ঢাকা ০৩:৩৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঢালাও অভিযোগে ক্ষুব্ধ পুলিশ সুপার: “আপনার বহু আগে আমি ছাত্রদল করে আসছি!”

দৈনিক জাগ্রত বাংলাদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ১২:০০:৪৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬
  • / 111

সরকারি আমলা আর রাজনৈতিক নেতাদের প্রকাশ্য সংঘাত নতুন কিছু নয়, কিন্তু যখন জুলাই আন্দোলনের শহীদ স্মরণের মঞ্চে একজন পুলিশ সুপার ও একজন ছাত্রদল নেতার রাজনৈতিক অতীত এবং বর্তমানের প্রশাসনিক ভূমিকা নিয়ে সরাসরি বাক্যবাণ বিনিময় হয়, তখন তা চাবুকের মতো গিয়ে আঘাত করে রাষ্ট্রের শাসনযন্ত্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। কুমিল্লা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আয়োজিত ‘জুলাই শহীদ দিবস’-এর আলোচনা সভায় ঠিক এই নাটকীয় ও নজিরবিহীন দৃশ্যপটের অবতারণা হলো। ঢালাও অভিযোগের জবাবে ক্ষুব্ধ কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান সরাসরি ছাত্রদল নেতাকে উদ্দেশ করে বললেন, “যাকে আপনার পছন্দ হয় না, তাকেই ফ্যাসিস্ট বানিয়ে দেন! এটা কোনো রাজনৈতিক মঞ্চ না, আপনার বহু আগে আমি ঢাকায় ছাত্রদল করে আসছি।”

ইতিমধ্যেই জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সেই তপ্ত বাগ্‌বিতণ্ডার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিদ্যুৎ গতিতে ছড়িয়ে পড়েছে, যা নিয়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে তোলপাড় শুরু হয়েছে।

মঞ্চ যখন রণক্ষেত্র: অভিযোগ ও কড়া পাল্টা জবাব

ঘটনার সূত্রপাত গত বৃহস্পতিবার, যেখানে সভাপতিত্ব করছিলেন জেলা প্রশাসক রোজী আকতার। মঞ্চে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মহানগর ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ফখরুল ইসলাম মিঠু সরাসরি পুলিশ সুপারকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে অভিযোগ তোলেন, “আপনি কুমিল্লা আসার পরে ফ্যাসিস্টরা কুমিল্লায় চলে এসেছে। আপনি তাদের গ্রেপ্তার করছেন না, আমরা তথ্য দিলেও পুলিশ গ্রেপ্তার করছে না।”

এই ঢালাও রাজনৈতিক আক্রমণকে পিচ গলে বাউন্ডারির বাইরে পাঠাতে একটুও সময় নেননি পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান। তিনি কড়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, রাজনৈতিক মঞ্চের মতো হাততালি কুড়ানোর বক্তব্য না দিয়ে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে কথা বলা উচিত। আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়, তবে মামলা বা গ্রেপ্তারের প্রক্রিয়া আইন অনুযায়ীই নির্ধারিত হবে, কারও খেয়ালখুশিতে নয়।

“ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল আমি নিজেও করেছি”

নিজের ছাত্রজীবনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কার্ডটি খেলে ছাত্রদল নেতাকে রীতিমতো স্তব্ধ করে দেন পুলিশ সুপার। তিনি সাফ জানান, “ছাত্রদল আমি নিজেও করেছি। আপনার বহু আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল করে এসেছি।”

এরপরই তিনি ৫ আগস্ট-পরবর্তী পুলিশ বাহিনীর ভেঙে পড়া কাঠামো এবং বর্তমান বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরেন। তিনি আক্ষেপের সুরে বলেন, দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে গত ১৭ বছরে তিলে তিলে দুর্বল করে দেওয়া হয়েছে। সেই নড়বড়ে অবস্থা থেকে পুলিশ আবার ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকে পুনর্গঠনের জন্য সময় দেওয়া উচিত উল্লেখ করে তিনি বলেন, “একটি সরকারের বয়স মাত্র চার মাস, তাদের কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় সময় দেওয়া উচিত। একটি শিশুরও খাওয়া শিখতে ৯-১০ মাস সময় লাগে।” বিচারহীনতার অভিযোগ খণ্ডন করে তিনি অতীতে আলোচিত মামলাগুলোতে নিজের নেওয়া কঠোর ব্যবস্থার কথাও স্মরণ করিয়ে দেন।

পর্দার আড়ালের আসল কারণ: জিসানের বাবার কান্না

এই প্রকাশ্য সংঘাতের পর গতকাল শুক্রবার রাতে ছাত্রদল নেতা ফখরুল ইসলাম মিঠু তাঁর সাফাইতে জানান, জুলাই আন্দোলনে ঢাকার লাকসামের শহীদ জিসানের বাবা বাবুল সর্দার এলাকায় আওয়ামী লীগের লোকজনের প্রাণনাশের হুমকি পেয়ে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে এসে কাঁদছিলেন। একজন জুলাই যোদ্ধা হিসেবে সেই শহীদের বাবার কান্না দেখে তিনি চুপ থাকতে পারেননি বলেই পুলিশের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছেন।

অন্যদিকে পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান পাল্টা যুক্তি দিয়ে জানিয়েছেন, ওই ছাত্রদল নেতা যে হুমকির অভিযোগ তুলছেন, তা ঘটেছে ঢাকায়। তথ্য-উপাত্ত ছাড়া কুমিল্লার পুলিশের ওপর সেই দায় চাপিয়ে ঢালাও অভিযোগ করা মোটেই সমীচীন নয়।

ঢালাও অভিযোগে ক্ষুব্ধ পুলিশ সুপার: “আপনার বহু আগে আমি ছাত্রদল করে আসছি!”

আপডেট সময় : ১২:০০:৪৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬

সরকারি আমলা আর রাজনৈতিক নেতাদের প্রকাশ্য সংঘাত নতুন কিছু নয়, কিন্তু যখন জুলাই আন্দোলনের শহীদ স্মরণের মঞ্চে একজন পুলিশ সুপার ও একজন ছাত্রদল নেতার রাজনৈতিক অতীত এবং বর্তমানের প্রশাসনিক ভূমিকা নিয়ে সরাসরি বাক্যবাণ বিনিময় হয়, তখন তা চাবুকের মতো গিয়ে আঘাত করে রাষ্ট্রের শাসনযন্ত্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। কুমিল্লা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আয়োজিত ‘জুলাই শহীদ দিবস’-এর আলোচনা সভায় ঠিক এই নাটকীয় ও নজিরবিহীন দৃশ্যপটের অবতারণা হলো। ঢালাও অভিযোগের জবাবে ক্ষুব্ধ কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান সরাসরি ছাত্রদল নেতাকে উদ্দেশ করে বললেন, “যাকে আপনার পছন্দ হয় না, তাকেই ফ্যাসিস্ট বানিয়ে দেন! এটা কোনো রাজনৈতিক মঞ্চ না, আপনার বহু আগে আমি ঢাকায় ছাত্রদল করে আসছি।”

ইতিমধ্যেই জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সেই তপ্ত বাগ্‌বিতণ্ডার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিদ্যুৎ গতিতে ছড়িয়ে পড়েছে, যা নিয়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে তোলপাড় শুরু হয়েছে।

মঞ্চ যখন রণক্ষেত্র: অভিযোগ ও কড়া পাল্টা জবাব

ঘটনার সূত্রপাত গত বৃহস্পতিবার, যেখানে সভাপতিত্ব করছিলেন জেলা প্রশাসক রোজী আকতার। মঞ্চে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মহানগর ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ফখরুল ইসলাম মিঠু সরাসরি পুলিশ সুপারকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে অভিযোগ তোলেন, “আপনি কুমিল্লা আসার পরে ফ্যাসিস্টরা কুমিল্লায় চলে এসেছে। আপনি তাদের গ্রেপ্তার করছেন না, আমরা তথ্য দিলেও পুলিশ গ্রেপ্তার করছে না।”

এই ঢালাও রাজনৈতিক আক্রমণকে পিচ গলে বাউন্ডারির বাইরে পাঠাতে একটুও সময় নেননি পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান। তিনি কড়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, রাজনৈতিক মঞ্চের মতো হাততালি কুড়ানোর বক্তব্য না দিয়ে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে কথা বলা উচিত। আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়, তবে মামলা বা গ্রেপ্তারের প্রক্রিয়া আইন অনুযায়ীই নির্ধারিত হবে, কারও খেয়ালখুশিতে নয়।

“ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল আমি নিজেও করেছি”

নিজের ছাত্রজীবনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কার্ডটি খেলে ছাত্রদল নেতাকে রীতিমতো স্তব্ধ করে দেন পুলিশ সুপার। তিনি সাফ জানান, “ছাত্রদল আমি নিজেও করেছি। আপনার বহু আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল করে এসেছি।”

এরপরই তিনি ৫ আগস্ট-পরবর্তী পুলিশ বাহিনীর ভেঙে পড়া কাঠামো এবং বর্তমান বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরেন। তিনি আক্ষেপের সুরে বলেন, দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে গত ১৭ বছরে তিলে তিলে দুর্বল করে দেওয়া হয়েছে। সেই নড়বড়ে অবস্থা থেকে পুলিশ আবার ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকে পুনর্গঠনের জন্য সময় দেওয়া উচিত উল্লেখ করে তিনি বলেন, “একটি সরকারের বয়স মাত্র চার মাস, তাদের কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় সময় দেওয়া উচিত। একটি শিশুরও খাওয়া শিখতে ৯-১০ মাস সময় লাগে।” বিচারহীনতার অভিযোগ খণ্ডন করে তিনি অতীতে আলোচিত মামলাগুলোতে নিজের নেওয়া কঠোর ব্যবস্থার কথাও স্মরণ করিয়ে দেন।

পর্দার আড়ালের আসল কারণ: জিসানের বাবার কান্না

এই প্রকাশ্য সংঘাতের পর গতকাল শুক্রবার রাতে ছাত্রদল নেতা ফখরুল ইসলাম মিঠু তাঁর সাফাইতে জানান, জুলাই আন্দোলনে ঢাকার লাকসামের শহীদ জিসানের বাবা বাবুল সর্দার এলাকায় আওয়ামী লীগের লোকজনের প্রাণনাশের হুমকি পেয়ে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে এসে কাঁদছিলেন। একজন জুলাই যোদ্ধা হিসেবে সেই শহীদের বাবার কান্না দেখে তিনি চুপ থাকতে পারেননি বলেই পুলিশের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছেন।

অন্যদিকে পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান পাল্টা যুক্তি দিয়ে জানিয়েছেন, ওই ছাত্রদল নেতা যে হুমকির অভিযোগ তুলছেন, তা ঘটেছে ঢাকায়। তথ্য-উপাত্ত ছাড়া কুমিল্লার পুলিশের ওপর সেই দায় চাপিয়ে ঢালাও অভিযোগ করা মোটেই সমীচীন নয়।