ঢাকা ১১:৫৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জুলাইয়ের রক্তে বাণিজ্য! ৮১% মামলা ঝুলিয়ে শত কোটি টাকার চাঁদাবাজি

দৈনিক জাগ্রত বাংলাদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ০২:৫৪:১২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / 78

রক্তঝরা চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী দিনগুলো বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশের এক নতুন ভোরের বার্তা নিয়ে এসেছিল। আমজনতা বুক বেঁধেছিল—আইনের রাজত্ব কায়েম হবে, স্বৈরাচারের জুলুমের বদলে প্রতিষ্ঠিত হবে ন্যায়বিচার। অথচ সেই রক্তভেজা অর্জনের ওপর আজ থাবা বসিয়েছে এক নির্মম ও পৈশাচিক বাস্তবতা! জুলাই আন্দোলনের সময়কার হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতার অভিযোগে দায়ের হওয়া ১ হাজার ৮৮০টি মামলাকে হাতিয়ার বানিয়ে ঢাকাসহ সারা দেশে এখন শুরু হয়েছে নজিরবিহীন ‘গ্রেফতার বাণিজ্য’।

অভিযোগ উঠেছে, মামলার দীর্ঘসূত্রতাকে কাজে লাগিয়ে অসাধু পুলিশ সদস্য ও স্থানীয় দালালচক্র মিলে গড়ে তুলেছে এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট। অগণিত নিরপরাধ মানুষকে গ্রেফতারের ভয় দেখিয়ে, রিমান্ডের হুমকি দিয়ে কিংবা জামিনের পর ‘শ্যোন অ্যারেস্ট’ না দেখানোর আশ্বাস বাণিজ্য করে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে লাখ লাখ টাকা।

৮১ শতাংশ মামলা ঝুলিয়ে কারসাজি: পরিসংখ্যানের ভয়াবহ চিত্র

পুলিশ সদর দপ্তরের হালনাগাদ হিসাব বলছে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর সারা দেশে ১ হাজার ৮৮০টি মামলা দায়ের হয়। যার মধ্যে ৮০৩টি ছিল সরাসরি হত্যা মামলা। কিন্তু গত দুই বছরেরও বেশি সময় পার হলেও মোট মামলার মধ্যে নিষ্পত্তি (চার্জশিট ও ফাইনাল রিপোর্ট) হয়েছে মাত্র ৩৫২টি।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মোট মামলার ৮১.৩ শতাংশ এবং হত্যা মামলার ৮১.৭ শতাংশই এখনো তদন্তের নামে ঝুলে রয়েছে! আর এই ঝুলে থাকা ১,৫২৮টি তদন্তাধীন মামলাই এখন অসাধু পুলিশ সদস্য ও দালালদের আয়ের প্রধান হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। নাম না থাকা সত্ত্বেও ‘অজ্ঞাতনামা আসামি’ বানানোর ভয় দেখিয়ে সচ্ছল ব্যবসায়ী, প্রবাসী পরিবার কিংবা সাবেক স্থানীয় রাজনীতি সংশ্লিষ্টদের ধরে এনে চালানো হচ্ছে দরকষাকষি। টাকা মিললে রাতেই মেলে ‘অনভিযুক্ত’ খালাস, আর না মিললে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে আদালতের অন্ধকার কোঠায়।

ভাটারা থেকে সিলেট: ভূতের মতো তাড়া করছে ‘শ্যোন অ্যারেস্ট’

রাজধানীর ভাটারা থানা এলাকার ঘটনা কিংবা সিলেটের দুই তরুণের গল্প—চিত্রনাট্য সর্বত্র একই। ভাটারায় দুই ভাইকে আটক করে ১০ লাখ টাকা দাবি করার পর ৫ লাখ টাকায় ছোট ভাইকে ছাড়া হলেও বড় ভাইকে চালান দেওয়া হয় পেন্ডিং মামলায়। পরে আবার ‘শ্যোন অ্যারেস্ট’ আটকানোর নামে নেওয়া হয় অতিরিক্ত টাকা!

একইভাবে গুরুতর অসুস্থ ও লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত নাছির উদ্দিনের মতো বয়োবৃদ্ধ মানুষ ঘটনার দিনে আইসিইউতে থেকেও আসামি হয়েছেন হত্যাচেষ্টা মামলায়।

সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা তৈরি হয়েছে আদালতের জামিন প্রক্রিয়া নিয়ে। জামিন পাওয়ার পর কারামুক্তির ৫টি আইনি ধাপ অতিক্রম করতে গিয়ে বিপদে পড়ছেন ভুক্তভোগীরা। ঘুসের টাকা না দিলেই সাজিয়ে রাখা হচ্ছে অন্য কোনো থানার নতুন মামলা। রাজধানীর শাহজাহানপুরের এক মাংস ব্যবসায়ী জামিন পাওয়ার পর জেলগেট থেকেই পর পর তিনটি মামলায় পুনঃগ্রেফতারের (শ্যোন অ্যারেস্ট) শিকার হয়ে অবশেষে মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে রেহাই পান।

‘অভিযোগ পেলেই অ্যাকশন’, দাবি পুলিশ সদর দপ্তরের

সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে জনমনে। পুলিশের ডিআইজি (ক্রাইম ম্যানেজমেন্ট) মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান অবশ্য জানান—

“জুলাই আন্দোলনের মামলাগুলো নিয়ে শুরুতে বাদীরা এক ধরনের বাণিজ্য করেছিল, যা এখন বন্ধ করা হয়েছে। ঝুলে থাকা মামলাগুলোর তদন্ত দ্রুত শেষ করার কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ক্ষেত্রবিশেষে অসাধু পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।”

জুলাইয়ের রক্তে বাণিজ্য! ৮১% মামলা ঝুলিয়ে শত কোটি টাকার চাঁদাবাজি

আপডেট সময় : ০২:৫৪:১২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রক্তঝরা চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী দিনগুলো বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশের এক নতুন ভোরের বার্তা নিয়ে এসেছিল। আমজনতা বুক বেঁধেছিল—আইনের রাজত্ব কায়েম হবে, স্বৈরাচারের জুলুমের বদলে প্রতিষ্ঠিত হবে ন্যায়বিচার। অথচ সেই রক্তভেজা অর্জনের ওপর আজ থাবা বসিয়েছে এক নির্মম ও পৈশাচিক বাস্তবতা! জুলাই আন্দোলনের সময়কার হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতার অভিযোগে দায়ের হওয়া ১ হাজার ৮৮০টি মামলাকে হাতিয়ার বানিয়ে ঢাকাসহ সারা দেশে এখন শুরু হয়েছে নজিরবিহীন ‘গ্রেফতার বাণিজ্য’।

অভিযোগ উঠেছে, মামলার দীর্ঘসূত্রতাকে কাজে লাগিয়ে অসাধু পুলিশ সদস্য ও স্থানীয় দালালচক্র মিলে গড়ে তুলেছে এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট। অগণিত নিরপরাধ মানুষকে গ্রেফতারের ভয় দেখিয়ে, রিমান্ডের হুমকি দিয়ে কিংবা জামিনের পর ‘শ্যোন অ্যারেস্ট’ না দেখানোর আশ্বাস বাণিজ্য করে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে লাখ লাখ টাকা।

৮১ শতাংশ মামলা ঝুলিয়ে কারসাজি: পরিসংখ্যানের ভয়াবহ চিত্র

পুলিশ সদর দপ্তরের হালনাগাদ হিসাব বলছে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর সারা দেশে ১ হাজার ৮৮০টি মামলা দায়ের হয়। যার মধ্যে ৮০৩টি ছিল সরাসরি হত্যা মামলা। কিন্তু গত দুই বছরেরও বেশি সময় পার হলেও মোট মামলার মধ্যে নিষ্পত্তি (চার্জশিট ও ফাইনাল রিপোর্ট) হয়েছে মাত্র ৩৫২টি।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মোট মামলার ৮১.৩ শতাংশ এবং হত্যা মামলার ৮১.৭ শতাংশই এখনো তদন্তের নামে ঝুলে রয়েছে! আর এই ঝুলে থাকা ১,৫২৮টি তদন্তাধীন মামলাই এখন অসাধু পুলিশ সদস্য ও দালালদের আয়ের প্রধান হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। নাম না থাকা সত্ত্বেও ‘অজ্ঞাতনামা আসামি’ বানানোর ভয় দেখিয়ে সচ্ছল ব্যবসায়ী, প্রবাসী পরিবার কিংবা সাবেক স্থানীয় রাজনীতি সংশ্লিষ্টদের ধরে এনে চালানো হচ্ছে দরকষাকষি। টাকা মিললে রাতেই মেলে ‘অনভিযুক্ত’ খালাস, আর না মিললে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে আদালতের অন্ধকার কোঠায়।

ভাটারা থেকে সিলেট: ভূতের মতো তাড়া করছে ‘শ্যোন অ্যারেস্ট’

রাজধানীর ভাটারা থানা এলাকার ঘটনা কিংবা সিলেটের দুই তরুণের গল্প—চিত্রনাট্য সর্বত্র একই। ভাটারায় দুই ভাইকে আটক করে ১০ লাখ টাকা দাবি করার পর ৫ লাখ টাকায় ছোট ভাইকে ছাড়া হলেও বড় ভাইকে চালান দেওয়া হয় পেন্ডিং মামলায়। পরে আবার ‘শ্যোন অ্যারেস্ট’ আটকানোর নামে নেওয়া হয় অতিরিক্ত টাকা!

একইভাবে গুরুতর অসুস্থ ও লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত নাছির উদ্দিনের মতো বয়োবৃদ্ধ মানুষ ঘটনার দিনে আইসিইউতে থেকেও আসামি হয়েছেন হত্যাচেষ্টা মামলায়।

সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা তৈরি হয়েছে আদালতের জামিন প্রক্রিয়া নিয়ে। জামিন পাওয়ার পর কারামুক্তির ৫টি আইনি ধাপ অতিক্রম করতে গিয়ে বিপদে পড়ছেন ভুক্তভোগীরা। ঘুসের টাকা না দিলেই সাজিয়ে রাখা হচ্ছে অন্য কোনো থানার নতুন মামলা। রাজধানীর শাহজাহানপুরের এক মাংস ব্যবসায়ী জামিন পাওয়ার পর জেলগেট থেকেই পর পর তিনটি মামলায় পুনঃগ্রেফতারের (শ্যোন অ্যারেস্ট) শিকার হয়ে অবশেষে মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে রেহাই পান।

‘অভিযোগ পেলেই অ্যাকশন’, দাবি পুলিশ সদর দপ্তরের

সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে জনমনে। পুলিশের ডিআইজি (ক্রাইম ম্যানেজমেন্ট) মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান অবশ্য জানান—

“জুলাই আন্দোলনের মামলাগুলো নিয়ে শুরুতে বাদীরা এক ধরনের বাণিজ্য করেছিল, যা এখন বন্ধ করা হয়েছে। ঝুলে থাকা মামলাগুলোর তদন্ত দ্রুত শেষ করার কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ক্ষেত্রবিশেষে অসাধু পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।”