ফরিদপুরে ভিডব্লিউবি কার্ড চাল আত্মসাৎ: চেয়ারম্যান মুকুল বিপাকে
- আপডেট সময় : ০১:২৮:১২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ জুলাই ২০২৫
- / 445
ফরিদপুর জেলার মধুখালী উপজেলার কোড়কদি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মুকুল হোসেন রিক্তের বিরুদ্ধে ভিডব্লিউবি, ভিজিএফ, কাবিখা, কাবিটা, টিআর সহ বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় জনগণ, সুবিধাভোগী এবং সংশ্লিষ্ট মহল থেকে পাওয়া অভিযোগের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ‘জুলাই বিপ্লবের’ পর থেকে তিনি বেশিরভাগ সময় এলাকাছাড়া এবং তার অনুপস্থিতিতেই এসব দুর্নীতি জেঁকে বসেছে।
উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাৎ
চেয়ারম্যান মুকুল হোসেন রিক্তের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি স্থানীয় বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দকৃত অর্থ সঠিকভাবে কাজে না লাগিয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করছেন। বিশেষ করে রাস্তা নির্মাণ, সোলার লাইট স্থাপন এবং পরিষদের ডিজিটাল সেন্টারসহ অন্যান্য উন্নয়ন কাজগুলোতে বাজেটের তুলনায় কাজের মান অত্যন্ত নিম্নমানের। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে কাজ না করেই প্রকল্পের টাকা উত্তোলন এবং একই প্রকল্প একাধিকবার দেখিয়ে অর্থ আত্মসাতের মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে।
গণস্বাক্ষর ও ভিডব্লিউবি/ভিজিএফ বণ্টনে দুর্নীতির অভিযোগ
ভুক্তভোগী এলাকাবাসীর দাবি, তারা নিজেদের অর্থে মাটি দিয়ে যে রাস্তা তৈরি করেছেন, চেয়ারম্যান মুকুল হোসেন রিক্ত সেই রাস্তাকে সরকারি প্রকল্প দেখিয়ে টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এটিকে তারা সম্পূর্ণ জালিয়াতি বলে অভিহিত করেছেন। এছাড়াও, ভিডব্লিউবি কার্ডের চাল সুবিধাভোগীদের না দিয়ে চেয়ারম্যান আত্মসাৎ করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
ভুক্তভোগী তহমিনা অভিযোগ করে বলেন, “আমার নামে যে কার্ড হয়েছে আমি জানতামই না। ঈদের আগে চৌকিদার খবর দিলে আমি পরিষদে যাই, তখন আমাকে পাঁচ বস্তা চাল দেন। ঈদের পরে আরও এক বস্তা চাল দেয়। আমি মোট ছয় বস্তা চাল পাই। পরবর্তীতে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি আমার নামে ভিডব্লিউবি কার্ড হয়েছিল। আমার মোট চাল পাওয়ার কথা ছিল ২৪ বস্তা, কিন্তু আমি চাল পেয়েছি দুই বছরে মাত্র ৬ বস্তা। আমার বাকি ১৮ বস্তা চাল এই চেয়ারম্যান মুকুল আত্মসাৎ করেছেন, আমি এর সঠিক বিচার চাই।” তিনি আরও বলেন, এই চাল পেলে তার সন্তানদের নিয়ে দুমুঠো ডাল-ভাত খেতে পারতেন।
কোড়কদি ইউনিয়নের প্রায় ১০০ জন ভিডব্লিউবি কার্ডধারী ব্যক্তি গত দুই বছর ধরে কোনো চাল পাননি বলেও অভিযোগ রয়েছে। গত কোরবানির ঈদের সময় ট্যাগ অফিসার না থাকায় মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার উপস্থিতিতে চাল বিতরণ করা হলে চেয়ারম্যান বাধ্য হয়ে ভিডব্লিউবি কার্ডধারী ব্যক্তিদের চাল দেন। এতে ভুক্তভোগীরা প্রশ্ন তুলেছেন, এতদিন তারা কেন চাল পাননি।
ভুক্তভোগীরা আরও জানান, চেয়ারম্যান যেকোনো কার্ড বিতরণে পক্ষপাতিত্ব করেন। প্রকৃত উপকারভোগীদের পরিবর্তে আত্মীয়-স্বজন এবং ক্ষমতাসীন মহলের লোকজনের হাতে এসব কার্ড তুলে দেওয়া হয়।
ত্রাণ সামগ্রী আত্মসাৎ ও ক্ষমতার অপব্যবহার
বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগকালে ত্রাণ সামগ্রী সঠিকভাবে বিতরণ না করে বেশ কিছু মালামাল আত্মসাৎ করার অভিযোগও মুকুল হোসেন রিক্তের বিরুদ্ধে রয়েছে। স্থানীয় জনগণের দাবি, ত্রাণ বিতরণের তালিকা প্রস্তুতিতে স্বচ্ছতা ছিল না এবং বিতরণেও বড় ধরনের অনিয়ম করা হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের বিভিন্ন সভা ও প্রকল্প বাস্তবায়নে উপস্থিতি খাতায় জাল স্বাক্ষরের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলনের অভিযোগও পাওয়া গেছে।
চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে নিজের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার এবং জনপ্রতিনিধির আচরণে স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগও উঠেছে। স্থানীয়রা বলেন, তারা ভেবেছিলেন তিনি তাদের ভালো করবেন, কিন্তু এখন দেখছেন তিনিই সবচেয়ে বড় অনিয়মকারী। একজন বাসিন্দা বলেন, “ভোটে জেতার পর থেকেই উনার স্বভাব পাল্টে গেছে। নিজের লোক ছাড়া কাউকে ত্রাণ বা সুযোগ-সুবিধা দেন না।”
চেয়ারম্যানের অবস্থান ও তদন্তের দাবি
এ ব্যাপারে চেয়ারম্যান মুকুল হোসেন রিক্তের ভাই জানান, “৫ই আগস্টের পর থেকে মুকুল বেশিরভাগ সময় ঢাকায় রয়েছে। আমাদের আরও কিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে ঢাকায়, সে দেখাশোনা করে এবং রাজনৈতিক কারণে এলাকায় কিছু সমস্যায় চেয়ারম্যান এলাকার বাইরে আছেন।”
চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উঠেছে, তা অত্যন্ত গুরুতর। এ বিষয়ে উপজেলা প্রশাসন, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও স্থানীয় সরকার বিভাগ কর্তৃক নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে স্থানীয় জনগণ। যদি তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়, তবে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
এ বিষয়ে মধুখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবুল রাসেল বলেন, “লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। একটি তদন্ত কমিটি গঠন করবো, কমিটির তদন্ত রিপোর্ট অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”





















