ঢাকা ০৩:৩২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

একরামুল হত্যার জট খুলতেই বেরোচ্ছে র‍্যাব-৭-এর ১৪ ‘ক্রসফায়ার’-এর কঙ্কাল

দৈনিক জাগ্রত বাংলাদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ১১:১১:১৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬
  • / 85

“আম্মু, তুমি কাঁদিও না…”—২০১৮ সালের মে মাসের সেই অভিশপ্ত রাতে কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভের পাশে টেকনাফ পৌরসভার কাউন্সিলর একরামুল হকের মোবাইল ফোন থেকে ভেসে আসা সেই আকুতি আর বুলেটের শব্দ দেশের বিবেককে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। আটটি বছর কেটে গেছে। ক্ষমতা ও বন্দুকের নলের দাপটে যে ফাইল চেপে রাখা হয়েছিল, আজ সেই ফাইলে লেগেছে বিচারের অমোঘ চাবুক। কাউন্সিলর একরামুল হক হত্যা মামলায় অবশেষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগপত্র দাখিল হয়েছে।

একই সঙ্গে, ঘটনার সময়কার র‍্যাব-৭-এর কুখ্যাত অধিনায়ক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (তৎকালীন লেফটেন্যান্ট কর্নেল) মিফতাহ উদ্দিন আহমেদ সেনা হেফাজতে চলে যাওয়ায় চট্টগ্রামের এক অন্ধকার জমানার কপাট খুলতে শুরু করেছে। একরামুল হত্যার বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হতেই নতুন করে আলোচনার টেবিলে উঠে আসছে ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে মিফতাহ উদ্দিনের কমান্ডে হওয়া অন্তত ১৪টি হাড়হিম করা ‘ক্রসফায়ার’ ও ‘গুম’-এর রক্তাক্ত কঙ্কাল!

চট্টগ্রামের আতঙ্ক মিফতাহ: বন্দুকযুদ্ধের আড়ালে সাজানো নাটক?

বিগত জমানায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার আর ফেনীর বুকে র‍্যাব-৭-এর তৎকালীন অধিনায়ক মিফতাহ উদ্দিন আহমেদ ছিলেন এক ত্রাসের নাম। সরকারি খাতায় যা ‘মাদকবিরোধী অভিযান’ কিংবা ‘বন্দুকযুদ্ধ’, ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর কাছে তা ছিল স্রেফ ঠান্ডা মাথার রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ড। অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই মিফতাহের দায়িত্বকালে অন্তত ১৪ জন মানুষ তথাকথিত বন্দুকযুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন। প্রতিবারই বাহিনীর তৈরি স্ক্রিপ্ট ছিল একই—‘ডাকাত বা মাদক কারবারিদের সাথে গোলাগুলি’। কিন্তু পর্দার পেছনের সত্যটা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা।

২০১৬ সালের এপ্রিলে মীরসরাইয়ের জোরারগঞ্জে ইয়াকুব ও কামরুলকে হত্যা, ২০১৭ সালের জুলাইয়ে ফেনীর রুটি সোহেল কিংবা অক্টোবরে চট্টগ্রামের ‘বাইট্যা’ ফারুককে হত্যার নেপথ্যে বারবার উঠেছে আগে থেকে আটকে রেখে ‘হত্যালীলা সাজানোর’ অভিযোগ। ২০১৮ সালের মে মাসে মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান শুরু হলে মিফতাহের জল্লাদ-বাহিনী আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। নগরের বরিশাল কলোনিতে মাদক ব্যবসায়ী হাবিবুরকে ধরতে গিয়ে মোশাররফ নামে এক নিরীহ টেম্পোচালককে ভুল তথ্য দেওয়ার অভিযোগে নৃশংসভাবে খতম করা হয় বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। এরপর একে একে ফেনীর আনোয়ার হোসেন, কক্সবাজারের মজিবুর রহমানসহ অনেকেরই শেষ ঠিকানা হয় মর্গে।

এখনো ছেলের অপেক্ষায় মা: প্রত্যক্ষদর্শী জাহিদকে গুমের অভিযোগ

মিফতাহের এই ‘ডেথ স্কোয়াড’-এর সবচেয়ে নিষ্ঠুর শিকার সম্ভবত ১৭ বছর বয়সী কিশোর জাহিদ হাসান। ২০১৮ সালের ১২ অক্টোবর মুরাদপুরের এক অভিযানে সন্দেহভাজন মাদক কারবারি নিহত হওয়ার ঘটনায় ব্যবহৃত গাড়ির চালক ছিল এই জাহিদ। সে ছিল গোটা সাজানো নাটকের একমাত্র জলজ্যান্ত প্রত্যক্ষদর্শী। আর সেই ‘অপরাধেই’ অভিযানের দুদিন পর কর্ণফুলী থেকে তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।

আট বছর ধরে চোখের জল মুছতে মুছতে জাহিদের মা হোসনে আরা বেগম আর্তনাদ করে বলেন, “আমার ছেলে কোনো অপরাধ করেনি, সে শুধু চোখের সামনে র‍্যাবের ওই নাটকটা দেখে ফেলেছিল। তারপর থেকে আমার ছেলেকে আর ফেরত দেয়নি। আটটা বছর ধরে জানি না আমার সন্তান বেঁচে আছে না মারা গেছে!” জাহিদকে গুম করা হলেও আজ পর্যন্ত কোনো দায় স্বীকার করেনি সংশ্লিষ্ট বাহিনী।

একরামুলের স্ত্রী আয়েশা বেগম ট্রাইব্যুনালে অভিযোগপত্র দাখিলের পর আশার আলো দেখছেন। তিনি বলেন, “আটটি বছর ধরে শুধু এই দিনটার অপেক্ষায় ছিলাম। এখন সত্য উদ্‌ঘাটনের একটা সুযোগ তৈরি হয়েছে।” সুজন চট্টগ্রামের সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী বলেন, “একরামুল হত্যা মামলা শুধু একটি বিচার নয়, এটি একই সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চালানো অন্য কথিত ‘ক্রসফায়ার’গুলোরও নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্তের রাস্তা খুলে দিয়েছে।”

একরামুল হত্যার জট খুলতেই বেরোচ্ছে র‍্যাব-৭-এর ১৪ ‘ক্রসফায়ার’-এর কঙ্কাল

আপডেট সময় : ১১:১১:১৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬

“আম্মু, তুমি কাঁদিও না…”—২০১৮ সালের মে মাসের সেই অভিশপ্ত রাতে কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভের পাশে টেকনাফ পৌরসভার কাউন্সিলর একরামুল হকের মোবাইল ফোন থেকে ভেসে আসা সেই আকুতি আর বুলেটের শব্দ দেশের বিবেককে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। আটটি বছর কেটে গেছে। ক্ষমতা ও বন্দুকের নলের দাপটে যে ফাইল চেপে রাখা হয়েছিল, আজ সেই ফাইলে লেগেছে বিচারের অমোঘ চাবুক। কাউন্সিলর একরামুল হক হত্যা মামলায় অবশেষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগপত্র দাখিল হয়েছে।

একই সঙ্গে, ঘটনার সময়কার র‍্যাব-৭-এর কুখ্যাত অধিনায়ক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (তৎকালীন লেফটেন্যান্ট কর্নেল) মিফতাহ উদ্দিন আহমেদ সেনা হেফাজতে চলে যাওয়ায় চট্টগ্রামের এক অন্ধকার জমানার কপাট খুলতে শুরু করেছে। একরামুল হত্যার বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হতেই নতুন করে আলোচনার টেবিলে উঠে আসছে ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে মিফতাহ উদ্দিনের কমান্ডে হওয়া অন্তত ১৪টি হাড়হিম করা ‘ক্রসফায়ার’ ও ‘গুম’-এর রক্তাক্ত কঙ্কাল!

চট্টগ্রামের আতঙ্ক মিফতাহ: বন্দুকযুদ্ধের আড়ালে সাজানো নাটক?

বিগত জমানায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার আর ফেনীর বুকে র‍্যাব-৭-এর তৎকালীন অধিনায়ক মিফতাহ উদ্দিন আহমেদ ছিলেন এক ত্রাসের নাম। সরকারি খাতায় যা ‘মাদকবিরোধী অভিযান’ কিংবা ‘বন্দুকযুদ্ধ’, ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর কাছে তা ছিল স্রেফ ঠান্ডা মাথার রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ড। অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই মিফতাহের দায়িত্বকালে অন্তত ১৪ জন মানুষ তথাকথিত বন্দুকযুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন। প্রতিবারই বাহিনীর তৈরি স্ক্রিপ্ট ছিল একই—‘ডাকাত বা মাদক কারবারিদের সাথে গোলাগুলি’। কিন্তু পর্দার পেছনের সত্যটা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা।

২০১৬ সালের এপ্রিলে মীরসরাইয়ের জোরারগঞ্জে ইয়াকুব ও কামরুলকে হত্যা, ২০১৭ সালের জুলাইয়ে ফেনীর রুটি সোহেল কিংবা অক্টোবরে চট্টগ্রামের ‘বাইট্যা’ ফারুককে হত্যার নেপথ্যে বারবার উঠেছে আগে থেকে আটকে রেখে ‘হত্যালীলা সাজানোর’ অভিযোগ। ২০১৮ সালের মে মাসে মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান শুরু হলে মিফতাহের জল্লাদ-বাহিনী আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। নগরের বরিশাল কলোনিতে মাদক ব্যবসায়ী হাবিবুরকে ধরতে গিয়ে মোশাররফ নামে এক নিরীহ টেম্পোচালককে ভুল তথ্য দেওয়ার অভিযোগে নৃশংসভাবে খতম করা হয় বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। এরপর একে একে ফেনীর আনোয়ার হোসেন, কক্সবাজারের মজিবুর রহমানসহ অনেকেরই শেষ ঠিকানা হয় মর্গে।

এখনো ছেলের অপেক্ষায় মা: প্রত্যক্ষদর্শী জাহিদকে গুমের অভিযোগ

মিফতাহের এই ‘ডেথ স্কোয়াড’-এর সবচেয়ে নিষ্ঠুর শিকার সম্ভবত ১৭ বছর বয়সী কিশোর জাহিদ হাসান। ২০১৮ সালের ১২ অক্টোবর মুরাদপুরের এক অভিযানে সন্দেহভাজন মাদক কারবারি নিহত হওয়ার ঘটনায় ব্যবহৃত গাড়ির চালক ছিল এই জাহিদ। সে ছিল গোটা সাজানো নাটকের একমাত্র জলজ্যান্ত প্রত্যক্ষদর্শী। আর সেই ‘অপরাধেই’ অভিযানের দুদিন পর কর্ণফুলী থেকে তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।

আট বছর ধরে চোখের জল মুছতে মুছতে জাহিদের মা হোসনে আরা বেগম আর্তনাদ করে বলেন, “আমার ছেলে কোনো অপরাধ করেনি, সে শুধু চোখের সামনে র‍্যাবের ওই নাটকটা দেখে ফেলেছিল। তারপর থেকে আমার ছেলেকে আর ফেরত দেয়নি। আটটা বছর ধরে জানি না আমার সন্তান বেঁচে আছে না মারা গেছে!” জাহিদকে গুম করা হলেও আজ পর্যন্ত কোনো দায় স্বীকার করেনি সংশ্লিষ্ট বাহিনী।

একরামুলের স্ত্রী আয়েশা বেগম ট্রাইব্যুনালে অভিযোগপত্র দাখিলের পর আশার আলো দেখছেন। তিনি বলেন, “আটটি বছর ধরে শুধু এই দিনটার অপেক্ষায় ছিলাম। এখন সত্য উদ্‌ঘাটনের একটা সুযোগ তৈরি হয়েছে।” সুজন চট্টগ্রামের সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী বলেন, “একরামুল হত্যা মামলা শুধু একটি বিচার নয়, এটি একই সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চালানো অন্য কথিত ‘ক্রসফায়ার’গুলোরও নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্তের রাস্তা খুলে দিয়েছে।”