়িয়ে ডিবির ওই উর্ধ্বতন কর্মকর্তার মন্তব্য—“ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু করা হয়নি। আমরা তো মানুষ, ফেরেশতা না, টুকটাক ভুল হতেই পারে।”

আইন ও সংবিধানকে বুড়ো আঙুল, সোচ্চার বিশিষ্টজনেরা

সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে—কাউকে নিষ্ঠুর, অমানবিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড বা ব্যবহার করা যাবে না। অধিকন্তু, ২০১২ সালে হাইকোর্ট স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, গ্রেপ্তার বা সন্দেহভাজনদের গণমাধ্যমের সামনে এভাবে হাজির করা বন্ধ করতে হবে। বর্তমানে পুলিশ ও র‌্যাব প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে মুখ ব্লার (অস্পষ্ট) করার নিয়ম চর্চা করলেও বাস্তব অভিযানে ইউটিউবারদের ডেকে এনে লাইভ বাণিজ্যের অনৈতিক সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সাইফুল আলম চৌধুরী এবং মানবাধিকারকর্মী নূর খান এ ঘটনাকে চরম বেআইনি ও নাগরিক অধিকারের লঙ্ঘন বলে আখ্যা দিয়েছেন। বিশিষ্টজনদের অভিযোগ, আবাসিক হোটেল বা পানশালায় অভিযানগুলো প্রায়শই ঘটে ‘মাসোয়ারা ও লেনদেনের অমিল’ হলে। আর আসল অপরাধীদের আড়াল করে ইউটিউবার ডেকে নারীদের প্রকাশ্যে লাঞ্ছিত করা মূলত আইনি ব্যবস্থার নামে ক্ষমতার অপব্যবহার।

আবাসিক হোটেলে অভিযান

‘সব খোল, ঢাকলে মাইর হবে!’ কাঁদতে থাকা নারীর উদ্দেশে পুলিশ

আপডেট সময় : ১০:২৬:০৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আদালতের কোনো রায় হয়নি, অপরাধও প্রমাণিত হয়নি। অথচ বিচার শুরুর আগেই একদল নারীদের ধরে এনে ক্যামেরার সামনে কাপড় টেনে মুখ উন্মুক্ত করার নারকীয় উৎসব চলল! কেউ শাড়ির আঁচল দিয়ে, কেউ মাস্ক ধরে, আবার কেউ দু’হাত দিয়ে নিজের সম্ভ্রম ও মুখমণ্ডল ঢেকে রাখার আকুতি জানাচ্ছিলেন। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নারী সদস্যদের কড়া হুংকার—‘সব খোল, সব খোল, এই মাস্ক খোল, ঢাকবি না, ঢাকলে কিন্তু মাইর হবে!’

রাজধানীর উত্তরায় গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) এক অভিযানে আটক নারীদের ওপর চালানো এমন অনৈতিক ও অমানবিক আচরণের একটি ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই দেশজুড়ে তোলপাড় ও তীব্র ধিক্কারের ঝড় উঠেছে।

১২ আগস্টের সেই রুদ্ধশ্বাস অভিযান ও ক্যামেরার পেছনে ‘ভিউ বাণিজ্য’

অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ১২ আগস্ট রাজধানীর আবদুল্লাহপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকার ‘নিউ রংধনু আবাসিক হোটেলে’ অভিযান চালায় ডিবি উত্তরা বিভাগের একটি দল। অভিযানের খবর সংগ্রহ করতে বা নিরপেক্ষ কোনো উদ্দেশ্যে নয়, বরং ঢাকঢোল পিটিয়ে ‘ভিউ’ অর্জনের জন্য আগে থেকেই ডেকে আনা হয়েছিল একদল ইউটিউবার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরকে।

প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, ডিবির নারী সদস্যরা আটক নারীদের হাত ও মুখের পোশাক জোর করে সরিয়ে ক্যামেরার দিকে মুখ ঘোরাতে বাধ্য করছেন। এই সময় এক নারীকে অঝোরে কাঁদতে দেখা গেলেও রেহাই মেলেনি।

ডিবি উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইলিয়াস কবিরের উপস্থিতিতেই এমন ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ। ভিডিওতে তাঁকেও মাস্ক পরা অবস্থায় মুখ সরানোর নির্দেশনা দিতে শোনা যায়।

যদিও অভিযোগ অস্বীকার করে ডিসি ইলিয়াস কবির পরে দাবি করেন, পরিচয় নিশ্চিত হতে মাস্ক সরাতে বলা হতে পারে এবং বিষয়টি কনটেন্ট ক্রিয়েটর বা মিডিয়ার কাজ। নিজের দায় এড়িয়ে ডিবির ওই উর্ধ্বতন কর্মকর্তার মন্তব্য—“ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু করা হয়নি। আমরা তো মানুষ, ফেরেশতা না, টুকটাক ভুল হতেই পারে।”

আইন ও সংবিধানকে বুড়ো আঙুল, সোচ্চার বিশিষ্টজনেরা

সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে—কাউকে নিষ্ঠুর, অমানবিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড বা ব্যবহার করা যাবে না। অধিকন্তু, ২০১২ সালে হাইকোর্ট স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, গ্রেপ্তার বা সন্দেহভাজনদের গণমাধ্যমের সামনে এভাবে হাজির করা বন্ধ করতে হবে। বর্তমানে পুলিশ ও র‌্যাব প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে মুখ ব্লার (অস্পষ্ট) করার নিয়ম চর্চা করলেও বাস্তব অভিযানে ইউটিউবারদের ডেকে এনে লাইভ বাণিজ্যের অনৈতিক সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সাইফুল আলম চৌধুরী এবং মানবাধিকারকর্মী নূর খান এ ঘটনাকে চরম বেআইনি ও নাগরিক অধিকারের লঙ্ঘন বলে আখ্যা দিয়েছেন। বিশিষ্টজনদের অভিযোগ, আবাসিক হোটেল বা পানশালায় অভিযানগুলো প্রায়শই ঘটে ‘মাসোয়ারা ও লেনদেনের অমিল’ হলে। আর আসল অপরাধীদের আড়াল করে ইউটিউবার ডেকে নারীদের প্রকাশ্যে লাঞ্ছিত করা মূলত আইনি ব্যবস্থার নামে ক্ষমতার অপব্যবহার।