ঢাকা ০৩:৪৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২১ জুন ২০২৬, ৭ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন

উদ্ধার হওয়া এক লাখ ইয়াবা গায়েব, বহনকারীকে ছেড়ে দেওয়া হয় ওসির নির্দেশে

দৈনিক জাগ্রত বাংলাদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ০১:১৯:১৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
  • / 51

কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রাম নগরে আসার পথে পুলিশের এক সদস্যের কাছ থেকে এক লাখ পিস ইয়াবা বড়ি উদ্ধার করে বাকলিয়া থানা-পুলিশ। তবে এই ঘটনায় কোনো মামলা না করে উদ্ধার হওয়া বিপুল পরিমাণ ইয়াবা নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করে আত্মসাৎ করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) সরাসরি নির্দেশে ইয়াবাবহনকারীকে সসম্মানে ছেড়েও দেওয়া হয়। চট্টগ্রাম নগর পুলিশের (সিএমপি) নিজস্ব এক উচ্চপর্যায়ের তদন্ত প্রতিবেদনে খোদ পুলিশের এই লঙ্কাকাণ্ডের ভয়ংকর সত্যতা উঠে এসেছে।

জড়িত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে এই তদন্ত প্রতিবেদন গত ২৯ এপ্রিল পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো হলেও এখন পর্যন্ত মূল অভিযুক্ত ওসির বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এমনকি ঘটনার প্রায় ছয় মাস পার হতে চললেও এখনো কোনো নিয়মিত মামলা হয়নি, উদ্ধার হয়নি আত্মসাৎ হওয়া ইয়াবাও।

যেভাবে ওসির নির্দেশে ইয়াবা গায়েব হলো:

ছয় পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, কক্সবাজার জেলা আদালতের এক বিচারকের গানম্যান কনস্টেবল ইমতিয়াজ হোসেন এক লাখ ইয়াবাভর্তি একটি লাগেজ নিয়ে ঢাকাগামী একটি বাসে চড়ে আসছিলেন। বাসটি কর্ণফুলী নদীর শাহ আমানত সেতু পার হওয়ার পর বাকলিয়া থানার পুলিশ সদস্যরা বাস থেকে ইমতিয়াজকে নামিয়ে পুলিশ বক্সে নিয়ে যান।

তদন্তে ইমতিয়াজ স্বীকার করেন, পুলিশ বক্সের ভেতর লাগেজের মুখ খুলে প্রতি প্যাকেটে ১০ হাজার করে মোট ১ লাখ ইয়াবা দেখতে পান দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তা ও সোর্সেরা। তখন ইমতিয়াজ ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করলে বাকলিয়া থানার তৎকালীন ওসি আফতাব উদ্দিনের নির্দেশ আসে। ওসির সরাসরি নির্দেশে পুলিশ সদস্যরা সব ইয়াবা নিজেদের দখলে নিয়ে নেন এবং খালি লাগেজসহ ইমতিয়াজকে ছেড়ে দেন। মুক্তি পেয়ে ইমতিয়াজ কুমিল্লায় নিজের গ্রামের বাড়িতে চলে যান।

তদন্তে দোষী সাব্যস্ত, অথচ বহাল তবিয়তে ওসি:

এই কলঙ্কজনক ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. ওয়াহিদুল হক চৌধুরীকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্তে ঘটনার প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পর ৯ জন পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। বরখাস্ত হওয়াদের মধ্যে রয়েছেন— পরিদর্শক (তদন্ত) তানভীর আহমেদ, এসআই মো. আল-আমিন সরকার, এসআই মো. আমির হোসেন, এএসআই সাইফুল আলম, এএসআই জিয়াউর রহমান, এএসআই সাদ্দাম হোসেন, এএসআই এনামুল হক, কনস্টেবল রাশেদুল হাসান, কনস্টেবল উম্মে হাবিবা স্বপ্না এবং ইয়াবাবহনকারী কনস্টেবল ইমতিয়াজ হোসেন।

তবে রহস্যজনকভাবে, ঘটনার মূল নির্দেশদাতা বাকলিয়া থানার তৎকালীন ওসি আফতাব উদ্দিনের বিরুদ্ধে এখনো কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্টো তিনি বর্তমানে চট্টগ্রামের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কোতোয়ালি থানার ওসির দায়িত্বে বহাল তবিয়তে আছেন। অবশ্য নিজের দোষ অস্বীকার করে আফতাব উদ্দিন দাবি করেছেন, “আমি ইয়াবার বিষয়ে কিছু জানি না, ঘটনার সময় আমি বাসায় ছিলাম।”

আইনজীবীদের ক্ষোভ ও নতুন কমিশনারের আশ্বাস:

চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি আবদুস সাত্তার এই বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, মাদক উদ্ধারের অপরাধটি সম্পূর্ণ আমলযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও ওসির নির্দেশে আসামিকে ছেড়ে দেওয়া বড় ধরনের ফৌজদারি অপরাধ। এখানে আলামত উদ্ধার হওয়া সত্ত্বেও কেন মামলা বা জব্দ তালিকা করা হলো না এবং এর বিনিময়ে পুলিশ কোনো বেআইনি আর্থিক সুবিধা নিয়েছে কিনা, তা গভীরভাবে তদন্ত করা উচিত।

এই বিষয়ে চট্টগ্রাম নগর পুলিশের সদ্য যোগদান করা কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী সাফ জানিয়েছেন, “ইয়াবা গায়েবের মতো ঘটনা ঘটার পরও এতদিন কেন নিয়মিত মামলা করা হয়নি, তা গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মাদকের বিরুদ্ধে আমার অবস্থান পরিষ্কার— জিরো টলারেন্স।”

পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন

উদ্ধার হওয়া এক লাখ ইয়াবা গায়েব, বহনকারীকে ছেড়ে দেওয়া হয় ওসির নির্দেশে

আপডেট সময় : ০১:১৯:১৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬

কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রাম নগরে আসার পথে পুলিশের এক সদস্যের কাছ থেকে এক লাখ পিস ইয়াবা বড়ি উদ্ধার করে বাকলিয়া থানা-পুলিশ। তবে এই ঘটনায় কোনো মামলা না করে উদ্ধার হওয়া বিপুল পরিমাণ ইয়াবা নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করে আত্মসাৎ করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) সরাসরি নির্দেশে ইয়াবাবহনকারীকে সসম্মানে ছেড়েও দেওয়া হয়। চট্টগ্রাম নগর পুলিশের (সিএমপি) নিজস্ব এক উচ্চপর্যায়ের তদন্ত প্রতিবেদনে খোদ পুলিশের এই লঙ্কাকাণ্ডের ভয়ংকর সত্যতা উঠে এসেছে।

জড়িত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে এই তদন্ত প্রতিবেদন গত ২৯ এপ্রিল পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো হলেও এখন পর্যন্ত মূল অভিযুক্ত ওসির বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এমনকি ঘটনার প্রায় ছয় মাস পার হতে চললেও এখনো কোনো নিয়মিত মামলা হয়নি, উদ্ধার হয়নি আত্মসাৎ হওয়া ইয়াবাও।

যেভাবে ওসির নির্দেশে ইয়াবা গায়েব হলো:

ছয় পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, কক্সবাজার জেলা আদালতের এক বিচারকের গানম্যান কনস্টেবল ইমতিয়াজ হোসেন এক লাখ ইয়াবাভর্তি একটি লাগেজ নিয়ে ঢাকাগামী একটি বাসে চড়ে আসছিলেন। বাসটি কর্ণফুলী নদীর শাহ আমানত সেতু পার হওয়ার পর বাকলিয়া থানার পুলিশ সদস্যরা বাস থেকে ইমতিয়াজকে নামিয়ে পুলিশ বক্সে নিয়ে যান।

তদন্তে ইমতিয়াজ স্বীকার করেন, পুলিশ বক্সের ভেতর লাগেজের মুখ খুলে প্রতি প্যাকেটে ১০ হাজার করে মোট ১ লাখ ইয়াবা দেখতে পান দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তা ও সোর্সেরা। তখন ইমতিয়াজ ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করলে বাকলিয়া থানার তৎকালীন ওসি আফতাব উদ্দিনের নির্দেশ আসে। ওসির সরাসরি নির্দেশে পুলিশ সদস্যরা সব ইয়াবা নিজেদের দখলে নিয়ে নেন এবং খালি লাগেজসহ ইমতিয়াজকে ছেড়ে দেন। মুক্তি পেয়ে ইমতিয়াজ কুমিল্লায় নিজের গ্রামের বাড়িতে চলে যান।

তদন্তে দোষী সাব্যস্ত, অথচ বহাল তবিয়তে ওসি:

এই কলঙ্কজনক ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. ওয়াহিদুল হক চৌধুরীকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্তে ঘটনার প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পর ৯ জন পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। বরখাস্ত হওয়াদের মধ্যে রয়েছেন— পরিদর্শক (তদন্ত) তানভীর আহমেদ, এসআই মো. আল-আমিন সরকার, এসআই মো. আমির হোসেন, এএসআই সাইফুল আলম, এএসআই জিয়াউর রহমান, এএসআই সাদ্দাম হোসেন, এএসআই এনামুল হক, কনস্টেবল রাশেদুল হাসান, কনস্টেবল উম্মে হাবিবা স্বপ্না এবং ইয়াবাবহনকারী কনস্টেবল ইমতিয়াজ হোসেন।

তবে রহস্যজনকভাবে, ঘটনার মূল নির্দেশদাতা বাকলিয়া থানার তৎকালীন ওসি আফতাব উদ্দিনের বিরুদ্ধে এখনো কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্টো তিনি বর্তমানে চট্টগ্রামের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কোতোয়ালি থানার ওসির দায়িত্বে বহাল তবিয়তে আছেন। অবশ্য নিজের দোষ অস্বীকার করে আফতাব উদ্দিন দাবি করেছেন, “আমি ইয়াবার বিষয়ে কিছু জানি না, ঘটনার সময় আমি বাসায় ছিলাম।”

আইনজীবীদের ক্ষোভ ও নতুন কমিশনারের আশ্বাস:

চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি আবদুস সাত্তার এই বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, মাদক উদ্ধারের অপরাধটি সম্পূর্ণ আমলযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও ওসির নির্দেশে আসামিকে ছেড়ে দেওয়া বড় ধরনের ফৌজদারি অপরাধ। এখানে আলামত উদ্ধার হওয়া সত্ত্বেও কেন মামলা বা জব্দ তালিকা করা হলো না এবং এর বিনিময়ে পুলিশ কোনো বেআইনি আর্থিক সুবিধা নিয়েছে কিনা, তা গভীরভাবে তদন্ত করা উচিত।

এই বিষয়ে চট্টগ্রাম নগর পুলিশের সদ্য যোগদান করা কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী সাফ জানিয়েছেন, “ইয়াবা গায়েবের মতো ঘটনা ঘটার পরও এতদিন কেন নিয়মিত মামলা করা হয়নি, তা গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মাদকের বিরুদ্ধে আমার অবস্থান পরিষ্কার— জিরো টলারেন্স।”