মিলেছে তাদের পরিচয়
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে ঢাকায় নিহত ফরিদপুরের ৮ বাসিন্দা
- আপডেট সময় : ০৩:৩৯:২০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৪
- / 180
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে সরকার পতনের এক দফা দাবি আদায়ের আন্দোলন করতে গিয়ে নিহতদের মধ্যে আটজনের পরিচয় জানা গেছে। এদের প্রায় সকলেই আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে রাজধানী ঢাকায় গুলিতে নিহত হন।
এর মধ্যে ৪ বছর ও ১০ বছরের দু’টি শিশুও রয়েছে। এছাড়া শহরের গোয়ালচামটের বাসিন্দা জেলা বিএনপির সাবেক এক সম্পাদক এবং হাউজিং এস্টেট এলাকার এক ব্যবসায়ী ফরিদপুর সদর উপজেলায় এক গ্যারেজ মিস্ত্রিসহ তিনজন, ভাঙ্গা উপজেলার দুই শিশু ও এক কলেজ শিক্ষার্থীসহ তিনজন, মধুখালী উপজেলায় এক আনসার সদস্য ও বোয়ালমারী উপজেলায় আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবকলীগের একজন কর্মী রয়েছেন।
শিক্ষার্থীদের কোটাবিরোধী আন্দোলন দমনে তৎকালীন সরকারের সহিংসতার শুরুর দিকে ১৯ জুলাই শুক্রবার দুপুরে ঢাকার উত্তরার বনশ্রীতে গুলিতে নিহত হন জেলা বিএনপির সাবেক কমিটির একজন সম্পাদক ও শহরের গোয়ালচামটের মোল্লা বাড়ির বাসিন্দা শরীফ সামসুল আলম মন্টুর পুত্র জান শরীফ মিঠু (৪৬)। দুপুরে বনশ্রী জামে মসজিদে জুমার নামাজ পড়ে ফেরার পথে হেলিকপ্টার থেকে গুলি করা হয় জান শরীফ মিঠুকে। এসময় তার সাথে আরো চারপাঁচজন সঙ্গী ছিলেন। দ্রুত তাকে বনশ্রী ক্লিনিকে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক জানান যে, তার মৃত্যু হয়েছে। এ অবস্থায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি না দেখিয়ে সেই রাতেই কোনভাবে অ্যাম্বুলেন্সে লাশ ফরিদপুরে এনে দাফন করা হয়। হাসপাতালের রেজিস্ট্রারে নাম না থাকায় জান শরীফ মিঠুর মৃত্যুর খবরটি মিডিয়াতেও আসেনি। আর আইনগত ঝামেলা এড়াতে তার পরিবার বিষয়টি কাউকে না জানানোরও পথ বেছে নেয়। স্থানীয় বিএনপির একজন নেতা জানান, ঢাকার হাসপাতালে কুষ্টিয়া ছাত্রশিবিরের একজন সাবেক ছাত্রনেতা মিঠুর লাশ দ্রুত হাসপাতাল থেকে ছাড় করিয়ে ফরিদপুরে আনতে সহায়তা করেন। জানা গেছে, জান শরীফ মিঠুর স্ত্রী ঢাকায় চাকরি করেন। সেই সুবাদে তিনি পরিবার নিয়ে ঢাকার উত্তরায় থাকতেন। তার স্ত্রী ও ছোট একটি মেয়ে রয়েছে।
একইদিন ১৯ জুলাই ঢাকায় বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনে যেয়ে পুলিশের গুলিতে নিহত হন ঢাকার ধানমন্ডি আইডিয়াল কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র খালিদ হাসান সাইফুল্লাহ (১৭)। জেলার ভাঙ্গা উপজেলার তুজারপুর ইউনিয়নের ভদ্রাসন গ্রামের বাসিন্দা ঠিকাদার কামরুল হাসান ফারুকের সন্তান তিনি। তাদের পরিবার ঢাকার আজিমপুর কলোনিতে থাকেন। ওইদিন বিকেলে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মিছিলে যেয়ে গুলিবিদ্ধ হয়। পরে ঢাকা মেডিকেলে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসকৃত তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এদিকে, সন্তানের মৃতদেহ হাসপাতাল থেকে ছাড়িয়ে আনতে গেলে কামরুল হাসানকে বিএনপি-জামাত বলে গালমন্দ করে পুলিশ। অনেক কষ্টে তিনদিন পরে ছেলের লাশ হাতে পান তারা। এরপর রাতের আধারে গ্রামের বাড়িতে এনে রাত গভীরেই তাকে দাফন করা হয়।
এক দফা আন্দোলনের একেবারে চূড়ান্ত লগ্নে অসহযোগ কর্মসূচির দিনে গত ৪ আগস্ট ঢাকার মিরপুর-১০ এ গুলিতে নিহত হন শহরের গোয়ালচামট হাউজিং এস্টেটের মো. কামরুল ইসলাম সেতু (৪৭)। দুপুরে মিরপুর-১১ এর বাসা থেকে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার সময় আন্দোলনকারীদের উপর গুলি বর্ষণ করা হলে গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি মারা যান। তার পরিবার জানান, এরপর তাকে প্রথমে স্থানীয় একটি হাসপাতালে এবং সেখান থেকে প্রথমে সরোয়ার্দী হাসপাতালে ও পরে সেখান থেকে নিউরো সায়েন্স হাসপাতালে নেয়া হয়। হাসপাতাল থেকে একজন অপরিচিত ব্যক্তি তার স্ত্রীকে ফোন করে জানান যে, তিনি মাথায় আঘাত পেয়ে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। এ খবর পেয়ে প্রথমে সরোয়ার্দী হাসপাতালে গেলে সেখানে পাওয়া যায়নি সেতুকে। পরে সেতুর ছেলে আলভির এক বন্ধুর মাধ্যমে তারা জানতে পারেন যে, তাকে নিউরো সায়েন্স হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। সেখানে খোঁজাখুঁজি করে সেতুর লাশ মিললেও সেখান থেকে লাশ ছাড় করা হচ্ছিলোনা। হাসপাতাল থেকে বলা হচ্ছিলো- পুলিশের ছাড়পত্র নিয়ে আসার কথা। আবার তখন মিরপুর-১০ এর থানাও জ্বালিয়ে দিয়েছিলো। এ অবস্থায় অনেক অনুনয় বিনয়ের পরে পরবর্তীতে কোনপ্রকার আইনগত পদক্ষেপ নেয়া হবেনা মর্মে মুচলেকা দিয়ে লাশ ছাড় করিয়ে দাফন করা হয়। নিহত কামরুল ইসলাম সেতুর স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। ছেলেটি একটি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে এবং মেয়েটি এইচএসসিতে পড়ে। ঢাকায় তাদের বাবা অনলাইনে কসমেটিক্সের ব্যবসা করতেন। পিতাকে হারিয়ে তাদের শিক্ষাজীবন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় বাড্ডা এলাকায় পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। আশপাশে বেশ কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। রণক্ষেত্রে পরিণত হয় পুরো এলাকা, যেখানে পুলিশের বিরুদ্ধে ‘অতিরিক্ত’ বলপ্রয়োগ ও ব্যাপক গুলি ছোড়ার অভিযোগ রয়েছে। বাড্ডায় হতাহত হয় অনেক মানুষ। গণ-অভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগ করে গণভবন ছেড়ে শেখ হাসিনার পতনের পরে ৫ আগস্ট ঢাকার বাড্ডা থানা ঘেরাও করে রাখে স্থানীয় মানুষ। তখন থেকে থেমে থেমে স্থানীয়রা থানার দিকে ইটপাটকেল ছুটতে থাকে। গুলির কারণে কেউ ভেতরে ঢুকতে পারেনি। তবে গুলিতে অনেকে হতাহত হয়েছে, যাদের রিকশায় করে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এদিন বাড্ডায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান শহরের সিএন্ডবি ঘাট এলাকার আইজুদ্দিন মাতুব্বরের ডাঙ্গীর শফি মাঝির ছেলে সিরাজুল ইসলাম। তিনি পেশায় একজন গ্যারেজ মিস্ত্রি ছিলেন। ঢাকার বাড্ডা এলাকায় গ্যারেজে কাজ শেষে বাসায় ফেরার পথে সিরাজুল গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান।
অপরদিকে ৫ আগস্ট বিকেলে ফরিদপুরের কোতয়ালী থানায় হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় থানায় অবরুদ্ধ পুলিশেরা গুলি করতে করতে থানা ছেড়ে পুলিশ লাইন্সে চলে যান। এসময় পুলিশের গুলিতে নিহত হন শহরের পূর্ব খাবাসপুর মহল্লার বাসিন্দা শামসু ড্রাইভার (৬২)।
এর আগে আন্দোলন দমন করতে ঢাকার বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় প্রবেশ করে বিভিন্ন বাসাবাড়ি লক্ষ্য করে ছোঁড়া গুলিতে রামপুরায় নিহত হয় তামিম নামে ১০ বছরের এক শিশু। নিহত তামিম ফরিদরের ভাঙ্গা উপজেলার হামিরদী ইউনিয়নের খাঁপুরা গ্রামের রিক্সা চালক জুয়েল শিকদারের ছেলে। তার ছেলে তামিম রামপুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণিতে পড়তো। ১৯ জুলাই বন্ধুদের সাথে রামপুরা মাঠে ফুটবল খেলার সময় আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এলোপাথাড়ি গুলিতে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায় তামিম।
একইদিনে ১৯ জুলাই যাত্রাবাড়ির রায়েরবাগে গুলিতে মারা যায় আহাদ নামে চার বছ এক শিশু। সে ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা উপজেলার মানিকদহ ইউনিয়নের পুকুরিয়া গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল হাসানের সন্তান। জানা গেছে, আবুল হাসান ঢাকায় আয়কর অফিসের উচ্চমান সহকারী পদে চাকরি করেন। পরিবার নিয়ে রায়েরবাগে ১১ তলা একটি ভবনের ৮তলায় বসবাস করেন। ১৯ জুলাই বিকেলে বাইরে আন্দোলনকারীদের সাথে সংঘর্ষকালে আহাদ তাদের ৮ তলা বাসার বেলকুনিতে থাকা অবস্থায় চোখে গুলিবিদ্ধ হয়। সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই রাতে সে মারা যায়।
ফরিদপুরে মধুখালী উপজেলার মেগচামী ইউনিয়নের পার আশাপুর গ্রামের মৃত আকিদুল শেখের ছেলে জুয়েল শেখ (২৪) চাকরি করতেন আনসারে। অঙ্গীভূত আনসার সদস্য হিসেবে ডিএমপিতে যোগদান করে মতিঝিল থানায় কর্মরত অবস্থায় ১৯ জুলাই রাতে ঢাকা ফকিরাপুল এলাকায় ডিউটি শেষে সহকর্মীদের সঙ্গে মতিঝিল থানায় ফেরার পথে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান তিনি। পরেরদিন তার লাশ গ্রামের বাড়ি মধুখালীর আশাপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়।
এছাড়া ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার রূপাপাত ইউনিয়নের কদমী গ্রামের বাসিন্দা মোহাম্মদ বাকিয়ার মোল্লা (৪০) মারা যান ঢাকায়। তিনি সেখানে কাপড়ের ব্যবসা করতেন। ১৮ জুলাই ছাত্র-জনতার হামলায় গুরুতর আহত অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে নেয়ার পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৩ জুলাই মারা যান।




















