ঢাকা ০৫:১৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬, ৮ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস আজ

ফ্যাসিস্ট সরকার পতনের পরও শ্রমিকের দুঃসময়, ১২৯টি কারখানা বন্ধ, বেকার এক লাখ

স্টাফ রিপোর্টার
  • আপডেট সময় : ১২:০০:০৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ মে ২০২৫
  • / 156

অচল ব্যাংকগুলো সচল করতে সরকার নতুন করে টাকা ছাপিয়ে দিলেও, উৎপাদনমুখী খাতে শ্রমিকদের জন্য কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। শুধুমাত্র একটি ‘শ্রম সংস্কার কমিশন’ গঠন করা ছাড়া শ্রমিকদের কল্যাণে কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই। অপরদিকে, নতুন কোনো বিদেশি বিনিয়োগ না আসায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি। বরং গার্মেন্টসসহ গত কয়েক মাসে ১২৯টি মিল-কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে প্রায় এক লাখ শ্রমিক বেকার হয়েছেন। এই বেকারত্বের কারণে সমাজে চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ বাড়ছে।

নতুন সরকারে বিনিয়োগের সংকট, শ্রমিকের ভাগ্য অপরিবর্তিত

ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের ৯ মাসে অনেকের ভাগ্য পরিবর্তন হলেও শ্রমজীবী মানুষের অবস্থার উন্নতি হয়নি। অর্থনীতিতে স্থবিরতা, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও বিনিয়োগের ঘাটতিতে দেশের কলকারখানাগুলোর গতি থেমে গেছে। সিপিডির গবেষণা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেক অর্জন করাও কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। এ গবেষণায় দেখা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকার পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরিতে ব্যর্থ হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ: বেকারত্ব থেকেই বাড়ছে অপরাধপ্রবণতা

সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, সরকারকে বেকার শ্রমিকদের সঠিক তথ্য সংগ্রহ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। বর্তমানে দেশের প্রায় দুই কোটি যুবকের মধ্যে ১২.২ শতাংশ বেকার, যার মধ্যে ৭৮ লক্ষ যুবকের যথাযথ শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ নেই। প্রান্তিক এলাকার যুবসমাজ এসব ক্ষেত্রে আরও পিছিয়ে আছে।

মে দিবসে শ্রমিকের চোখে জল, অর্জন কোথায়?

আজ মহান মে দিবস—শ্রমিকের অধিকার ও আত্মত্যাগের স্মরণে পালিত হচ্ছে। এ বছর দিবসের প্রতিপাদ্য—“শ্রমিক-মালিক এক হয়ে, গড়বো এ দেশ নতুন করে।” কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যায়—ঢাকঢোল পিটিয়ে দিবস পালন করলেও শ্রমিকের অধিকার আদায় হয়েছে কি? গত ৯ মাসে অন্তর্বর্তী সরকার শ্রমিকদের জন্য কেবল একটি ‘শ্রম সংস্কার কমিশন’ গঠন করেছে। এ কমিশন ২১ এপ্রিল প্রতিবেদন জমা দিলেও বাস্তবায়নে কোনো অগ্রগতি নেই।

বিনিয়োগ সম্মেলন আর প্রতিশ্রুতির ফাঁকা বুলি

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ‘বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট সামিট ২০২৫’ আয়োজন করলেও বাস্তব কোনো বিনিয়োগ এখনো দৃশ্যমান নয়। ৫০টি দেশের ৫৫০ জন বিনিয়োগকারী অংশ নিলেও, কেবল ইংরেজি উপস্থাপনার বাহবা ছাড়া অন্য কিছু মেলেনি।

কারখানা বন্ধের ভয়াবহ চিত্র: লাখো শ্রমিক বেকার

সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গাজীপুরে ৫৪টি, চট্টগ্রামে ৫২টি, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীতে ২৩টি এবং সাভার ও আশুলিয়ায় ১৮টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এসব কারখানায় কর্মরত ছিলেন লাখো শ্রমিক। বেক্সিমকোর কাশিমপুর ও সারাবো ইউনিটে ১৪টি ইউনিট বন্ধ হওয়ায় ৩৩,২৪৪ জন শ্রমিক বেকার হয়েছেন।

বিকেএমইএ ও বিজিএমইএ-এর উদ্বেগ

বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, গত এক বছরে নিট পোশাক খাতে ৫০টির বেশি কারখানা বন্ধ হয়েছে এবং তিন থেকে পাঁচ মাসে আরও বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইতিমধ্যে ৩৫ হাজারের বেশি শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে ৫২টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, যেখানে ৫১ হাজারের বেশি শ্রমিক কাজ করতেন।

শ্রমিকদের মানবিক সংকট

শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের নেতা রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, একজন শ্রমিক চাকরি হারানোর পর তার জীবনযাত্রা ভেঙে পড়ে। বাসাভাড়া, বাজার করা বন্ধ হয়ে যায়। এর প্রভাব স্থানীয় অর্থনীতিতে পড়ে এবং শ্রমিকরা মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে।

আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস আজ

ফ্যাসিস্ট সরকার পতনের পরও শ্রমিকের দুঃসময়, ১২৯টি কারখানা বন্ধ, বেকার এক লাখ

আপডেট সময় : ১২:০০:০৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ মে ২০২৫

অচল ব্যাংকগুলো সচল করতে সরকার নতুন করে টাকা ছাপিয়ে দিলেও, উৎপাদনমুখী খাতে শ্রমিকদের জন্য কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। শুধুমাত্র একটি ‘শ্রম সংস্কার কমিশন’ গঠন করা ছাড়া শ্রমিকদের কল্যাণে কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই। অপরদিকে, নতুন কোনো বিদেশি বিনিয়োগ না আসায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি। বরং গার্মেন্টসসহ গত কয়েক মাসে ১২৯টি মিল-কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে প্রায় এক লাখ শ্রমিক বেকার হয়েছেন। এই বেকারত্বের কারণে সমাজে চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ বাড়ছে।

নতুন সরকারে বিনিয়োগের সংকট, শ্রমিকের ভাগ্য অপরিবর্তিত

ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের ৯ মাসে অনেকের ভাগ্য পরিবর্তন হলেও শ্রমজীবী মানুষের অবস্থার উন্নতি হয়নি। অর্থনীতিতে স্থবিরতা, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও বিনিয়োগের ঘাটতিতে দেশের কলকারখানাগুলোর গতি থেমে গেছে। সিপিডির গবেষণা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেক অর্জন করাও কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। এ গবেষণায় দেখা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকার পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরিতে ব্যর্থ হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ: বেকারত্ব থেকেই বাড়ছে অপরাধপ্রবণতা

সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, সরকারকে বেকার শ্রমিকদের সঠিক তথ্য সংগ্রহ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। বর্তমানে দেশের প্রায় দুই কোটি যুবকের মধ্যে ১২.২ শতাংশ বেকার, যার মধ্যে ৭৮ লক্ষ যুবকের যথাযথ শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ নেই। প্রান্তিক এলাকার যুবসমাজ এসব ক্ষেত্রে আরও পিছিয়ে আছে।

মে দিবসে শ্রমিকের চোখে জল, অর্জন কোথায়?

আজ মহান মে দিবস—শ্রমিকের অধিকার ও আত্মত্যাগের স্মরণে পালিত হচ্ছে। এ বছর দিবসের প্রতিপাদ্য—“শ্রমিক-মালিক এক হয়ে, গড়বো এ দেশ নতুন করে।” কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যায়—ঢাকঢোল পিটিয়ে দিবস পালন করলেও শ্রমিকের অধিকার আদায় হয়েছে কি? গত ৯ মাসে অন্তর্বর্তী সরকার শ্রমিকদের জন্য কেবল একটি ‘শ্রম সংস্কার কমিশন’ গঠন করেছে। এ কমিশন ২১ এপ্রিল প্রতিবেদন জমা দিলেও বাস্তবায়নে কোনো অগ্রগতি নেই।

বিনিয়োগ সম্মেলন আর প্রতিশ্রুতির ফাঁকা বুলি

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ‘বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট সামিট ২০২৫’ আয়োজন করলেও বাস্তব কোনো বিনিয়োগ এখনো দৃশ্যমান নয়। ৫০টি দেশের ৫৫০ জন বিনিয়োগকারী অংশ নিলেও, কেবল ইংরেজি উপস্থাপনার বাহবা ছাড়া অন্য কিছু মেলেনি।

কারখানা বন্ধের ভয়াবহ চিত্র: লাখো শ্রমিক বেকার

সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গাজীপুরে ৫৪টি, চট্টগ্রামে ৫২টি, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীতে ২৩টি এবং সাভার ও আশুলিয়ায় ১৮টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এসব কারখানায় কর্মরত ছিলেন লাখো শ্রমিক। বেক্সিমকোর কাশিমপুর ও সারাবো ইউনিটে ১৪টি ইউনিট বন্ধ হওয়ায় ৩৩,২৪৪ জন শ্রমিক বেকার হয়েছেন।

বিকেএমইএ ও বিজিএমইএ-এর উদ্বেগ

বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, গত এক বছরে নিট পোশাক খাতে ৫০টির বেশি কারখানা বন্ধ হয়েছে এবং তিন থেকে পাঁচ মাসে আরও বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইতিমধ্যে ৩৫ হাজারের বেশি শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে ৫২টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, যেখানে ৫১ হাজারের বেশি শ্রমিক কাজ করতেন।

শ্রমিকদের মানবিক সংকট

শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের নেতা রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, একজন শ্রমিক চাকরি হারানোর পর তার জীবনযাত্রা ভেঙে পড়ে। বাসাভাড়া, বাজার করা বন্ধ হয়ে যায়। এর প্রভাব স্থানীয় অর্থনীতিতে পড়ে এবং শ্রমিকরা মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে।