ঢাকা ০২:৪২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ফরিদপুরে স্কুলছাত্রীর ঘরে আগে থেকেই ছিল যুবক

দৈনিক জাগ্রত বাংলাদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ১২:৩৮:১১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২ অগাস্ট ২০২৬
  • / 614

অন্ধকার রাত, একটা বন্ধ ঘর, আর তার বাইরে ওত পেতে থাকা একদল উন্মত্ত যুবক। ফরিদপুর জেলার সদরপুর উপজেলায় অষ্টম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রীকে (১৫) অপহরণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগে দায়ের করা মামলাকে কেন্দ্র করে এখন রাজ্যজুড়ে তোলপাড়। বিভিন্ন গণমাধ্যমে ‘জানালা ভেঙে তুলে নিয়ে ধর্ষণ’-এর খবর চাউর হতেই নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। কিন্তু জটলা এখানেই শেষ নয়। একদিকে যখন ভুক্তভোগী কিশোরী হাসপাতালের শয্যায় চিকিৎসাধীন, ঠিক তখনই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আছড়ে পড়েছে ঘটনার রাতের কিছু বিস্ফোরক ভিডিও ফুটেজ! আর সেই ভিডিওর ফ্রেম ধরে টান দিতেই চেনা ছকের ভেতরে বেরিয়ে আসছে এক অন্যরকম রুদ্ধশ্বাস আখ্যান।

গত শনিবার (১ আগস্ট) বিকেল পর্যন্ত এই মামলায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ঘটনার নেপথ্যের গোলকধাঁধা ও আসল সত্যের অনুসন্ধান নিচে তুলে ধরা হলো:

অভিযোগের তির: গভীর রাতে ১০-১৫ জনের হানা ও পুকুরপাড়ের বিভীষিকা

ভুক্তভোগী কিশোরীর পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় দায়ের করা অভিযোগে এক ভয়ঙ্কর বিবরণ দেওয়া হয়েছে। দাবি করা হয়েছে, গত বৃহস্পতিবার রাতে কিশোরীর দাদির চোখের চিকিৎসার জন্য বাড়ির বড়রা সবাই ফরিদপুরের একটি হাসপাতালে ছিলেন। বাড়িতে তখন কেবল ওই কিশোরী, তার বোন ও ছোট ভাই।

রাত ১টার দিকে ১০ থেকে ১৫ জনের একদল যুবক আচমকা বাড়িতে চড়াও হয় এবং দরজা খুলতে চাপ দেয়। ভেতর থেকে সাড়া না মেলায় তারা জানালার গ্রিল বা অংশ ভেঙে ঘরের ভেতরে ঢোকে এবং কিশোরীকে জোরপূর্বক টেনে-হিঁচড়ে বাইরে নিয়ে যায়। এরপর দূরের এক নির্জন পুকুরপাড়ে নিয়ে তিন যুবক পালাক্রমে তাকে ধর্ষণ করে রাত ৩টার দিকে মোটরসাইকেলে করে বাড়ির উঠানে ফেলে রেখে যায়।

ক্যামেরার ওপিঠ: সোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল ফুটেজে চাঞ্চল্যকর মোড়!

কিন্তু গল্পে নাটকীয় মোড় আসে যখন ঘটনার সময়কার কিছু লাইভ ভিডিও ফুটেজ নেটদুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। সেই ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে—বাইরে যখন একদল যুবক চিল্লাচিল্লি করছে এবং জানালার দিক থেকে অনবরত ঢিল ছুঁড়ছে, তখন ঘরের ভেতরে ভুক্তভোগী মেয়ে ও তার ভাইবোনের সাথে ‘রহিত শিকদার’ নামে এক যুবক (যাকে পরে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে) অলরেডি অবস্থান করছে!

ভিডিওতে দেখা যায়, ঘরের ভেতর থেকে রহিত মেয়েদের বলছে, “দরজা খুলে দেন, খুলে দেন।” কিন্তু মেয়েরা ভয় পেয়ে মোবাইলে কাউকে ফোন করার চেষ্টা করছে। একপর্যায়ে দরজা খোলা হলে বাইরে অপেক্ষমাণ যুবকেরা রহিত ও ভুক্তভোগী মেয়েটিকে টেনে-হিঁচড়ে বাইরে নিয়ে যায়। তখন রহিত নিজেকে মেয়েটির ‘ফুফাতো ভাই’ বলে দাবি করলেও উন্মত্ত জনতা তা কানে তোলেনি। মারধরের একপর্যায়ে মেয়েটি অচেতন হয়ে পড়লে কেউ একজন তাকে চোখ খুলতে শাসিয়ে মুখে চড় মারে।

স্থানীয়দের দাবি, গভীর রাতে ওই মেয়ের ঘরে বহিরাগত যুবক রহিত অবস্থান করছে—এমন খবর পেয়েই গ্রামের একদল যুবক সেখানে চড়াও হয় এবং দুজনকে হাতেনাতে ধরে ‘নীতি পুলিশিং’ বা গণপিটুনি চালায়। তবে এত লোকের ভিড়ে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের মতো কোনো ঘটনা আসলেই ঘটেছে কি না, তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র সংশয় তৈরি হয়েছে।

‘আমি কি আউলফাউল মামলায় ফাঁসব?’: কাঁদছেন ধৃত আসামি

ঘটনার পর পুলিশ দ্রুত অ্যাকশনে নেমে এ পর্যন্ত তিনজনকে খাঁচায় পুরেছে। সদরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুল আল মামুন শাহ জানান, ঘটনার রাতেই জনতা রহিত শিকদার ও হেলাল মৃধাকে একটি মোটরসাইকেলসহ পুলিশে সোপর্দ করে। শুক্রবার মেয়ের মা বাদী হয়ে মামলা করার পর রনি বেপারী নামে আরও একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

তবে ধৃত রনি বেপারীর কান্নাজড়িত আর্তনাদ এই তদন্তে এক বড় প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে। রনি বলেন, “আমি ঘটনার সময় ছিলামই না। সকালে উঠে শুনলাম এমন ঘটনা ঘটছে, নির্দোষ সাহসে দেখতে গেছিলাম। অমনি পুলিশ আমারে অ্যারেস্ট করল! এইটা কি আউলফাউল গাজা-ইয়াবার মামলা? ধর্ষণের মামলা! আমি যদি ফাইস্যা যাই তয় আমার কী হবে?”

+———————————————————————————+
| সদরপুর স্কুলছাত্রী মামলার বর্তমান স্ট্যাটাস |
+———————————————————————————+
| ভুক্তভোগী : ৮ম শ্রেণির স্কুলছাত্রী (১৫), ফরিদপুর মেডিকেলে চিকিৎসাধীন |
| ধৃত আসামি : রহিত শিকদার, হেলাল মৃধা ও রনি বেপারী |
| রাজনৈতিক তৎপরতা : ভুক্তভোগীর বাড়ি পরিদর্শন করেছেন সাংসদ শহিদুল ইসলাম বাবুল |
+———————————————————————————+

সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ফরিদপুরে স্কুলছাত্রীর ঘরে আগে থেকেই ছিল যুবক

আপডেট সময় : ১২:৩৮:১১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২ অগাস্ট ২০২৬

অন্ধকার রাত, একটা বন্ধ ঘর, আর তার বাইরে ওত পেতে থাকা একদল উন্মত্ত যুবক। ফরিদপুর জেলার সদরপুর উপজেলায় অষ্টম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রীকে (১৫) অপহরণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগে দায়ের করা মামলাকে কেন্দ্র করে এখন রাজ্যজুড়ে তোলপাড়। বিভিন্ন গণমাধ্যমে ‘জানালা ভেঙে তুলে নিয়ে ধর্ষণ’-এর খবর চাউর হতেই নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। কিন্তু জটলা এখানেই শেষ নয়। একদিকে যখন ভুক্তভোগী কিশোরী হাসপাতালের শয্যায় চিকিৎসাধীন, ঠিক তখনই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আছড়ে পড়েছে ঘটনার রাতের কিছু বিস্ফোরক ভিডিও ফুটেজ! আর সেই ভিডিওর ফ্রেম ধরে টান দিতেই চেনা ছকের ভেতরে বেরিয়ে আসছে এক অন্যরকম রুদ্ধশ্বাস আখ্যান।

গত শনিবার (১ আগস্ট) বিকেল পর্যন্ত এই মামলায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ঘটনার নেপথ্যের গোলকধাঁধা ও আসল সত্যের অনুসন্ধান নিচে তুলে ধরা হলো:

অভিযোগের তির: গভীর রাতে ১০-১৫ জনের হানা ও পুকুরপাড়ের বিভীষিকা

ভুক্তভোগী কিশোরীর পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় দায়ের করা অভিযোগে এক ভয়ঙ্কর বিবরণ দেওয়া হয়েছে। দাবি করা হয়েছে, গত বৃহস্পতিবার রাতে কিশোরীর দাদির চোখের চিকিৎসার জন্য বাড়ির বড়রা সবাই ফরিদপুরের একটি হাসপাতালে ছিলেন। বাড়িতে তখন কেবল ওই কিশোরী, তার বোন ও ছোট ভাই।

রাত ১টার দিকে ১০ থেকে ১৫ জনের একদল যুবক আচমকা বাড়িতে চড়াও হয় এবং দরজা খুলতে চাপ দেয়। ভেতর থেকে সাড়া না মেলায় তারা জানালার গ্রিল বা অংশ ভেঙে ঘরের ভেতরে ঢোকে এবং কিশোরীকে জোরপূর্বক টেনে-হিঁচড়ে বাইরে নিয়ে যায়। এরপর দূরের এক নির্জন পুকুরপাড়ে নিয়ে তিন যুবক পালাক্রমে তাকে ধর্ষণ করে রাত ৩টার দিকে মোটরসাইকেলে করে বাড়ির উঠানে ফেলে রেখে যায়।

ক্যামেরার ওপিঠ: সোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল ফুটেজে চাঞ্চল্যকর মোড়!

কিন্তু গল্পে নাটকীয় মোড় আসে যখন ঘটনার সময়কার কিছু লাইভ ভিডিও ফুটেজ নেটদুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। সেই ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে—বাইরে যখন একদল যুবক চিল্লাচিল্লি করছে এবং জানালার দিক থেকে অনবরত ঢিল ছুঁড়ছে, তখন ঘরের ভেতরে ভুক্তভোগী মেয়ে ও তার ভাইবোনের সাথে ‘রহিত শিকদার’ নামে এক যুবক (যাকে পরে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে) অলরেডি অবস্থান করছে!

ভিডিওতে দেখা যায়, ঘরের ভেতর থেকে রহিত মেয়েদের বলছে, “দরজা খুলে দেন, খুলে দেন।” কিন্তু মেয়েরা ভয় পেয়ে মোবাইলে কাউকে ফোন করার চেষ্টা করছে। একপর্যায়ে দরজা খোলা হলে বাইরে অপেক্ষমাণ যুবকেরা রহিত ও ভুক্তভোগী মেয়েটিকে টেনে-হিঁচড়ে বাইরে নিয়ে যায়। তখন রহিত নিজেকে মেয়েটির ‘ফুফাতো ভাই’ বলে দাবি করলেও উন্মত্ত জনতা তা কানে তোলেনি। মারধরের একপর্যায়ে মেয়েটি অচেতন হয়ে পড়লে কেউ একজন তাকে চোখ খুলতে শাসিয়ে মুখে চড় মারে।

স্থানীয়দের দাবি, গভীর রাতে ওই মেয়ের ঘরে বহিরাগত যুবক রহিত অবস্থান করছে—এমন খবর পেয়েই গ্রামের একদল যুবক সেখানে চড়াও হয় এবং দুজনকে হাতেনাতে ধরে ‘নীতি পুলিশিং’ বা গণপিটুনি চালায়। তবে এত লোকের ভিড়ে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের মতো কোনো ঘটনা আসলেই ঘটেছে কি না, তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র সংশয় তৈরি হয়েছে।

‘আমি কি আউলফাউল মামলায় ফাঁসব?’: কাঁদছেন ধৃত আসামি

ঘটনার পর পুলিশ দ্রুত অ্যাকশনে নেমে এ পর্যন্ত তিনজনকে খাঁচায় পুরেছে। সদরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুল আল মামুন শাহ জানান, ঘটনার রাতেই জনতা রহিত শিকদার ও হেলাল মৃধাকে একটি মোটরসাইকেলসহ পুলিশে সোপর্দ করে। শুক্রবার মেয়ের মা বাদী হয়ে মামলা করার পর রনি বেপারী নামে আরও একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

তবে ধৃত রনি বেপারীর কান্নাজড়িত আর্তনাদ এই তদন্তে এক বড় প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে। রনি বলেন, “আমি ঘটনার সময় ছিলামই না। সকালে উঠে শুনলাম এমন ঘটনা ঘটছে, নির্দোষ সাহসে দেখতে গেছিলাম। অমনি পুলিশ আমারে অ্যারেস্ট করল! এইটা কি আউলফাউল গাজা-ইয়াবার মামলা? ধর্ষণের মামলা! আমি যদি ফাইস্যা যাই তয় আমার কী হবে?”

+———————————————————————————+
| সদরপুর স্কুলছাত্রী মামলার বর্তমান স্ট্যাটাস |
+———————————————————————————+
| ভুক্তভোগী : ৮ম শ্রেণির স্কুলছাত্রী (১৫), ফরিদপুর মেডিকেলে চিকিৎসাধীন |
| ধৃত আসামি : রহিত শিকদার, হেলাল মৃধা ও রনি বেপারী |
| রাজনৈতিক তৎপরতা : ভুক্তভোগীর বাড়ি পরিদর্শন করেছেন সাংসদ শহিদুল ইসলাম বাবুল |
+———————————————————————————+