ঢাকা ০২:৩১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ১৬ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ডিসির নেতৃত্বে অবাক করা ‘ঘুসের ফাঁদ’, কেঁচো খুঁড়তে বেরিয়ে আসছে সাপ

দৈনিক জাগ্রত বাংলাদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ০১:৩৫:০৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬
  • / 19

ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে নরসিংদীতে জমি অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করে এক ভয়াবহ ও নজিরবিহীন দুর্নীতির চিত্র ফুটে উঠেছে। শত শত কোটি টাকার ঘুস ও কমিশন বাণিজ্যকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে রীতিমতো ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে লিখিত চুক্তির মাধ্যমে ফাঁদ পেতেছে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই সিন্ডিকেটের হাত থেকে রক্ষা পায়নি মসজিদের জমিও।

কেঁচো খুঁড়তে সাপ:

দীর্ঘ অনুসন্ধানে জানা গেছে, নরসিংদী জেলা প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে অন্তত ২৫ জনের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এই লুটপাটে জড়িত। এতে ডিসি, এডিসি, সওজ ও গণপূর্তের প্রকৌশলী থেকে শুরু করে সাংবাদিক, সার্ভেয়ার ও দালালরা সম্পৃক্ত। দুর্নীতির মূল কৌশলে ছিল জমির শ্রেণি পরিবর্তন। নালা জমিকে ‘ভিটি’ এবং সাধারণ জমিকে ‘বাণিজ্যিক’ দেখিয়ে সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ছক কষা হয়।

সৎ কর্মকর্তার লড়াই ও বদলি:

এই ঘুস সিন্ডিকেটের বিষদাঁত ভেঙে দিয়ে আলোচনায় আসেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মাহমুদা বেগম। যোগদানের মাত্র ৬ মাসের মধ্যে তিনি প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার সরকারি অর্থ সাশ্রয় করেন। তার কঠোর অবস্থানে ১২০০ কোটি টাকার বরাদ্দের বাইরে অতিরিক্ত ৩ হাজার কোটি টাকার ভুয়া ক্ষতিপূরণ প্রস্তাব বাতিল হয়ে যায়। তবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে এই আপসহীন অবস্থানের কারণে প্রভাবশালী মহলের আক্রোশের শিকার হতে হয় তাকে। নীতিবহির্ভূত তদবির না মানায় গত ২৭ এপ্রিল তাকে পরিকল্পনা কমিশনে বদলি করা হয়।

এ বিষয়ে মাহমুদা বেগম বলেন, “অধিগ্রহণ তালিকায় সরকারের স্বার্থ পরিপন্থি অনেক বিষয় ছিল। প্রভাবশালী ব্যক্তির অবৈধ তদবির রক্ষা করতে না পারায় আমাকে ‘ঘোষণা’ দিয়ে বদলি করা হয়েছে।”

স্ট্যাম্পে চুক্তির নজিরবিহীন ঘটনা:

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দালালের মাধ্যমে জমি মালিকদের বিভ্রান্ত করে ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে কমিশন চুক্তির হিড়িক পড়ে। সরকারি ক্ষতিপূরণের ৪০-৬০ শতাংশ টাকা ভাগাভাগি করে নিয়েছে এই সিন্ডিকেট। নথিপত্রে দেখা যায়, সরকারের অধিগ্রহণের সিদ্ধান্তের পর রাতের আঁধারে নিম্নমানের ভবন তৈরি করে সেগুলোকে বাণিজ্যিক স্থাপনা দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।

দুদকের সতর্কতা ও কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতা:

২০২০ সালেই দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এই লুটপাটের বিষয়ে জেলা প্রশাসনকে সতর্ক করেছিল। তবুও থেমে থাকেনি এই চক্র। অভিযোগ আছে, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ‘ছয় খলিফা’ খ্যাত প্রভাবশালী কর্মচারী সিন্ডিকেট পুরো প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণ করে আসছিল। এই চক্রের বিরুদ্ধে ইতিপূর্বে শ্লীলতাহানির অভিযোগ উঠলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

বিপজ্জনক দুর্নীতির সংস্কৃতি:

নরসিংদীর এই ঘটনা শুধু একটি প্রকল্পের অনিয়ম নয়, বরং প্রশাসনের গভীরে প্রোথিত দুর্নীতির সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এডিসি মাহমুদা বেগমের মতো কর্মকর্তাদের সুরক্ষা না দিয়ে যদি দুর্নীতিবাজদের প্রশ্রয় দেওয়া হয়, তবে ভবিষ্যতে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পগুলো সাধারণ মানুষের উপকারের চেয়ে লুটেরাদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হবে।

ডিসির নেতৃত্বে অবাক করা ‘ঘুসের ফাঁদ’, কেঁচো খুঁড়তে বেরিয়ে আসছে সাপ

আপডেট সময় : ০১:৩৫:০৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬

ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে নরসিংদীতে জমি অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করে এক ভয়াবহ ও নজিরবিহীন দুর্নীতির চিত্র ফুটে উঠেছে। শত শত কোটি টাকার ঘুস ও কমিশন বাণিজ্যকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে রীতিমতো ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে লিখিত চুক্তির মাধ্যমে ফাঁদ পেতেছে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই সিন্ডিকেটের হাত থেকে রক্ষা পায়নি মসজিদের জমিও।

কেঁচো খুঁড়তে সাপ:

দীর্ঘ অনুসন্ধানে জানা গেছে, নরসিংদী জেলা প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে অন্তত ২৫ জনের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এই লুটপাটে জড়িত। এতে ডিসি, এডিসি, সওজ ও গণপূর্তের প্রকৌশলী থেকে শুরু করে সাংবাদিক, সার্ভেয়ার ও দালালরা সম্পৃক্ত। দুর্নীতির মূল কৌশলে ছিল জমির শ্রেণি পরিবর্তন। নালা জমিকে ‘ভিটি’ এবং সাধারণ জমিকে ‘বাণিজ্যিক’ দেখিয়ে সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ছক কষা হয়।

সৎ কর্মকর্তার লড়াই ও বদলি:

এই ঘুস সিন্ডিকেটের বিষদাঁত ভেঙে দিয়ে আলোচনায় আসেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মাহমুদা বেগম। যোগদানের মাত্র ৬ মাসের মধ্যে তিনি প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার সরকারি অর্থ সাশ্রয় করেন। তার কঠোর অবস্থানে ১২০০ কোটি টাকার বরাদ্দের বাইরে অতিরিক্ত ৩ হাজার কোটি টাকার ভুয়া ক্ষতিপূরণ প্রস্তাব বাতিল হয়ে যায়। তবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে এই আপসহীন অবস্থানের কারণে প্রভাবশালী মহলের আক্রোশের শিকার হতে হয় তাকে। নীতিবহির্ভূত তদবির না মানায় গত ২৭ এপ্রিল তাকে পরিকল্পনা কমিশনে বদলি করা হয়।

এ বিষয়ে মাহমুদা বেগম বলেন, “অধিগ্রহণ তালিকায় সরকারের স্বার্থ পরিপন্থি অনেক বিষয় ছিল। প্রভাবশালী ব্যক্তির অবৈধ তদবির রক্ষা করতে না পারায় আমাকে ‘ঘোষণা’ দিয়ে বদলি করা হয়েছে।”

স্ট্যাম্পে চুক্তির নজিরবিহীন ঘটনা:

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দালালের মাধ্যমে জমি মালিকদের বিভ্রান্ত করে ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে কমিশন চুক্তির হিড়িক পড়ে। সরকারি ক্ষতিপূরণের ৪০-৬০ শতাংশ টাকা ভাগাভাগি করে নিয়েছে এই সিন্ডিকেট। নথিপত্রে দেখা যায়, সরকারের অধিগ্রহণের সিদ্ধান্তের পর রাতের আঁধারে নিম্নমানের ভবন তৈরি করে সেগুলোকে বাণিজ্যিক স্থাপনা দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।

দুদকের সতর্কতা ও কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতা:

২০২০ সালেই দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এই লুটপাটের বিষয়ে জেলা প্রশাসনকে সতর্ক করেছিল। তবুও থেমে থাকেনি এই চক্র। অভিযোগ আছে, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ‘ছয় খলিফা’ খ্যাত প্রভাবশালী কর্মচারী সিন্ডিকেট পুরো প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণ করে আসছিল। এই চক্রের বিরুদ্ধে ইতিপূর্বে শ্লীলতাহানির অভিযোগ উঠলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

বিপজ্জনক দুর্নীতির সংস্কৃতি:

নরসিংদীর এই ঘটনা শুধু একটি প্রকল্পের অনিয়ম নয়, বরং প্রশাসনের গভীরে প্রোথিত দুর্নীতির সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এডিসি মাহমুদা বেগমের মতো কর্মকর্তাদের সুরক্ষা না দিয়ে যদি দুর্নীতিবাজদের প্রশ্রয় দেওয়া হয়, তবে ভবিষ্যতে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পগুলো সাধারণ মানুষের উপকারের চেয়ে লুটেরাদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হবে।