ঢাকা ০৪:১৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ৩ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ধর্ষণের শিকার হয়ে বিচার চাইতে গিয়ে বিপাকে নারী

মাদারীপুর প্রতিনিধি
  • আপডেট সময় : ০৬:০৭:১১ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৫
  • / 271

মাদারীপুরে এক নারী ধর্ষণের শিকার হয়ে বিচার চাইতে গিয়ে আরও বিপাকে পড়েছেন। ওই নারীর অভিযোগ, শুভ নামের এক ব্যক্তি তাকে অচেতন করে ধর্ষণ করে এবং সেই ঘটনার ভিডিও ধারণ করে। এরপর সেই ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে তাকে বারবার ধর্ষণ করা হয় ও টাকা নেওয়া হয়। এ ঘটনায় মামলা হলেও আসামির পরিবার ভুক্তভোগীকে হুমকি দিচ্ছে। এমনকি ধর্ষকের মোবাইলও জব্দ করতে পারেনি পুলিশ। ধর্ষকের মোবাইল থেকে ছবি নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছাড়া হচ্ছে। এতে মানসিকভাবে ও শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন ভুক্তভোগী নারী।

এ ঘটনায় গত শনিবার মাদারীপুরে একটি সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এরপরেই বিষয়টি নিয়ে শহরে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। সংবাদ সম্মেলন করার সময় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ভুক্তভোগীকে ফোন দিয়ে শাসিয়েছেন বলেও জানান ওই নারী।

সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগীর বিবরণ

সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী জানান, মাদারীপুর সদর উপজেলার ঘটমাঝি গ্রামের বাসিন্দা শুভ (৩০) তার আত্মীয় হয়। এ সুবাদে শুভ মাঝেমধ্যে তার বাবার বাড়ি আসত। পারিবারিক প্রয়োজনে শুভর গাড়ি ভাড়া নিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যেত তারা।

পারিবারিক বিষয়ে স্বামীর সঙ্গে মনোমালিন্য হয় ওই নারীর। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এ সুযোগে শুভ ভুক্তভোগীকে স্বামীর সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়ার কথা বলে। স্বামীর বাসায় নিয়ে যাওয়ার কথা বলে ২০২৪ সালের ১১ নভেম্বর সন্ধ্যায় বাসা থেকে বের করে ওই নারীকে। পরে শহরের পাকদী এলাকায় গিয়ে গাড়ির মালিকের বাসায় একটু কাজ আছে বলে গাড়ি থামায়। তখন ওই নারীর মুখমণ্ডলে একটি রুমাল দিয়ে চেপে ধরে শুভ। এতে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন।

পরে নিজেকে শহরের পাকদী এলাকার কাইয়ুম মিয়ার বাড়িতে আবিষ্কার করেন ওই নারী। তাকে কেন এ বাড়িতে আনা হয়েছে জানতে চাইলে শুভ ধর্ষণের ভিডিও ও অশ্লীল ছবি দেখায়। ঘটনাটি কাউকে জানাতেও নিষেধ করে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকিও দেয়।

সম্মান বাঁচাতে ভুক্তভোগী বিষয়টি গোপন রাখেন। শুভকে ধর্ষণের ছবি ও ভিডিও মুছে ফেলতে অনুরোধ করেন। তবে তা না করে শুভ ওই নারীকে ব্ল্যাকমেইল করা শুরু করে। ধর্ষণের ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে শারীরিক সম্পর্ক করতে থাকে। এমনকি স্বামী-স্ত্রীর পরিচয়ে রাজধানী ঢাকাতে বাসা ভাড়া নিয়ে কিছুদিন বসবাসও করে।

শুধু শারীরিক সম্পর্ক করেই ক্ষান্ত হয়নি শুভ। বিভিন্ন সময় ওই নারীর থেকে টাকা দাবি করত সে। বাধ্য হয়ে শুভকে টাকা দিতেন ওই নারী। এভাবে ভুক্তভোগীর কাছ থেকে তিন লাখ ৩০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয় শুভ। ভুক্তভোগী ও তার বোনের নামে এনজিও থেকে তোলা টাকাও নেয়। বিষয়টি নিয়ে ভুক্তভোগীর স্বামীকে ফোন দিয়ে টাকা দাবি করে শুভ।

বিষয়টি শুভর পরিবারকে জানালেও তারা এতে কর্ণপাত করেনি। অবশেষে এ ঘটনায় গত ৯ ফেব্রুয়ারি মাদারীপুর সদর মডেল থানায় ধর্ষণ মামলা করেন ভুক্তভোগী। পরে পুলিশ শুভকে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে পাঠায়।

ভুক্তভোগীর অভিযোগ

সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী ওই নারী বলেন, ‘মামলার পর পুলিশ আমার মোবাইল জব্দ করলেও শুভর মোবাইল জব্দ করতে পারেনি। মামলা তুলে নিতে শুভর পরিবার আমাকে হুমকি দিচ্ছে। শুভর স্ত্রী আমার কিছু অপ্রীতিকর ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দিয়েছে। পুলিশ নিশ্চুপ অবস্থায় রয়েছে। শুভর মোবাইল জব্দ করতে তারা ব্যবস্থা নিচ্ছে না। আমি এর প্রতিকার চাই।’

তদন্তকারী কর্মকর্তার বক্তব্য

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মাদারীপুর মডেল সদর থানার এসআই কামরুল ইসলাম বলেন, ‘আসামিকে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে। ভিকটিমের মেডিকেল করানো হয়েছে। আসামি শুভর ডিএনএ করানোর ব্যবস্থা করেছি। এগুলোর রিপোর্ট আসলে মামলার পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া যাবে। আসামির মোবাইল জব্দ করা যায়নি। ভিকটিমের মোবাইল সিআইডিতে পাঠানো হয়েছে রেকর্ড চেক করার জন্য। ভুক্তভোগী ও তার পরিবারকে হুমকি দেওয়ার বিষয়টি আমার জানা নেই।’

সংবাদ সম্মেলনের সময় ফোন দিয়ে শাসানোর বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি এমনটি করিনি।’

ওসির বক্তব্য

এ বিষয়ে মাদারীপুর মডেল সদর থানার ওসি মোকসেদুর রহমান বলেন, ‘মামলার বাদী এখন পর্যন্ত আমার কাছে কোনো অভিযোগ করেনি। আসামির মোবাইল জব্দের চেষ্টা চলছে।’

ধর্ষণের শিকার হয়ে বিচার চাইতে গিয়ে বিপাকে নারী

আপডেট সময় : ০৬:০৭:১১ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৫

মাদারীপুরে এক নারী ধর্ষণের শিকার হয়ে বিচার চাইতে গিয়ে আরও বিপাকে পড়েছেন। ওই নারীর অভিযোগ, শুভ নামের এক ব্যক্তি তাকে অচেতন করে ধর্ষণ করে এবং সেই ঘটনার ভিডিও ধারণ করে। এরপর সেই ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে তাকে বারবার ধর্ষণ করা হয় ও টাকা নেওয়া হয়। এ ঘটনায় মামলা হলেও আসামির পরিবার ভুক্তভোগীকে হুমকি দিচ্ছে। এমনকি ধর্ষকের মোবাইলও জব্দ করতে পারেনি পুলিশ। ধর্ষকের মোবাইল থেকে ছবি নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছাড়া হচ্ছে। এতে মানসিকভাবে ও শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন ভুক্তভোগী নারী।

এ ঘটনায় গত শনিবার মাদারীপুরে একটি সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এরপরেই বিষয়টি নিয়ে শহরে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। সংবাদ সম্মেলন করার সময় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ভুক্তভোগীকে ফোন দিয়ে শাসিয়েছেন বলেও জানান ওই নারী।

সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগীর বিবরণ

সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী জানান, মাদারীপুর সদর উপজেলার ঘটমাঝি গ্রামের বাসিন্দা শুভ (৩০) তার আত্মীয় হয়। এ সুবাদে শুভ মাঝেমধ্যে তার বাবার বাড়ি আসত। পারিবারিক প্রয়োজনে শুভর গাড়ি ভাড়া নিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যেত তারা।

পারিবারিক বিষয়ে স্বামীর সঙ্গে মনোমালিন্য হয় ওই নারীর। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এ সুযোগে শুভ ভুক্তভোগীকে স্বামীর সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়ার কথা বলে। স্বামীর বাসায় নিয়ে যাওয়ার কথা বলে ২০২৪ সালের ১১ নভেম্বর সন্ধ্যায় বাসা থেকে বের করে ওই নারীকে। পরে শহরের পাকদী এলাকায় গিয়ে গাড়ির মালিকের বাসায় একটু কাজ আছে বলে গাড়ি থামায়। তখন ওই নারীর মুখমণ্ডলে একটি রুমাল দিয়ে চেপে ধরে শুভ। এতে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন।

পরে নিজেকে শহরের পাকদী এলাকার কাইয়ুম মিয়ার বাড়িতে আবিষ্কার করেন ওই নারী। তাকে কেন এ বাড়িতে আনা হয়েছে জানতে চাইলে শুভ ধর্ষণের ভিডিও ও অশ্লীল ছবি দেখায়। ঘটনাটি কাউকে জানাতেও নিষেধ করে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকিও দেয়।

সম্মান বাঁচাতে ভুক্তভোগী বিষয়টি গোপন রাখেন। শুভকে ধর্ষণের ছবি ও ভিডিও মুছে ফেলতে অনুরোধ করেন। তবে তা না করে শুভ ওই নারীকে ব্ল্যাকমেইল করা শুরু করে। ধর্ষণের ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে শারীরিক সম্পর্ক করতে থাকে। এমনকি স্বামী-স্ত্রীর পরিচয়ে রাজধানী ঢাকাতে বাসা ভাড়া নিয়ে কিছুদিন বসবাসও করে।

শুধু শারীরিক সম্পর্ক করেই ক্ষান্ত হয়নি শুভ। বিভিন্ন সময় ওই নারীর থেকে টাকা দাবি করত সে। বাধ্য হয়ে শুভকে টাকা দিতেন ওই নারী। এভাবে ভুক্তভোগীর কাছ থেকে তিন লাখ ৩০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয় শুভ। ভুক্তভোগী ও তার বোনের নামে এনজিও থেকে তোলা টাকাও নেয়। বিষয়টি নিয়ে ভুক্তভোগীর স্বামীকে ফোন দিয়ে টাকা দাবি করে শুভ।

বিষয়টি শুভর পরিবারকে জানালেও তারা এতে কর্ণপাত করেনি। অবশেষে এ ঘটনায় গত ৯ ফেব্রুয়ারি মাদারীপুর সদর মডেল থানায় ধর্ষণ মামলা করেন ভুক্তভোগী। পরে পুলিশ শুভকে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে পাঠায়।

ভুক্তভোগীর অভিযোগ

সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী ওই নারী বলেন, ‘মামলার পর পুলিশ আমার মোবাইল জব্দ করলেও শুভর মোবাইল জব্দ করতে পারেনি। মামলা তুলে নিতে শুভর পরিবার আমাকে হুমকি দিচ্ছে। শুভর স্ত্রী আমার কিছু অপ্রীতিকর ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দিয়েছে। পুলিশ নিশ্চুপ অবস্থায় রয়েছে। শুভর মোবাইল জব্দ করতে তারা ব্যবস্থা নিচ্ছে না। আমি এর প্রতিকার চাই।’

তদন্তকারী কর্মকর্তার বক্তব্য

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মাদারীপুর মডেল সদর থানার এসআই কামরুল ইসলাম বলেন, ‘আসামিকে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে। ভিকটিমের মেডিকেল করানো হয়েছে। আসামি শুভর ডিএনএ করানোর ব্যবস্থা করেছি। এগুলোর রিপোর্ট আসলে মামলার পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া যাবে। আসামির মোবাইল জব্দ করা যায়নি। ভিকটিমের মোবাইল সিআইডিতে পাঠানো হয়েছে রেকর্ড চেক করার জন্য। ভুক্তভোগী ও তার পরিবারকে হুমকি দেওয়ার বিষয়টি আমার জানা নেই।’

সংবাদ সম্মেলনের সময় ফোন দিয়ে শাসানোর বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি এমনটি করিনি।’

ওসির বক্তব্য

এ বিষয়ে মাদারীপুর মডেল সদর থানার ওসি মোকসেদুর রহমান বলেন, ‘মামলার বাদী এখন পর্যন্ত আমার কাছে কোনো অভিযোগ করেনি। আসামির মোবাইল জব্দের চেষ্টা চলছে।’