ঢাকা ০৪:৪৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬, ৮ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইতিহাস গড়ল ফরিদপুর: দুর্গম পদ্মার চরে প্রথম মাধ্যমিক বিদ্যালয়

ফরিদপুর প্রতিনিধি:
  • আপডেট সময় : ০৭:৩৫:৫৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৫
  • / 396

শিক্ষায় অবহেলিত এই এলাকায় কখনো গড়ে ওঠেনি কোনো মাধ্যমিক বিদ্যালয়। অবশেষে সেই অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে, স্থানীয়দের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিয়েছে। হাওলাদারকান্দি গ্রামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সদরপুর উপজেলা প্রশাসন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, যা হয়ে উঠবে এ অঞ্চলের শিক্ষার বাতিঘর — এমনটাই প্রত্যাশা চরবাসীর।

চরবাসীর শত বছরের অপেক্ষার অবসান

সদরপুর উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের একটি হলো নারিকেলবাড়িয়া, যার অবস্থান সরাসরি পদ্মা নদীর চরে। এখানে আগে ছিল ১০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, তবে মাধ্যমিক শিক্ষার কোনো সুযোগ ছিল না। কাছাকাছি চরনাছিরপুর, চরমানাইরসহ আশেপাশের চরগুলোও ছিল একই অবহেলার শিকার। প্রাথমিক বিদ্যালয় পেরোলেই চরবাসীর শিক্ষার পথ থেমে যেত। ফলে অধিকাংশ শিশু বাধ্য হতো মাছ ধরা কিংবা কৃষিকাজে যুক্ত হতে।

একদিন চরবাসীর কানে এলো আশার গল্প

২০২৩ সালে সদরপুরের তৎকালীন ইউএনও আহসান মাহমুদ রাসেল উন্নয়ন কাজ পরিদর্শনে এসে জানতে পারেন এখানে কোনো মাধ্যমিক বিদ্যালয় নেই। তখনই সিদ্ধান্ত নেন — এখানকার জন্য একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করবেন।
তার উদ্যোগে এবং স্থানীয় শিক্ষানুরাগী আবুল হাওলাদারের জমিদানে শুরু হয় বিদ্যালয় গড়ার যাত্রা। তিনি এক একর জমি দান করেন বিদ্যালয়ের জন্য। এরপর উপজেলা প্রশাসনের উন্নয়ন তহবিলের বরাদ্দে নির্মাণকাজ শুরু হয়।
২০২৩ সালের ১৬ নভেম্বর ফরিদপুর জেলা প্রশাসক কামরুল আহসান তালুকদার বিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।

শিক্ষা আলো ছড়াবে দুর্গম চরেও

সদরপুর উপজেলা সদর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরের এই ইউনিয়নে যোগাযোগের মাধ্যম মূলত ট্রলার। ঢেউখালী ইউনিয়নের শয়তানখালী নৌঘাট হয়ে পদ্মা নদী পেরিয়ে পৌঁছাতে হয় এ অঞ্চলে।
এখানে প্রায় ২০ হাজার মানুষ বসবাস করে। আগে শিশুদের হাতে বই-খাতার বদলে থাকত মাছ ধরার সরঞ্জাম, চায়ের কেটলি কিংবা গরু-ছাগলের রশি। এখন তারা হাতে তুলে নেবে শিক্ষা সামগ্রী।

পরিবর্তনের আশায় মুখরিত চরবাসী

স্থানীয় বাসিন্দা রাজামল্লিক বলেন, আগে পঞ্চম শ্রেণির পর পড়াশোনা থেমে যেত। এখন মাধ্যমিক বিদ্যালয় হওয়ায় শিশুদের পড়াশোনার সুযোগ তৈরি হবে।
ইউপি চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন সরদার জানান, অনেক চেষ্টার পর চরবাসী তাদের স্বপ্নের স্কুল পেয়েছে। ইতিমধ্যেই টিনের ঘর তৈরি করা হয়েছে, বেঞ্চসহ শিক্ষা সামগ্রী পৌঁছে গেছে। শিগগিরই শিক্ষক নিয়োগ সম্পন্ন হবে।

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোফাজ্জেল হোসেন বলেন, এত দুর্গম চরে মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা একটা অসম্ভব কাজ মনে হলেও, প্রশাসন ও এলাকাবাসীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সেটা সম্ভব হয়েছে।

বিদ্যালয়ের জমিদাতা আবুল হাওলাদার বলেন, ‘আমরা চাই আমাদের সন্তানেরা আর মাঝপদ্মা পাড়ি না দিয়ে এখানেই শিক্ষার আলোতে আলোকিত হোক।’

শিক্ষা এগিয়ে নিতে প্রস্তুত প্রশাসন

বর্তমান ইউএনও জাকিয়া সুলতানা জানান, বিদ্যালয়টি চালু করতে এখন কেবল পাঠদানের অনুমতির অপেক্ষা। সরকারি বরাদ্দে বেঞ্চসহ প্রয়োজনীয় সব সরঞ্জাম কেনা হয়ে গেছে। খুব শিগগিরই বিদ্যালয়ে পাঠদান শুরু হবে।

ইতিহাস গড়ল ফরিদপুর: দুর্গম পদ্মার চরে প্রথম মাধ্যমিক বিদ্যালয়

আপডেট সময় : ০৭:৩৫:৫৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৫

শিক্ষায় অবহেলিত এই এলাকায় কখনো গড়ে ওঠেনি কোনো মাধ্যমিক বিদ্যালয়। অবশেষে সেই অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে, স্থানীয়দের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিয়েছে। হাওলাদারকান্দি গ্রামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সদরপুর উপজেলা প্রশাসন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, যা হয়ে উঠবে এ অঞ্চলের শিক্ষার বাতিঘর — এমনটাই প্রত্যাশা চরবাসীর।

চরবাসীর শত বছরের অপেক্ষার অবসান

সদরপুর উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের একটি হলো নারিকেলবাড়িয়া, যার অবস্থান সরাসরি পদ্মা নদীর চরে। এখানে আগে ছিল ১০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, তবে মাধ্যমিক শিক্ষার কোনো সুযোগ ছিল না। কাছাকাছি চরনাছিরপুর, চরমানাইরসহ আশেপাশের চরগুলোও ছিল একই অবহেলার শিকার। প্রাথমিক বিদ্যালয় পেরোলেই চরবাসীর শিক্ষার পথ থেমে যেত। ফলে অধিকাংশ শিশু বাধ্য হতো মাছ ধরা কিংবা কৃষিকাজে যুক্ত হতে।

একদিন চরবাসীর কানে এলো আশার গল্প

২০২৩ সালে সদরপুরের তৎকালীন ইউএনও আহসান মাহমুদ রাসেল উন্নয়ন কাজ পরিদর্শনে এসে জানতে পারেন এখানে কোনো মাধ্যমিক বিদ্যালয় নেই। তখনই সিদ্ধান্ত নেন — এখানকার জন্য একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করবেন।
তার উদ্যোগে এবং স্থানীয় শিক্ষানুরাগী আবুল হাওলাদারের জমিদানে শুরু হয় বিদ্যালয় গড়ার যাত্রা। তিনি এক একর জমি দান করেন বিদ্যালয়ের জন্য। এরপর উপজেলা প্রশাসনের উন্নয়ন তহবিলের বরাদ্দে নির্মাণকাজ শুরু হয়।
২০২৩ সালের ১৬ নভেম্বর ফরিদপুর জেলা প্রশাসক কামরুল আহসান তালুকদার বিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।

শিক্ষা আলো ছড়াবে দুর্গম চরেও

সদরপুর উপজেলা সদর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরের এই ইউনিয়নে যোগাযোগের মাধ্যম মূলত ট্রলার। ঢেউখালী ইউনিয়নের শয়তানখালী নৌঘাট হয়ে পদ্মা নদী পেরিয়ে পৌঁছাতে হয় এ অঞ্চলে।
এখানে প্রায় ২০ হাজার মানুষ বসবাস করে। আগে শিশুদের হাতে বই-খাতার বদলে থাকত মাছ ধরার সরঞ্জাম, চায়ের কেটলি কিংবা গরু-ছাগলের রশি। এখন তারা হাতে তুলে নেবে শিক্ষা সামগ্রী।

পরিবর্তনের আশায় মুখরিত চরবাসী

স্থানীয় বাসিন্দা রাজামল্লিক বলেন, আগে পঞ্চম শ্রেণির পর পড়াশোনা থেমে যেত। এখন মাধ্যমিক বিদ্যালয় হওয়ায় শিশুদের পড়াশোনার সুযোগ তৈরি হবে।
ইউপি চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন সরদার জানান, অনেক চেষ্টার পর চরবাসী তাদের স্বপ্নের স্কুল পেয়েছে। ইতিমধ্যেই টিনের ঘর তৈরি করা হয়েছে, বেঞ্চসহ শিক্ষা সামগ্রী পৌঁছে গেছে। শিগগিরই শিক্ষক নিয়োগ সম্পন্ন হবে।

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোফাজ্জেল হোসেন বলেন, এত দুর্গম চরে মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা একটা অসম্ভব কাজ মনে হলেও, প্রশাসন ও এলাকাবাসীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সেটা সম্ভব হয়েছে।

বিদ্যালয়ের জমিদাতা আবুল হাওলাদার বলেন, ‘আমরা চাই আমাদের সন্তানেরা আর মাঝপদ্মা পাড়ি না দিয়ে এখানেই শিক্ষার আলোতে আলোকিত হোক।’

শিক্ষা এগিয়ে নিতে প্রস্তুত প্রশাসন

বর্তমান ইউএনও জাকিয়া সুলতানা জানান, বিদ্যালয়টি চালু করতে এখন কেবল পাঠদানের অনুমতির অপেক্ষা। সরকারি বরাদ্দে বেঞ্চসহ প্রয়োজনীয় সব সরঞ্জাম কেনা হয়ে গেছে। খুব শিগগিরই বিদ্যালয়ে পাঠদান শুরু হবে।