ঢাকা ১০:৪০ অপরাহ্ন, সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফরিদপুর মেডিকেলে সিজারে বীথির মৃত্যু: ৫৫ হাজার টাকায় রফা

দৈনিক জাগ্রত বাংলাদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ০৬:০১:৩৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬
  • / 83

চিকিৎসা সেবার নামে এ যেন এক চরম অবহেলা ও পৈশাচিকতার দলিল! ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ (ফমেক) হাসপাতালে সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে চিকিৎসকের চরম গাফিলতির শিকার হন বীথি আক্তার (২৪) নামে এক প্রসূতি। অস্ত্রোপচারের পর পেটে গজ রেখে সেলাই করে দেওয়ার পর দীর্ঘ লড়াই শেষে ঢাকার মাটিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন তিনি। কিন্তু মৃত্যুর আগেই বিষয়টি ধামাচাপা দিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের মাত্র ৫৫ হাজার টাকার বিনিময়ে ‘আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না’ মর্মে চুক্তি করার ঘটনা প্রকাশ পেতেই তোলপাড় শুরু হয়েছে পুরো দেশজুড়ে।

নিহত বীথি আক্তার রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার উজানচর ইউনিয়নের জামতলার হাট জ্যেতিনবর্দিপাড়া গ্রামের রাকিবুল ইসলামের স্ত্রী। তিনি ফরিদপুর শহরের একটি নার্সিং কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন এবং একই সঙ্গে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই প্রশিক্ষণার্থী হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

পাঁচ মাসের যন্ত্রণা ও পেটে গজ কাণ্ড

ঘটনার সূত্রপাত গত ৬ মে। ফমেক হাসপাতালে বীথির সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার করেন একজন চিকিৎসক ও একজন ইন্টার্ন চিকিৎসক। অস্ত্রোপচারে তিনি এক ফুটফুটে পুত্রসন্তানের জন্ম দিলেও তারপর থেকেই শুরু হয় তীব্র শারীরিক জটিলতা। বারবার চিকিৎসকের দ্বারস্থ হলেও সাধারণ সমস্যা বলে তাঁকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

পরবর্তীতে দুটি বেসরকারি হাসপাতালে দুই দফা আল্ট্রাসনোগ্রামে ধরা পড়ে—বীথির পেটের ভেতর রেখে দেওয়া হয়েছে সার্জিক্যাল গজ কাপড়! বাধ্য হয়ে গত ১২ জুলাই তাঁকে আবারও ফমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অসুস্থতার দুই মাস নয় দিন পর, ১৫ জুলাই দ্বিতীয়বার অস্ত্রোপচার করে তাঁর পেট থেকে সেই গজ বের করেন সার্জারি বিভাগের চিকিৎসকেরা।

৫৫ হাজার টাকায় মুখ বন্ধের গোপন চুক্তি!

দ্বিতীয় অস্ত্রোপচারের পরেই শুরু হয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আসল চালবাজি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ১০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে করা একটি চুক্তিনামা থেকে জানা যায়, বীথির পরিবারের চরম আর্থিক সংকট ও অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে মাত্র ৫৫ হাজার টাকার ‘আর্থিক সহায়তা’ দেওয়া হয়।

চুক্তির শর্তে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়—ভবিষ্যতে প্রসূতির পরিবার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বা সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে কোনোপ্রকার আইনি ব্যবস্থা কিংবা বাড়তি আর্থিক দাবি করতে পারবে না! নথিতে বীথির স্বামী রাকিবুল ইসলামের স্বাক্ষর থাকলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও অন্য সাক্ষীদের স্বাক্ষর উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ঝাপসা করে দেওয়া হয়েছে।

ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বীথির স্বামী রাকিবুল ইসলাম ক্ষোভ ও কষ্টে ভেঙে পড়ে বলেন, “আমার স্ত্রী এই হাসপাতালেই কাজ করত, ভবিষ্যতে এখানেই ইন্টার্নি ও চাকরি পাওয়ার কথা ছিল। তাছাড়া ওই মুহূর্তে আমার চরম আর্থিক সংকট চলছিল। স্ত্রীর জীবন বাঁচানো আর ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেই আমি সেই আপসপত্রে সই করেছিলাম। তখন তো বুঝিনি এত বড় বিপর্যয় অপেক্ষা করছে! এখন সবাই আমাকে দোষ দিচ্ছে, যা আমি নিতে পারছি না। আমি এই ভুলের বিচার চাই।”

পরিণতি মৃত্যু, অতঃপর তদন্ত কমিটি

দ্বিতীয় অস্ত্রোপচারের পর সাময়িক ছাড়পত্র দেওয়া হলেও বীথির শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। গত ২০ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত তিনি ফের ফমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় ৪ অক্টোবর তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে পাঠানো হলে গত বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৮টায় সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।

এই ন্যক্কারজনক ঘটনায় ফমেক হাসপাতালের উপপরিচালক ও ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মানস কৃষ্ণ কুণ্ডু দাবি করেন, “টাকা দেওয়ার বিষয়টি আমার জানা নেই, তবে ফেসবুকে চুক্তিনামার বিষয়টি শুনেছি। বীথির চিকিৎসায় মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছিল। চিকিৎসায় কোনো অবহেলা হয়েছে কি না, তা তদন্তে সার্জারি বিভাগের প্রধান স্বপন কুমার বিশ্বাসকে প্রধান করে ৬ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ১০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

ফরিদপুর মেডিকেলে সিজারে বীথির মৃত্যু: ৫৫ হাজার টাকায় রফা

আপডেট সময় : ০৬:০১:৩৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬

চিকিৎসা সেবার নামে এ যেন এক চরম অবহেলা ও পৈশাচিকতার দলিল! ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ (ফমেক) হাসপাতালে সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে চিকিৎসকের চরম গাফিলতির শিকার হন বীথি আক্তার (২৪) নামে এক প্রসূতি। অস্ত্রোপচারের পর পেটে গজ রেখে সেলাই করে দেওয়ার পর দীর্ঘ লড়াই শেষে ঢাকার মাটিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন তিনি। কিন্তু মৃত্যুর আগেই বিষয়টি ধামাচাপা দিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের মাত্র ৫৫ হাজার টাকার বিনিময়ে ‘আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না’ মর্মে চুক্তি করার ঘটনা প্রকাশ পেতেই তোলপাড় শুরু হয়েছে পুরো দেশজুড়ে।

নিহত বীথি আক্তার রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার উজানচর ইউনিয়নের জামতলার হাট জ্যেতিনবর্দিপাড়া গ্রামের রাকিবুল ইসলামের স্ত্রী। তিনি ফরিদপুর শহরের একটি নার্সিং কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন এবং একই সঙ্গে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই প্রশিক্ষণার্থী হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

পাঁচ মাসের যন্ত্রণা ও পেটে গজ কাণ্ড

ঘটনার সূত্রপাত গত ৬ মে। ফমেক হাসপাতালে বীথির সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার করেন একজন চিকিৎসক ও একজন ইন্টার্ন চিকিৎসক। অস্ত্রোপচারে তিনি এক ফুটফুটে পুত্রসন্তানের জন্ম দিলেও তারপর থেকেই শুরু হয় তীব্র শারীরিক জটিলতা। বারবার চিকিৎসকের দ্বারস্থ হলেও সাধারণ সমস্যা বলে তাঁকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

পরবর্তীতে দুটি বেসরকারি হাসপাতালে দুই দফা আল্ট্রাসনোগ্রামে ধরা পড়ে—বীথির পেটের ভেতর রেখে দেওয়া হয়েছে সার্জিক্যাল গজ কাপড়! বাধ্য হয়ে গত ১২ জুলাই তাঁকে আবারও ফমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অসুস্থতার দুই মাস নয় দিন পর, ১৫ জুলাই দ্বিতীয়বার অস্ত্রোপচার করে তাঁর পেট থেকে সেই গজ বের করেন সার্জারি বিভাগের চিকিৎসকেরা।

৫৫ হাজার টাকায় মুখ বন্ধের গোপন চুক্তি!

দ্বিতীয় অস্ত্রোপচারের পরেই শুরু হয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আসল চালবাজি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ১০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে করা একটি চুক্তিনামা থেকে জানা যায়, বীথির পরিবারের চরম আর্থিক সংকট ও অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে মাত্র ৫৫ হাজার টাকার ‘আর্থিক সহায়তা’ দেওয়া হয়।

চুক্তির শর্তে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়—ভবিষ্যতে প্রসূতির পরিবার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বা সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে কোনোপ্রকার আইনি ব্যবস্থা কিংবা বাড়তি আর্থিক দাবি করতে পারবে না! নথিতে বীথির স্বামী রাকিবুল ইসলামের স্বাক্ষর থাকলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও অন্য সাক্ষীদের স্বাক্ষর উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ঝাপসা করে দেওয়া হয়েছে।

ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বীথির স্বামী রাকিবুল ইসলাম ক্ষোভ ও কষ্টে ভেঙে পড়ে বলেন, “আমার স্ত্রী এই হাসপাতালেই কাজ করত, ভবিষ্যতে এখানেই ইন্টার্নি ও চাকরি পাওয়ার কথা ছিল। তাছাড়া ওই মুহূর্তে আমার চরম আর্থিক সংকট চলছিল। স্ত্রীর জীবন বাঁচানো আর ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেই আমি সেই আপসপত্রে সই করেছিলাম। তখন তো বুঝিনি এত বড় বিপর্যয় অপেক্ষা করছে! এখন সবাই আমাকে দোষ দিচ্ছে, যা আমি নিতে পারছি না। আমি এই ভুলের বিচার চাই।”

পরিণতি মৃত্যু, অতঃপর তদন্ত কমিটি

দ্বিতীয় অস্ত্রোপচারের পর সাময়িক ছাড়পত্র দেওয়া হলেও বীথির শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। গত ২০ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত তিনি ফের ফমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় ৪ অক্টোবর তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে পাঠানো হলে গত বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৮টায় সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।

এই ন্যক্কারজনক ঘটনায় ফমেক হাসপাতালের উপপরিচালক ও ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মানস কৃষ্ণ কুণ্ডু দাবি করেন, “টাকা দেওয়ার বিষয়টি আমার জানা নেই, তবে ফেসবুকে চুক্তিনামার বিষয়টি শুনেছি। বীথির চিকিৎসায় মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছিল। চিকিৎসায় কোনো অবহেলা হয়েছে কি না, তা তদন্তে সার্জারি বিভাগের প্রধান স্বপন কুমার বিশ্বাসকে প্রধান করে ৬ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ১০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”