বাংলাদেশ-পাকিস্তান পররাষ্ট্র সচিব বৈঠক: অমীমাংসিত ইস্যু ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদারের আলোচনা
৪.৩২ বিলিয়ন ডলার ন্যায্য হিস্যা চাইলো বাংলাদেশ
- আপডেট সময় : ০২:০৪:৩৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৫
- / 242
বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় আয়োজিত এই বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে নেতৃত্ব দেন পররাষ্ট্র সচিব এম জসীম উদ্দিন এবং পাকিস্তানের পক্ষে নেতৃত্ব দেন দেশটির পররাষ্ট্র সচিব আমনা বালুচ। বৈঠকের বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক মিডিয়া ব্রিফিং করেন পররাষ্ট্র সচিব এম জসীম উদ্দিন। এ সময় পাকিস্তানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ইকবাল হুসেইন খান, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক ইশরাত জাহান ও রফিকুল আলম উপস্থিত ছিলেন।
ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র সচিব এম জসীম উদ্দিন জানান, বৈঠকে বাংলাদেশ পাকিস্তানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিষয়গুলো জোরালোভাবে উত্থাপন করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বাংলাদেশে আটকে পড়া পাকিস্তানিদের প্রত্যাবাসন, অবিভাজিত সম্পদের ন্যায্য হিস্যা প্রদান, ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য প্রেরিত বিদেশি সাহায্যের অর্থ হস্তান্তর এবং ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের তৎকালীন সশস্ত্রবাহিনী কর্তৃক সংঘটিত গণহত্যার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাওয়া। এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র সচিব জানান, পাকিস্তানের কাছে বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যার পরিমাণ ৪.৩২ বিলিয়ন ডলার। এছাড়াও ১৯৭০ সালের নভেম্বরের ঘূর্ণিঝড়ে বিদেশ থেকে আসা ২০০ মিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ অর্থ হস্তান্তরের জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে। অপর এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, বাংলাদেশ থেকে ইতোমধ্যে ১ লাখ ২৬ হাজার ৯৪১ জন আটকে পড়া পাকিস্তানি পাকিস্তানে ফিরে গেছেন, তবে এখনো ৩ লাখ ২৪ হাজার ১৪৭ জন আটকে পড়া পাকিস্তানি বাংলাদেশে রয়েছেন। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় তার বন্ধুপ্রতিম প্রতিবেশী দেশ হিসেবে পাকিস্তানের সঙ্গে বিদ্যমান ঐতিহাসিকভাবে অমীমাংসিত বিষয়গুলোর দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তির মাধ্যমে একটি মজবুত, কল্যাণমুখী ও ভবিষ্যৎমুখী সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য পাকিস্তানের সহযোগিতা কামনা করে এবং এই লক্ষ্যে উভয় দেশ একযোগে কাজ করার বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করেছে।
পররাষ্ট্র সচিব এম জসীম উদ্দিন সার্কের আওতায় আঞ্চলিক সহযোগিতার গুরুত্ব তুলে ধরে এর পুনরুজ্জীবনের আহ্বান জানান, যাতে দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, সহযোগিতা এবং উন্নয়নকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। তিনি ওআইসি সনদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে বাংলাদেশের দৃঢ় প্রতিশ্রুতি এবং মুসলিম উম্মাহর স্বার্থে কাজ করার ব্যাপারে বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনায় উভয় দেশই গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি দখলদার বাহিনী কর্তৃক সংঘটিত গণহত্যা ও চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। বাংলাদেশ জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিকদের নিরাপদে তাদের মাতৃভূমিতে প্রত্যাবর্তনের লক্ষ্যে পাকিস্তানের সমর্থনও কামনা করেছে। অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের ওপর জোর দিয়ে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, পাকিস্তানের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধির জন্য বাজার প্রবেশের সুযোগ বৃদ্ধি, বাণিজ্য প্রক্রিয়া সহজীকরণ, শুল্ক বাধা দূরীকরণ এবং বাংলাদেশে পাকিস্তানের বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে প্রচেষ্টা জোরদার করার বিষয়ে তিনি গুরুত্বারোপ করেছেন। কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়েও আলোচনা হয়েছে, যাতে প্রযুক্তি, উন্নত প্রজাতি এবং অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি করা যায়। এছাড়াও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও বন্যা প্রতিরোধে উভয় দেশের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের বিষয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। পররাষ্ট্র সচিব জানান, সম্প্রতি দুই দেশের মধ্যে সরাসরি শিপিং রুট চালু হয়েছে এবং সরাসরি ফ্লাইট পুনরায় চালুর মাধ্যমে দুই দেশের জনগণের মধ্যে সংযোগ ও ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধির বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে খুব শীঘ্রই দুই দেশের মধ্যে সরাসরি ফ্লাইট চালু করা সম্ভব হবে। বৈঠকের বিষয়ে তিনি আরও বলেন, উচ্চশিক্ষা ও বৈজ্ঞানিক গবেষণায় পারস্পরিক সহযোগিতার নতুন সুযোগ অনুসন্ধানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং এসব ক্ষেত্রে পারস্পরিক শিক্ষা বৃত্তির সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। সংস্কৃতি ও ক্রীড়া ক্ষেত্রে সম্পর্ক জোরদার করার প্রয়োজনীয়তার কথাও আলোচনায় এসেছে এবং দুই দেশের শিল্পী, চিত্রশিল্পী, সংগীতশিল্পী, লেখক ও শিক্ষাবিদদের সফরের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক বিনিময়কে উভয় পক্ষ থেকেই উৎসাহিত করা হয়েছে।
এদিকে, পাকিস্তানের পররাষ্ট্র সচিব আমনা বালুচ বিকেলে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনের সঙ্গে বৈঠক করেন। এছাড়াও তিনি প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। সাক্ষাৎ শেষে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র সচিব আমনা বালুচ বাংলাদেশের সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে বলে মন্তব্য করেন। দীর্ঘ সময় পর দুই দেশের মধ্যে এই ধরনের আলোচনাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, ইসলামাবাদ ও ঢাকার বাণিজ্যিক সম্পর্ক বৃদ্ধিতে উভয় দেশকেই আরও বেশি মনোযোগী হতে হবে। এছাড়াও আলোচনায় ১৯৭১ সালের অমীমাংসিত বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণভাবে আসতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক শাহাব এনাম মনে করেন, পাকিস্তান পররাষ্ট্র সচিবের বাংলাদেশ সফর দেশের জন্য একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। অর্থনীতির গতিশীলতা বজায় রাখার জন্য এই আলোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মুক্তিযুদ্ধের সময়কার অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়েও আলোচনা করা প্রয়োজন, যা ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারে সহায়ক হবে। পাশাপাশি আমদানি-রফতানি সংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়েও আলোচনা হওয়া উচিত, কারণ পাকিস্তানে বাংলাদেশি পণ্যের যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। এর আগে, ২০১০ সালের নভেম্বরে ইসলামাবাদে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের সর্বশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
অন্যদিকে, পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার চলতি মাসের শেষের দিকে ঢাকা সফর করবেন বলে জানা গেছে। ২০১২ সালের পর বাংলাদেশে এটিই হবে কোনো পাকিস্তানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রথম আনুষ্ঠানিক সফর।
পাকিস্তানের গণমাধ্যম জিও নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় দেড় দশক পর বৃহস্পতিবার পাকিস্তান ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং এতে দ্বিপাক্ষিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত বছর ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ ও বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহামম্মদ ইউনূস ইতোমধ্যে দুবার সাক্ষাৎ করেছেন—প্রথমবার গত বছর সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনের সাইডলাইনে এবং দ্বিতীয়বার গত ডিসেম্বরে কায়রোতে ডি-৮ সম্মেলনে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশ পাকিস্তানের জন্য ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করেছে এবং সরাসরি দুই দেশে জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে। পাকিস্তানও দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, পর্যটন ও বিনিয়োগ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। পাকিস্তানে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার ইকবাল হোসেন খান জানিয়েছেন, পাকিস্তান বাংলাদেশে রপ্তানি বৃদ্ধির বিষয়ে আগ্রহী। ২০১০ সালে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে সর্বশেষ পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের আলোচনা (এফওসি) অনুষ্ঠিত হয়েছিল। পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারও এই মাসের শেষের দিকে ঢাকা সফর করবেন বলে আশা করা হচ্ছে, যা ২০১২ সালের পর কোনো পাকিস্তানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রথম বাংলাদেশ সফর হবে।

























