ক্রাইম সিরিজ দেখে ৪ খুন: লাশ পুড়িয়ে চা খাচ্ছিল কিশোর
- আপডেট সময় : ০৪:৫৮:১৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩০ মে ২০২৬
- / 69
ভারতের রাজস্থানের আজমীরে প্রাক্তন এক পঞ্চায়েত প্রধান, তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী, মা এবং ভাইঝিকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় শিউরে ওঠার মতো ভয়ঙ্কর তথ্য সামনে এনেছে পুলিশ। প্রাথমিক ভাবে এই চার খুনের ঘটনাটিকে একটি সাধারণ সড়ক দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দেওয়ার নিখুঁত চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু পুলিশের তীক্ষ্ণ তদন্তে বেরিয়ে এসেছে এক চরম পারিবারিক প্রতিহিংসা ও অপরাধমূলক মনস্তত্ত্বের লোমহর্ষক গল্প। এই পুরো হত্যাকাণ্ডটি নিখুঁত পরিকল্পনার মাধ্যমে করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন তদন্তকারী কর্মকর্তারা।
বৃহস্পতিবার সকালে বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে একটি পোড়া গাড়ির ভেতর থেকে পঞ্চায়েত প্রধান রামসিংহ চৌধরি, তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী সূর্যজ্ঞান, মা এবং ভাইঝির ঝলসানো মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
চা পানের সেই দৃশ্যই ধরিয়ে দিল খুনীকে:
তদন্তে নেমে পুলিশের প্রথম সন্দেহ হয় রামসিংহের ১৭ বছর বয়সী নাবালক ছেলের ওপর। পরিবারের চার চারজন সদস্য আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ার পরও ওই কিশোরের আচরণ ছিল অস্বাভাবিক রকম শান্ত। তদন্তকারী এক কর্মকর্তা জানান, রামসিংহের প্রথম স্ত্রী (কিশোরের মা) যখন কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন, তখন ওই কিশোরের চোখেমুখে শোকের কোনো বিন্দুমাত্র চিহ্ন ছিল না। বরং সে অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে তার মাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিল এবং বসে বসে শান্ত মনে চা খাচ্ছিল! কিশোরের এই চরম নির্লিপ্ততাই পুলিশের মনে সন্দেহের বীজ বুনে দেয়।
দুর্ঘটনার নাটক বনাম লাশের চাক্ষুষ প্রমাণ:
রামসিংহের পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা প্রথমে দাবি করেছিলেন, অসুস্থ মাকে নিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার পথে গাড়িটি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে এবং আগুন লেগে সবার মৃত্যু হয়। কিন্তু ফরেনসিক ও পুলিশি তদন্তে দুটি বড় খটকা ধরা পড়ে— ১. গাড়ির সামনের আসনে চালকসহ ৪ জনের কেউই ছিলেন না, সবার লাশ ছিল পেছনের আসনে। ২. রামসিংহের দ্বিতীয় স্ত্রী সূর্যজ্ঞানের শরীরে ধারালো ছুরির গভীর আঘাতের চিহ্ন মিলেছে।
এখান থেকেই তদন্তের মোড় ঘুরে যায় এবং পুলিশ রামসিংহের ছেলেকে আটক করে ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে।
অনলাইন গেম আর ক্রাইম ওয়েব সিরিজের নেশা:
পুলিশি জেরায় অভিযুক্ত কিশোর স্বীকার করেছে, সে নিয়মিত ইন্টারনেট ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মে অপরাধ সংক্রান্ত ‘ক্রাইম ওয়েব সিরিজ’ দেখত। এর পাশাপাশি দিনের বেশির ভাগ সময় মজে থাকত অনলাইন গেমে। কী ভাবে খুন করে নিখুঁতভাবে তথ্যপ্রমাণ লোপাট করা যায়, তা সে দিনের পর দিন গুগলে সার্চ করে রপ্ত করেছিল।
ঘটনার রাতে রামসিংহ এবং তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মদ্যপান করে ঘুমিয়ে পড়েন। রাত ৪টা পর্যন্ত মোবাইলে গেম খেলে গভীর রাতের অপেক্ষায় থাকে ছেলেটি। সবাই ঘুমিয়ে পড়লে সে ঘরে ঢুকে প্রথমে তার বাবাকে ছুরি দিয়ে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে। চিৎকারে দ্বিতীয় স্ত্রী সূর্যজ্ঞান জেগে উঠে বাধা দিতে গেলে তাকেও নৃশংসভাবে কুপিয়ে জখম করা হয়। অভিযোগ উঠেছে, এই হত্যাকাণ্ডে কিশোরকে সরাসরি সহযোগিতা করেছেন রামসিংহের প্রথম স্ত্রী (কিশোরের মা) এবং তাঁর কন্যাসন্তান। এরপর পাশের ঘরে ঘুমিয়ে থাকা রামসিংহের বৃদ্ধা মা এবং অবুঝ ভাইঝিও খুন করা হয়।
হত্যাকাণ্ড শেষে অপরাধের প্রমাণ ঢাকতে গভীর রাতে চারজনের লাশ গাড়ির পেছনের সিটে তুলে বাড়ি থেকে দূরে নিয়ে যাওয়া হয় এবং গাড়িটিসহ লাশগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু স্ত্রীর শরীরের ছুরির আঘাত এবং পেছনের সিটে লাশের অবস্থান—এই দুই ভুলের কারণেই শেষ রক্ষা হয়নি ক্রাইম সিরিজ দেখে খুনে মেতে ওঠা এই কিশোরের। পুলিশ এই ঘটনায় জড়িত বাকিদেরও গ্রেপ্তারের প্রক্রিয়া শুরু করেছে।

























