ফরিদপুরের কনা খানমকে ভারতে পাচার : জাহিদ শেখের যাবজ্জীবন
- আপডেট সময় : ০৭:৫৬:৫৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 133
ঢাকায় তৈরি পোশাক কারখানায় ভালো বেতনে চাকরি, তারপর আবার বিয়ের আশ্বাস! দরিদ্র পরিবারের চোখে যখন একটু সচ্ছলতার রঙিন স্বপ্ন, ঠিক তখনই অন্তরালে বুনছিল এক পৈশাচিক মানবপাচারের ছক। চাকরি ও বিয়ের টোপ ফেলে ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গার এক ভাগ্যহত তরুণীকে ভারতে পাচার করে অনৈতিক কাজে বাধ্য করার চেষ্টা চালানো হয়েছিল। তবে শত নির্যাতনের তোড়জোড় পেরিয়ে অবশেষে আইনের দীর্ঘ হাত ছুঁয়ে ফেলল অপরাধীকে।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) ফরিদপুরের মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোসা. শামীমা পারভীন এই চাঞ্চল্যকর মামলার রায় ঘোষণা করেন। আদালতের রায়ে প্রধান অভিযুক্ত জাহিদ শেখকে (৪৬) যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। রায় ঘোষণার সময় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি জাহিদ শেখ আদালতে অনুপস্থিত থাকায় তাঁর বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক গ্রেফতানি পরোয়ানা জারি করেন আদালত।
চাকরির আশ্বাস থেকে কেরালার জেলখানায় জীবন লড়াই
আদালত সূত্র ও মামলার নথিপত্র পর্যালোচনা করে জানা যায়, ঘটনার সূত্রপাত ২০১৫ সালের ১ জানুয়ারি। আলফাডাঙ্গা উপজেলার বাউতিপাড়া/স্থানীয় সুফিয়া বেগমের মেয়ে কনা খানমকে ঢাকায় ভালো বেতনে চাকরির আশ্বাস দিয়ে বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া হয়। এর দুদিন পর নড়াইল জেলার কালিয়া উপজেলার জাহিদ শেখ ওই বাড়িতে গিয়ে প্রতি মাসে ৮ হাজার টাকা বেতনে চাকরির সুব্যবস্থা করার আশ্বাস দিয়ে পরিবারকে আশ্বস্ত করেন।
এর প্রায় দুই মাস পর জাহিদ ও তাঁর সঙ্গীরা নতুন নাটক সাজায়। পরিবারকে জানানো হয় কনার সঙ্গে জাহিদের বিয়ের কথা চলছে এবং কনাও এতে রাজি। কিন্তু মেয়েকে দেখতে চাইলে পরিবারকে একের পর এক তালবাহানা করতে থাকে পাচারকারী চক্র। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পরও কনাকে ফিরিয়ে না দেওয়ায় স্বজনরা খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, কনাকে সীমান্ত পার করে ভারতে পাচার করে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে!
ভারতে কনাকে জোরপূর্বক অনৈতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত করার চেষ্টা চালানো হয়। সেখান থেকে পালিয়ে বাঁচতে গিয়ে ভারতের কেরালা রাজ্যে স্থানীয় পুলিশের হাতে আটক হন তিনি। পরবর্তীতে এক সদ্ব্যবহারকারী আইনজীবীর আইনি সহায়তায় দীর্ঘ লড়াই শেষে তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।
এক দশক পর জাস্টিস: পলাতক আসামিকে যাবজ্জীবন
দেশে ফিরে পরিবারের কাছে পাচারের শিউরে ওঠা বর্ণনা দেন কনা। এরপর তাঁর মা সুফিয়া বেগম ২০১৬ সালের ৫ মার্চ নড়াইলের কালিয়া উপজেলার জাহিদ শেখসহ মোট ছয়জনের নাম উল্লেখ করে আলফাডাঙ্গা থানায় একটি মানবপাচার মামলা দায়ের করেন। মামলাটির তদন্ত শেষে আলফাডাঙ্গা থানার তৎকালীন এসআই মো. কামরুজ্জামান চার্জশিট পেশ করেন।
দীর্ঘ সাক্ষ্যগ্রহণ ও আইনি প্রক্রিয়া শেষে অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় ট্রাইব্যুনাল অভিযুক্ত জাহিদ শেখকে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনের ৬ ধারায় যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা (অনাদায়ে আরও ১ বছরের জেল) নির্দেশ দেন। এ ছাড়া একই আইনের ১১ ধারায় তাঁকে আরও ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। দুটি সাজা একই সাথে কার্যকর হবে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়। তবে মামলায় অভিযুক্ত অপর পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় তাঁদের বেকসুর খালাস দিয়েছেন বিচারক।












