ফরিদপুরে রাজেন্দ্র কলেজের শিক্ষক আনসার আলী ৪৫ কোটি টাকার প্রতারণায় গ্রেপ্তার
- আপডেট সময় : ০৪:০৬:১৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩ মে ২০২৫
- / 1278
রাজনীতির প্রভাব, শিক্ষকতার সম্মান আর ধর্মীয় আবেগ—এই তিন অস্ত্রকে ঢাল বানিয়ে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ফরিদপুরে সাধারণ মানুষের বিশ্বাসকে পুঁজি করে প্রতারণা করে গেছেন সৈয়দ আনসার আলী। সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও রাজেন্দ্র কলেজের প্রভাষক পরিচয়ে মানুষের সঙ্গে প্রতিশ্রুতির ফাঁদ পাতেন তিনি। শেষ পর্যন্ত এক বছরের সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি হিসেবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়েছেন এই প্রতারক।
রাজধানীতে অভিযান, গ্রেপ্তার আনসার আলী
৩০ এপ্রিল ভোররাতে রাজধানীর লালবাগে গোপন অভিযানে আনসার আলীকে গ্রেফতার করে আলফাডাঙ্গা থানা পুলিশ, র্যাব-১০ এর সহায়তায়। অভিযানে নেতৃত্ব দেন থানার এসআই (নিরস্ত্র) সুজন বিশ্বাস। পরদিন ১ মে বিকেলে তাকে আদালতে সোপর্দ করা হয়।
আনসার আলীর বাড়ি ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলার বাজড়া গ্রামে। বোয়ালমারী থানায় দায়ের হওয়া প্রতারণা মামলায় তিনি ৪২০/৪০৬ ধারায় এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত ছিলেন।
৪৫ কোটি টাকার প্রতারণা, স্ত্রীর বিরুদ্ধেও মামলা
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, আনসার আলী নিজেকে ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠ নেতা পরিচয় দিয়ে সরকারি চাকরি ও বিদেশে পাঠানোর প্রলোভনে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে প্রায় ৪৫ কোটি টাকারও বেশি হাতিয়ে নিয়েছেন। তার স্ত্রীর বিরুদ্ধেও ৭২ লাখ টাকার একটি প্রতারণা মামলা রয়েছে।
তিনি ছাত্রলীগের “রিপন-রোটন কমিটি’র” কেন্দ্রীয় সদস্য পরিচয়ে প্রভাব বিস্তার করতেন এবং চাকরি দেওয়া, বিসিএস প্রশ্ন ফাঁসের মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
কলেজে অনুপস্থিত থেকেও নিয়মিত বেতন
২০১৩ সালে রাজেন্দ্র কলেজে সমাজকর্ম বিভাগের প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন আনসার আলী। মাত্র ছয় মাস কর্মস্থলে উপস্থিত থাকার পর নিয়মিত অনুপস্থিত থাকা সত্ত্বেও ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত তুলে গেছেন সরকারি বেতন। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বারবার শোকজ ও স্থগিতাদেশ অকার্যকর হয়ে পড়ে।
২০২৪ সালের আগস্টে অধ্যাপক রমা সাহা তার বেতন স্থগিত করেন, যা পরবর্তীতে অধ্যক্ষ এস. এম আবদুল হালিম বহাল রাখেন। অধ্যক্ষ বলেন, “এতবড় একটি প্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষক এভাবে প্রতারণায় জড়াবে—এটা লজ্জাজনক।”
ওয়াজ মাহফিল দিয়ে জনভক্তি গড়ে তোলে প্রতারণার জাল
ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করেও মানুষের মন জয় করেন আনসার। নিজের গ্রামের মাদ্রাসা মাঠে মিজানুর রহমান আজহারী, আমির হামজা, আব্দুল্লাহ আল-আমিনদের মত জনপ্রিয় বক্তাদের এনে ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন করে ধর্মভীরু মানুষদের আস্থায় নেন। ২০১৯ সালে তার উদ্যোগে তিনদিনের বিশাল মাহফিল হয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এসব মাহফিলে বিপুল জনসমাগম হতো এবং আনসারের প্রতি মানুষের বিশ্বাস আরও গভীর হতো। সেই বিশ্বাসই পরে কাজে লাগান তিনি।
“সরকারি চাকরি দেব”—নেন টাকা ও সার্টিফিকেট
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, আনসার আলী শুধু টাকা নয়, মূল সনদপত্রও রেখে দিতেন। ২০১৫ সালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চাকরি দেওয়ার কথা বলে আলিমুজ্জামান নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে ১৫ লাখ টাকা ও তার সব সার্টিফিকেট নেন। আরেক ভুক্তভোগী হারান সাহা জানান, “চার বছর ধরে আমার ১০ লক্ষ টাকা আটকে আছে। সার্টিফিকেটও ফেরত দিচ্ছে না। চাকরির বয়স শেষ—এখন আমি কোথায় যাব?”
প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্কের গল্প, আরও মামলা চলমান
আলফাডাঙ্গা প্রেসক্লাবের সভাপতি আরিফুজ্জামান চাকলাদার জানান, আনসার প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে দাবি করে মানুষকে ফাঁদে ফেলতেন। ফরিদপুরের তৎকালীন ডিসির সঙ্গেও তার সখ্যতা রয়েছে বলে প্রচার চালাতেন।
“উচ্চশিক্ষিত দুর্ধর্ষ প্রতারক”—পুলিশের ভাষ্য
আলফাডাঙ্গা থানার ওসি হারুন অর রশিদ বলেন, “আনসার আলী একজন উচ্চশিক্ষিত, অত্যন্ত কৌশলী এবং দুর্ধর্ষ প্রতারক। তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। তাকে গ্রেফতার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। তদন্ত চলছে—তার সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত করা হচ্ছে।”











