জাতিসংঘের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাদের জন্য আশ্রয় এবং মানবিক করিডর দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে, যা ঘিরে দেশে গভীর উদ্বেগ ও আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও হুমকির মুখে পড়বে।
১ লাখ ১৫ হাজার রোহিঙ্গার বায়োমেট্রিক নিবন্ধন সম্পন্ন
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় বছরে নতুন করে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের মধ্যে ১ লাখ ১৫ হাজার ব্যক্তির বায়োমেট্রিক নিবন্ধন সম্পন্ন হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এর বাইরেও ৫ থেকে ১০ হাজার রোহিঙ্গা এখনো অনিবন্ধিত অবস্থায় সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থান করছে। হিসেব অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে ২২০ জন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের সতর্কতা
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলাম বলেন, মানবিক করিডর বাস্তবায়িত হলে এটি শুধু মানবিক ইস্যু থাকবে না, বরং এটি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। তিনি বলেন, করিডরের নামে নতুন রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ হলে সীমান্ত নিরাপত্তা, অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা এবং কৌশলগত ভারসাম্য সবই ঝুঁকিতে পড়বে।
জাতিসংঘের প্রস্তাবের পূর্ণাঙ্গ খসড়া প্রকাশের দাবিও জানান তিনি। বলেন, এতদিন পর হঠাৎ মানবিক করিডরের প্রস্তাব কেন, তা জানাও জরুরি।
নিবন্ধন সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ লাখ ৫১ হাজারে
শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ১ মে পর্যন্ত ১ লাখ ১৫ হাজার রোহিঙ্গার বায়োমেট্রিক নিবন্ধন সম্পন্ন হয়েছে। ২০২৪ সালের মে, জুন ও জুলাই মাসে সর্বোচ্চ অনুপ্রবেশ ঘটে, যখন মংডুতে জান্তার হামলা বেড়ে যায় ও সীমান্তে নজরদারি দুর্বল হয়।
এতে বর্তমানে মোট নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১ লাখ ৫১ হাজারে। তাদের বেশিরভাগই কক্সবাজারের ২৭টি ক্যাম্পে অবস্থান করছেন।
প্রতিদিন জন্ম নিচ্ছে ৯০ রোহিঙ্গা শিশু
শরণার্থী কমিশনের তথ্যমতে, প্রতিদিন গড়ে ৯০টি করে রোহিঙ্গা শিশুর জন্ম হচ্ছে বাংলাদেশে, যা প্রতিবছরে দাঁড়ায় প্রায় ৩০ হাজার। এতে দেশের ওপর জনসংখ্যার চাপ বাড়ছে। বর্তমানে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৫২% শিশু, ৪৪% প্রাপ্তবয়স্ক এবং ৪% বয়স্ক রয়েছে। পুরুষ ৪৯% এবং নারী ৫১%।
মানবিক করিডর নিয়ে আশঙ্কা
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল (অব.) আ ন ম মুনিরুজ্জামান বলেন, মানবিক করিডর জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তিনি বলেন, রাখাইন অঞ্চল একটি স্পর্শকাতর এলাকা এবং সেখানে চীন, ভারত, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন পরাশক্তির স্বার্থ জড়িত।
করিডর চালু হলে আন্তর্জাতিক চাপে বাংলাদেশ দ্বান্দ্বিক অবস্থানে পড়ে যেতে পারে। তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা ছাড়া করিডর দেওয়া আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হবে। সংসদ না থাকায় এখন এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া আরও বিপজ্জনক।
সীমান্তে বিজিবির সীমাবদ্ধতা
বিজিবির কক্সবাজার রিজিয়নের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এমএম ইমরুল হাসান জানান, সীমান্তে নজরদারিতে নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কেওড়াবাগান, জলাবদ্ধতা, কাঁদামাটি ইত্যাদি মোকাবিলা করে বিজিবি সদস্যরা জীবন ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করছেন।
তিনি বলেন, অনেক সময় দুষ্কৃতকারীদের হামলায় বিজিবির সদস্যরা আহত হন। কিন্তু মানবাধিকার রক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
করিডর না দিলে অনুপ্রবেশ ঠেকানো সম্ভব
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল হাসান বলেন, রোহিঙ্গারা যদি সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেও আশ্রয় বা সহানুভূতি না পেত, তাহলে তারা এত সহজে ঢুকত না। স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের সহায়তায় রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকানো সম্ভব বলে জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, সীমান্তে আধুনিক নজরদারি প্রযুক্তি, কাঁটাতারের সুরক্ষা এবং আরও দুইটি ব্যাটালিয়ন বাড়ানোর জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।