ঢাকা ০৮:৩৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০২ মে ২০২৬, ১৯ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস: তথ্যের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের ভূমিকা

রওনক আহমেদ রাহাদ
  • আপডেট সময় : ০৭:৫১:০৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩ মে ২০২৪
  • / 313

প্রতি বছর ৩ মে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস পালিত হয়। ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘের সাধারণ সভা এই দিবসটি পালনের ঘোষণা দেয়।

একটি মুক্ত গণমাধ্যম যেভাবে বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য দিতে পারে, সেটা কোনো সরকারি সংস্থা বা দলীয় নেটওয়ার্ক দিতে পারে না। কেউ-ই ক্ষমতাসীনদের কাছে খারাপ সংবাদগুলো পৌঁছে দিতে চায় না। সেখানে ভয় ও ব্যক্তিস্বার্থ কাজ করে।

গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করে বাংলাদেশ কী অর্জন করেছে?

এক সময় মুক্ত গণমাধ্যম ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহির আওতায় আনতো। কিন্তু এখন ক্ষমতাসীনরাই উল্টো গণমাধ্যমকে ‘জবাবদিহি’র আওতায় আনছেন। তবে নিশ্চিতভাবেই সেটা সত্য প্রকাশের জন্য নয়, বরং বড় আকারে বৈষম্য ও দরিদ্রদের কাছ থেকে লুণ্ঠনকে ন্যায্যতা দিতে।

বাংলাদেশে ‘বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস’ পালন করার সময় আমাদের এটাও মনে রাখতে হবে যে, দেশে মুক্ত গণমাধ্যমের কার্যকারিতাকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বাধাগ্রস্ত করছে এমন নয়টি আইন এই মুহূর্তে কার্যকর রয়েছে এবং আরও চারটি আইন পাস করার চূড়ান্ত প্রস্তুতি চলছে।

মজার বিষয় হলো, মুক্ত গণমাধ্যমের কার্যকারিতাকে খর্ব করার জন্য যতগুলো আইন রয়েছে, তার তুলনায় গুরুতর ও সমাজের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে বিঘ্নিত করতে পারে এমন অপরাধ, যেমন: হত্যা, মৃত্যু, হামলা, ধর্ষণ, অপহরণ, শিশু নির্যাতন বা বাল্যবিয়ে ঠেকানোর আইনের সংখ্যা বেশ নগণ্য।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও সড়ক পরিবহন আইন একইসঙ্গে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে পাস হয়। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন আনুষ্ঠানিকভাবে সাইবার অপরাধ দমনের জন্য চালু করা হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই শতাধিক সাংবাদিক, শিল্পী, কার্টুনিস্ট, শিক্ষক ও লেখককে এর আওতায় কারাবন্দি করা হয়। অপরদিকে আমাদের সড়কগুলোতে হাজারো মানুষের মৃত্যু সত্ত্বেও সড়ক পরিবহন আইনের পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর বাস্তবায়ন এখনো দেখিনি।

২০১২ সালের মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের সংস্কারের কথা বলা হলেও আজ পর্যন্ত তা করা হয়নি। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটির (জিএফআই) তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে ৮২৭ কোটি মার্কিন ডলার পাচার হচ্ছে। সাম্প্রতিক তীব্র ডলার সংকটের মধ্যেও এই ধারা অব্যাহত রয়েছে।

দেশের জরুরি ক্ষেত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়নে হেলাফেলা এবং গণমাধ্যমের জন্য প্রযোজ্য আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দ্রুতগতি দেখলেই বোঝা যায় যে আমাদের প্রাধান্যটা ঠিক কোথায়। কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিতে সমাজের জন্য বড় বিপদের উৎস কোনটি, সেটাও দিনের আলোর মতো স্পষ্ট।

সাংবাদিকরাই কেবল সাংবাদিকতাকে বাঁচাতে পারে:

সর্বপরি এই লেখার উদ্দেশ্য হচ্ছে, বিনীত ও আন্তরিকভাবে আমার সাংবাদিক সহকর্মীদের অনুপ্রাণিত করা, যেন তারা তাদের কাজে, হৃদয়ে ও মননে আত্মবিশ্লেষণ করে, প্রশ্ন করে ও অনুসন্ধান করে যে কোথায় বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার সমাপ্তি হচ্ছে এবং রাজনৈতিক সাংবাদিকতার শুরু হচ্ছে।

শিরোনামেই বলেছি, শুধু আমরা সাংবাদিকরাই আমাদের পেশাকে বাঁচাতে পারি। বাকি সবাই সাংবাদিকতাকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে চায়। সরকার যখন আমাদের দিকে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়, তখন তারা চায় সাংবাদিকরা কায়মনোবাক্যে সরকারের প্রতিটি নির্দেশনা মেনে চলবে; যখন ব্যবসায়িক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে সাহায্যের প্রস্তাব আসে, তখন সেই সাহায্যের মূল্য দিতে হয় তাদের আইনভঙ্গ করার ঘটনাগুলো দেখেও না দেখে; যখন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা আমাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করে, তখন তারা চায় আমরা যেন তাদের আইনভঙ্গের ঘটনাগুলো হালকা করে লিখি; যখন রাজনীতিবিদরা আমাদের প্রশংসা করে, তখন বুঝতে হবে তারা এখন ক্ষমতার মধু থেকে বঞ্চিত এবং নিশ্চিতভাবেই ক্ষমতার স্বাদ পেলে তারা বিপরীত রূপ দেখাবে। কেউ চায় না আমরা স্বাধীন থাকি, বস্তুনিষ্ঠ থাকি এবং সত্য বলি। এখানেই আমাদের মূল চ্যালেঞ্জ এবং এই কারণেই চিন্তা ও চেতনার পার্থক্য থাকলেও আমাদের সবাইকে একসঙ্গে থাকতে হবে।

এর অর্থ এই নয় যে আমাদের মধ্যে কোনো মতপার্থক্য থাকবে না। সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে আমাদের মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। সাংবাদিক হিসেবে আমরা সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী রাজনৈতিক চিন্তা লালন করতেই পারি, কিন্তু সেটা যেন সাংবাদিকতাকে প্রভাবিত না করে।

যে কথাগুলো লিখেছি তা যদি আপনাদের কাছে গ্রহণযোগ্য মনে না হয়, তাহলে আমাকে তিরস্কার করতে পারেন। কিন্তু, জিজ্ঞাসা করতে ভুলবেন না—আমরা সাংবাদিকরা কি মুক্তভাবে চিন্তা করতে পারছি? না কি সেগুলো পক্ষপাতমূলক এবং রাজনৈতিক ও আর্থিক স্বার্থে আচ্ছন্ন?

এই প্রশ্নের উত্তরের মধ্যেই লুকিয়ে আছে সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ। মনে রাখবেন, সাংবাদিকতাকে শুধু সাংবাদিকরাই বাঁচাতে পারে।

মুক্ত গণমাধ্যম সূচকে নেপাল, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান ও ভারতের নিচে বাংলাদেশ:

গণমাধ্যম সূচকের মোট ১০০ পয়েন্টের মধ্যে বাংলাদেশ পেয়েছে ২৭ দশমিক ৬৪। গত বছর তা ছিল ৩৫ দশমিক ৩১। সেবার অবস্থান ছিল ১৬৩।বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম সূচকের ২০২৪ সংস্করণ প্রকাশ করেছে রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স। এই সূচকে গত বছরের তুলনায় আরও দুই ধাপ পিছিয়েছে বাংলাদেশ।

মোট ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬৫তম। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শুধু আফগানিস্তানের চেয়ে এগিয়ে আছে বাংলাদেশ। ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, নেপাল ও ভুটানের পেছনে স্থান পেয়েছে বাংলাদেশ।২০২২ সালে ৩৬ দশমিক ৬৩ পয়েন্ট নিয়ে ১৬২তম অবস্থানে এবং ২০২১ সালে ৫০ দশমিক ২৯ পয়েন্ট নিয়ে ১৫২তম অবস্থানে ছিল বাংলাদেশ।

দক্ষিণ এশিয়ায় গণমাধ্যমের স্বাধীনতার দিক দিয়ে এবার শীর্ষস্থান দখল করেছে নেপাল; ৬০ দশমিক ৫২ পয়েন্ট নিয়ে দেশটি ৭৪তম অবস্থান দখল করেছে। এর পরের অবস্থানে আছে মালদ্বীপ। ৫২ দশমিক ৩৬ পয়েন্ট নিয়ে দেশটি ১০৬তম অবস্থানে।

এবারের তালিকায় প্রথম অবস্থান থেকে ছিটকে তৃতীয় স্থান পেয়েছে ভুটান। ৩৭ দশমিক ২৯ পয়েন্ট নিয়ে দেশটি ১৪৭তম অবস্থানে রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার চতুর্থ, পঞ্চম ও ষষ্ঠ অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান ও ভারত। এই তিন দেশের বৈশ্বিক অবস্থান যথাক্রমে ১৫০, ১৫২ ও ১৫৯তম।

গত বছরের ১৬১ থেকে দুই ধাপ এগিয়ে এবার ১৫৯তম অবস্থান পেয়েছে ভারত।আফগানিস্তান দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বশেষ স্থান পেয়েছে। ২৬ ধাপ পিছিয়ে দেশটির বৈশ্বিক অবস্থান ১৭৮তম, পয়েন্ট মাত্র ১৯ দশমিক ০৯।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সাংবাদিকতার চ্যালেঞ্জের দিক দিয়ে গোটা বিশ্বে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক কর্মস্থল হিসেবে মিয়ানমার, চীন, উত্তর কোরিয়া, ভিয়েতনাম ও আফগানিস্তানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এই প্রতিবেদনে।

বৈশ্বিক সূচকে শীর্ষস্থান অটুট রেখেছে নরওয়ে। তাদের পয়েন্ট ৯১ দশমিক ৮৯। শীর্ষ দশের বাকি দেশগুলো হলো ডেনমার্ক, সুইডেন, নেদারল্যান্ডস, ফিনল্যান্ড, এস্তোনিয়া, পর্তুগাল, আয়ারল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড ও জার্মানি।

বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম সূচকের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলের সাংবাদিকরা কতটুকু স্বাধীনভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করেন, তা যাচাই করা হয়।এই সূচকে পাঁচটি বিষয় আমলে নেওয়া হয়। এগুলো হলো—রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, আইনি অবকাঠামো, অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট, আর্থ-সামাজিক অবস্থা ও নিরাপত্তা।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সারা বিশ্বের মুক্ত গণমাধ্যম রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে হুমকির মুখোমুখি হচ্ছে, যাতে রাজনৈতিক সূচকের উল্লেখযোগ্য হ্রাস থেকে নিশ্চিত হয়েছে।

এ বছর এই সূচকের বৈশ্বিক গড় সাত দশমিক ছয় শতাংশ কমেছে।

বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস: তথ্যের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের ভূমিকা

আপডেট সময় : ০৭:৫১:০৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩ মে ২০২৪

প্রতি বছর ৩ মে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস পালিত হয়। ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘের সাধারণ সভা এই দিবসটি পালনের ঘোষণা দেয়।

একটি মুক্ত গণমাধ্যম যেভাবে বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য দিতে পারে, সেটা কোনো সরকারি সংস্থা বা দলীয় নেটওয়ার্ক দিতে পারে না। কেউ-ই ক্ষমতাসীনদের কাছে খারাপ সংবাদগুলো পৌঁছে দিতে চায় না। সেখানে ভয় ও ব্যক্তিস্বার্থ কাজ করে।

গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করে বাংলাদেশ কী অর্জন করেছে?

এক সময় মুক্ত গণমাধ্যম ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহির আওতায় আনতো। কিন্তু এখন ক্ষমতাসীনরাই উল্টো গণমাধ্যমকে ‘জবাবদিহি’র আওতায় আনছেন। তবে নিশ্চিতভাবেই সেটা সত্য প্রকাশের জন্য নয়, বরং বড় আকারে বৈষম্য ও দরিদ্রদের কাছ থেকে লুণ্ঠনকে ন্যায্যতা দিতে।

বাংলাদেশে ‘বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস’ পালন করার সময় আমাদের এটাও মনে রাখতে হবে যে, দেশে মুক্ত গণমাধ্যমের কার্যকারিতাকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বাধাগ্রস্ত করছে এমন নয়টি আইন এই মুহূর্তে কার্যকর রয়েছে এবং আরও চারটি আইন পাস করার চূড়ান্ত প্রস্তুতি চলছে।

মজার বিষয় হলো, মুক্ত গণমাধ্যমের কার্যকারিতাকে খর্ব করার জন্য যতগুলো আইন রয়েছে, তার তুলনায় গুরুতর ও সমাজের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে বিঘ্নিত করতে পারে এমন অপরাধ, যেমন: হত্যা, মৃত্যু, হামলা, ধর্ষণ, অপহরণ, শিশু নির্যাতন বা বাল্যবিয়ে ঠেকানোর আইনের সংখ্যা বেশ নগণ্য।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও সড়ক পরিবহন আইন একইসঙ্গে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে পাস হয়। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন আনুষ্ঠানিকভাবে সাইবার অপরাধ দমনের জন্য চালু করা হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই শতাধিক সাংবাদিক, শিল্পী, কার্টুনিস্ট, শিক্ষক ও লেখককে এর আওতায় কারাবন্দি করা হয়। অপরদিকে আমাদের সড়কগুলোতে হাজারো মানুষের মৃত্যু সত্ত্বেও সড়ক পরিবহন আইনের পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর বাস্তবায়ন এখনো দেখিনি।

২০১২ সালের মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের সংস্কারের কথা বলা হলেও আজ পর্যন্ত তা করা হয়নি। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটির (জিএফআই) তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে ৮২৭ কোটি মার্কিন ডলার পাচার হচ্ছে। সাম্প্রতিক তীব্র ডলার সংকটের মধ্যেও এই ধারা অব্যাহত রয়েছে।

দেশের জরুরি ক্ষেত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়নে হেলাফেলা এবং গণমাধ্যমের জন্য প্রযোজ্য আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দ্রুতগতি দেখলেই বোঝা যায় যে আমাদের প্রাধান্যটা ঠিক কোথায়। কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিতে সমাজের জন্য বড় বিপদের উৎস কোনটি, সেটাও দিনের আলোর মতো স্পষ্ট।

সাংবাদিকরাই কেবল সাংবাদিকতাকে বাঁচাতে পারে:

সর্বপরি এই লেখার উদ্দেশ্য হচ্ছে, বিনীত ও আন্তরিকভাবে আমার সাংবাদিক সহকর্মীদের অনুপ্রাণিত করা, যেন তারা তাদের কাজে, হৃদয়ে ও মননে আত্মবিশ্লেষণ করে, প্রশ্ন করে ও অনুসন্ধান করে যে কোথায় বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার সমাপ্তি হচ্ছে এবং রাজনৈতিক সাংবাদিকতার শুরু হচ্ছে।

শিরোনামেই বলেছি, শুধু আমরা সাংবাদিকরাই আমাদের পেশাকে বাঁচাতে পারি। বাকি সবাই সাংবাদিকতাকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে চায়। সরকার যখন আমাদের দিকে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়, তখন তারা চায় সাংবাদিকরা কায়মনোবাক্যে সরকারের প্রতিটি নির্দেশনা মেনে চলবে; যখন ব্যবসায়িক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে সাহায্যের প্রস্তাব আসে, তখন সেই সাহায্যের মূল্য দিতে হয় তাদের আইনভঙ্গ করার ঘটনাগুলো দেখেও না দেখে; যখন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা আমাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করে, তখন তারা চায় আমরা যেন তাদের আইনভঙ্গের ঘটনাগুলো হালকা করে লিখি; যখন রাজনীতিবিদরা আমাদের প্রশংসা করে, তখন বুঝতে হবে তারা এখন ক্ষমতার মধু থেকে বঞ্চিত এবং নিশ্চিতভাবেই ক্ষমতার স্বাদ পেলে তারা বিপরীত রূপ দেখাবে। কেউ চায় না আমরা স্বাধীন থাকি, বস্তুনিষ্ঠ থাকি এবং সত্য বলি। এখানেই আমাদের মূল চ্যালেঞ্জ এবং এই কারণেই চিন্তা ও চেতনার পার্থক্য থাকলেও আমাদের সবাইকে একসঙ্গে থাকতে হবে।

এর অর্থ এই নয় যে আমাদের মধ্যে কোনো মতপার্থক্য থাকবে না। সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে আমাদের মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। সাংবাদিক হিসেবে আমরা সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী রাজনৈতিক চিন্তা লালন করতেই পারি, কিন্তু সেটা যেন সাংবাদিকতাকে প্রভাবিত না করে।

যে কথাগুলো লিখেছি তা যদি আপনাদের কাছে গ্রহণযোগ্য মনে না হয়, তাহলে আমাকে তিরস্কার করতে পারেন। কিন্তু, জিজ্ঞাসা করতে ভুলবেন না—আমরা সাংবাদিকরা কি মুক্তভাবে চিন্তা করতে পারছি? না কি সেগুলো পক্ষপাতমূলক এবং রাজনৈতিক ও আর্থিক স্বার্থে আচ্ছন্ন?

এই প্রশ্নের উত্তরের মধ্যেই লুকিয়ে আছে সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ। মনে রাখবেন, সাংবাদিকতাকে শুধু সাংবাদিকরাই বাঁচাতে পারে।

মুক্ত গণমাধ্যম সূচকে নেপাল, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান ও ভারতের নিচে বাংলাদেশ:

গণমাধ্যম সূচকের মোট ১০০ পয়েন্টের মধ্যে বাংলাদেশ পেয়েছে ২৭ দশমিক ৬৪। গত বছর তা ছিল ৩৫ দশমিক ৩১। সেবার অবস্থান ছিল ১৬৩।বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম সূচকের ২০২৪ সংস্করণ প্রকাশ করেছে রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স। এই সূচকে গত বছরের তুলনায় আরও দুই ধাপ পিছিয়েছে বাংলাদেশ।

মোট ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬৫তম। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শুধু আফগানিস্তানের চেয়ে এগিয়ে আছে বাংলাদেশ। ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, নেপাল ও ভুটানের পেছনে স্থান পেয়েছে বাংলাদেশ।২০২২ সালে ৩৬ দশমিক ৬৩ পয়েন্ট নিয়ে ১৬২তম অবস্থানে এবং ২০২১ সালে ৫০ দশমিক ২৯ পয়েন্ট নিয়ে ১৫২তম অবস্থানে ছিল বাংলাদেশ।

দক্ষিণ এশিয়ায় গণমাধ্যমের স্বাধীনতার দিক দিয়ে এবার শীর্ষস্থান দখল করেছে নেপাল; ৬০ দশমিক ৫২ পয়েন্ট নিয়ে দেশটি ৭৪তম অবস্থান দখল করেছে। এর পরের অবস্থানে আছে মালদ্বীপ। ৫২ দশমিক ৩৬ পয়েন্ট নিয়ে দেশটি ১০৬তম অবস্থানে।

এবারের তালিকায় প্রথম অবস্থান থেকে ছিটকে তৃতীয় স্থান পেয়েছে ভুটান। ৩৭ দশমিক ২৯ পয়েন্ট নিয়ে দেশটি ১৪৭তম অবস্থানে রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার চতুর্থ, পঞ্চম ও ষষ্ঠ অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান ও ভারত। এই তিন দেশের বৈশ্বিক অবস্থান যথাক্রমে ১৫০, ১৫২ ও ১৫৯তম।

গত বছরের ১৬১ থেকে দুই ধাপ এগিয়ে এবার ১৫৯তম অবস্থান পেয়েছে ভারত।আফগানিস্তান দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বশেষ স্থান পেয়েছে। ২৬ ধাপ পিছিয়ে দেশটির বৈশ্বিক অবস্থান ১৭৮তম, পয়েন্ট মাত্র ১৯ দশমিক ০৯।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সাংবাদিকতার চ্যালেঞ্জের দিক দিয়ে গোটা বিশ্বে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক কর্মস্থল হিসেবে মিয়ানমার, চীন, উত্তর কোরিয়া, ভিয়েতনাম ও আফগানিস্তানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এই প্রতিবেদনে।

বৈশ্বিক সূচকে শীর্ষস্থান অটুট রেখেছে নরওয়ে। তাদের পয়েন্ট ৯১ দশমিক ৮৯। শীর্ষ দশের বাকি দেশগুলো হলো ডেনমার্ক, সুইডেন, নেদারল্যান্ডস, ফিনল্যান্ড, এস্তোনিয়া, পর্তুগাল, আয়ারল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড ও জার্মানি।

বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম সূচকের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলের সাংবাদিকরা কতটুকু স্বাধীনভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করেন, তা যাচাই করা হয়।এই সূচকে পাঁচটি বিষয় আমলে নেওয়া হয়। এগুলো হলো—রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, আইনি অবকাঠামো, অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট, আর্থ-সামাজিক অবস্থা ও নিরাপত্তা।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সারা বিশ্বের মুক্ত গণমাধ্যম রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে হুমকির মুখোমুখি হচ্ছে, যাতে রাজনৈতিক সূচকের উল্লেখযোগ্য হ্রাস থেকে নিশ্চিত হয়েছে।

এ বছর এই সূচকের বৈশ্বিক গড় সাত দশমিক ছয় শতাংশ কমেছে।