ঢাকা ০৩:৪৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘জানেন এটা তারেক জিয়ার হোটেল?’- বলে হুমকি ম্যানেজার গ্রেফতার

দৈনিক জাগ্রত বাংলাদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ০৩:১৮:৫০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬
  • / 124

কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতে ঘুরতে এসে তারকা মানের হোটেলে খাবেন আর সেখানেই খাবারের পাতে প্রতারণার শিকার হতে হবে? কেবল তা-ই নয়, সেই জোচ্চুরির প্রতিবাদ করতে গেলে আবার শুনতে হবে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নাম ভাঙিয়ে হম্বিতম্বি! ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে ভিআইপিদের নাম উচ্চারণ করে পর্যটককে চরম হুমকি দেওয়ার পর এবার শেষ রক্ষা হলো না। আইনের চাবুকে সোজা জেলহাজতে যেতে হলো তারকা মানের ‘হোটেল সী-গাল’-এর রেস্তোরাঁ ম্যানেজারকে।

শনিবার (১৫ আগস্ট) কক্সবাজার সদর মডেল থানায় পুলিশ বাদী হয়ে দণ্ডবিধির ৪১৯, ৪২০ ও ৫০৬ ধারায় একটি মামলা রুজু করে। সেই মামলাতেই গ্রেফতার করা হয়েছে অভিযুক্ত ম্যানেজার মো. মীর কামরুল হাসানকে। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনার আদ্যোপান্ত নিচে তুলে ধরা হলো:

ঘটনার সূত্রপাত: দেশি মুরগির মোড়কে সোনালি 

গত ৯ আগস্ট কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে পরিবার নিয়ে কক্সবাজারে বেড়াতে আসেন মোহাম্মদ রাসেল উদ্দিন। তিনি সী-গাল হোটেলের ৭১৫ ও ৭১৭ নম্বর কক্ষে ওঠেন। রাতে হোটেলের রেস্তোরাঁয় বারবার নিশ্চিত হয়ে পরিবারের জন্য ‘দেশি মুরগি’র অর্ডার দেন। রেস্তোরাঁর কর্মচারীরাও দেশি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু খাবারের পাতে কামড় বসাতেই স্বাদ নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয় রাসেলের।

বিষয়টি রেস্তোরাঁ কর্তৃপক্ষের মুখোমুখি উপস্থাপন করা হলে তারা স্বীকার করে নেয় যে, দেশি মুরগির কথা বলে তাদের মূলত ‘সোনালি মুরগি’ পরিবেশন করা হয়েছে। এমনকি এই হোটেলে ‘দেশি’ বলতে সোনালিই দেওয়া হয় বলে আজব যুক্তি দেখায় তারা। রাসেলের আপত্তি ছিল সেবার নামে থালায় এই স্পষ্ট প্রতারণা নিয়ে।

তিনি তৎক্ষণাৎ জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের ম্যাজিস্ট্রেটকে ফোন করেন। সেখানে থেকে তাত্ক্ষণিক প্রতিকার না পেয়ে পরবর্তীতে সরকারের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ‘জিআরএস’-এ লিখিত অভিযোগ পেশ করেন।

‘জানেন এটা তারেক জিয়ার হোটেল?’

ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে অভিযোগ করার পরেই তেতে ওঠেন সী-গালের রেস্তোরাঁ ম্যানেজার মো. মীর কামরুল হাসান। তিনি সরাসরি রাসেলকে ফোন দিয়ে রাজনৈতিক প্রভাব দেখিয়ে ভয়ভীতি দেখাতে শুরু করেন।

ঘটনার চার দিন পর, ১১ আগস্ট দৈনিক যুগান্তরের ফেসবুক পেজে ওই কথোপকথনের বিস্ফোরক অডিও প্রকাশ করা হয়। সেখানে ম্যানেজারকে বলতে শোনা যায়, “আমাদের এমডির সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সম্পর্ক রয়েছে, তারেক জিয়ারও সম্পর্ক রয়েছে। আমাদের হোটেলটা তারেক জিয়ার হোটেল নামে সবাই জানে, আপনিও হয়তো জানেন…”

এই অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ পেতেই তোলপাড় শুরু হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, অডিওটি সরকারের উচ্চপর্যায়ের নজরে আসার পরই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে কড়া পদক্ষেপের বার্তা যায়।

আইনি তোপ ও ব্যাকফুটে হোটেল কতৃপক্ষ

কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মুহাম্মদ আলী খবরের সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, “প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নাম ভাঙিয়ে পর্যটককে হুমকির ঘটনায় থানার এসআই শুভ্র রুদ্র বাদী হয়ে মামলা করেছেন। একই সাথে অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়েছে।”

অন্যদিকে তোপের মুখে পড়ে তড়িঘড়ি জল ঢালার চেষ্টা করেছে সী-গাল কতৃপক্ষ। সী-গাল গ্রুপের চেয়ারম্যান মাসুম ইকবাল জানান, ঘটনার পরপরই অভিযুক্ত রেস্তোরাঁ ম্যানেজার মীর কামরুল হাসানকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে এবং হোটেলের পুরো টিমকে সতর্ক বার্তা দেওয়া হয়েছে।

ঘটনাটি কেবল পুলিশি মামলাতেই আটকে নেই, পর্যটক রাসেলের আবেদন আমলে নিয়ে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পরিচালক (যুগ্মসচিব) সেবাস্টিন রেমাকে পুরো বিষয়টি তদন্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

‘জানেন এটা তারেক জিয়ার হোটেল?’- বলে হুমকি ম্যানেজার গ্রেফতার

আপডেট সময় : ০৩:১৮:৫০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬

কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতে ঘুরতে এসে তারকা মানের হোটেলে খাবেন আর সেখানেই খাবারের পাতে প্রতারণার শিকার হতে হবে? কেবল তা-ই নয়, সেই জোচ্চুরির প্রতিবাদ করতে গেলে আবার শুনতে হবে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নাম ভাঙিয়ে হম্বিতম্বি! ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে ভিআইপিদের নাম উচ্চারণ করে পর্যটককে চরম হুমকি দেওয়ার পর এবার শেষ রক্ষা হলো না। আইনের চাবুকে সোজা জেলহাজতে যেতে হলো তারকা মানের ‘হোটেল সী-গাল’-এর রেস্তোরাঁ ম্যানেজারকে।

শনিবার (১৫ আগস্ট) কক্সবাজার সদর মডেল থানায় পুলিশ বাদী হয়ে দণ্ডবিধির ৪১৯, ৪২০ ও ৫০৬ ধারায় একটি মামলা রুজু করে। সেই মামলাতেই গ্রেফতার করা হয়েছে অভিযুক্ত ম্যানেজার মো. মীর কামরুল হাসানকে। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনার আদ্যোপান্ত নিচে তুলে ধরা হলো:

ঘটনার সূত্রপাত: দেশি মুরগির মোড়কে সোনালি 

গত ৯ আগস্ট কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে পরিবার নিয়ে কক্সবাজারে বেড়াতে আসেন মোহাম্মদ রাসেল উদ্দিন। তিনি সী-গাল হোটেলের ৭১৫ ও ৭১৭ নম্বর কক্ষে ওঠেন। রাতে হোটেলের রেস্তোরাঁয় বারবার নিশ্চিত হয়ে পরিবারের জন্য ‘দেশি মুরগি’র অর্ডার দেন। রেস্তোরাঁর কর্মচারীরাও দেশি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু খাবারের পাতে কামড় বসাতেই স্বাদ নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয় রাসেলের।

বিষয়টি রেস্তোরাঁ কর্তৃপক্ষের মুখোমুখি উপস্থাপন করা হলে তারা স্বীকার করে নেয় যে, দেশি মুরগির কথা বলে তাদের মূলত ‘সোনালি মুরগি’ পরিবেশন করা হয়েছে। এমনকি এই হোটেলে ‘দেশি’ বলতে সোনালিই দেওয়া হয় বলে আজব যুক্তি দেখায় তারা। রাসেলের আপত্তি ছিল সেবার নামে থালায় এই স্পষ্ট প্রতারণা নিয়ে।

তিনি তৎক্ষণাৎ জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের ম্যাজিস্ট্রেটকে ফোন করেন। সেখানে থেকে তাত্ক্ষণিক প্রতিকার না পেয়ে পরবর্তীতে সরকারের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ‘জিআরএস’-এ লিখিত অভিযোগ পেশ করেন।

‘জানেন এটা তারেক জিয়ার হোটেল?’

ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে অভিযোগ করার পরেই তেতে ওঠেন সী-গালের রেস্তোরাঁ ম্যানেজার মো. মীর কামরুল হাসান। তিনি সরাসরি রাসেলকে ফোন দিয়ে রাজনৈতিক প্রভাব দেখিয়ে ভয়ভীতি দেখাতে শুরু করেন।

ঘটনার চার দিন পর, ১১ আগস্ট দৈনিক যুগান্তরের ফেসবুক পেজে ওই কথোপকথনের বিস্ফোরক অডিও প্রকাশ করা হয়। সেখানে ম্যানেজারকে বলতে শোনা যায়, “আমাদের এমডির সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সম্পর্ক রয়েছে, তারেক জিয়ারও সম্পর্ক রয়েছে। আমাদের হোটেলটা তারেক জিয়ার হোটেল নামে সবাই জানে, আপনিও হয়তো জানেন…”

এই অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ পেতেই তোলপাড় শুরু হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, অডিওটি সরকারের উচ্চপর্যায়ের নজরে আসার পরই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে কড়া পদক্ষেপের বার্তা যায়।

আইনি তোপ ও ব্যাকফুটে হোটেল কতৃপক্ষ

কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মুহাম্মদ আলী খবরের সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, “প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নাম ভাঙিয়ে পর্যটককে হুমকির ঘটনায় থানার এসআই শুভ্র রুদ্র বাদী হয়ে মামলা করেছেন। একই সাথে অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়েছে।”

অন্যদিকে তোপের মুখে পড়ে তড়িঘড়ি জল ঢালার চেষ্টা করেছে সী-গাল কতৃপক্ষ। সী-গাল গ্রুপের চেয়ারম্যান মাসুম ইকবাল জানান, ঘটনার পরপরই অভিযুক্ত রেস্তোরাঁ ম্যানেজার মীর কামরুল হাসানকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে এবং হোটেলের পুরো টিমকে সতর্ক বার্তা দেওয়া হয়েছে।

ঘটনাটি কেবল পুলিশি মামলাতেই আটকে নেই, পর্যটক রাসেলের আবেদন আমলে নিয়ে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পরিচালক (যুগ্মসচিব) সেবাস্টিন রেমাকে পুরো বিষয়টি তদন্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।