‘২৪ বছর উধাও, তবুও মিলছে বেতন!’ মাদ্রাসার দুই ভূতুড়ে শিক্ষক
- আপডেট সময় : ১১:৫১:৪৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 103
মাদরাসার শ্রেণিকক্ষে কোনোদিন পা রাখেননি তাঁরা। সহকর্মী শিক্ষক, শিক্ষার্থী কিংবা কর্মচারী—কেউ কোনোদিন চোখেও দেখেননি তাঁদের চেহারা। এমনকি যে নিয়োগ বোর্ডের মাধ্যমে চাকরি পাওয়ার কথা, সেই বোর্ডের সদস্যদেরও চেনেন না এই দুই ‘গুণধর’। অথচ কাগজে-কলমে তাঁরা কেবল ওই প্রতিষ্ঠানের প্রভাষ কথাই নন, বছরের পর বছর ধরে বাগিয়ে নিয়েছেন সরকারি কোষাগারের টাকা!
ভোলার লালমোহন ইসলামিয়া কামিল মাদরাসায় এমনই এক অবিশ্বাস্য ও চোখ কপালে ওঠার মতো জালিয়াতির ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। প্রায় দুই যুগ ধরে কোনো ধরনের শিক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত না থেকেও জাল-জালিয়াতি ও ঘুসবাণিজ্যের জোরে এমপিওভুক্ত হয়েছেন দুই শিক্ষক—সেলিম রেজা ও নূর মোহাম্মদ।
অভিযোগের তির মাদরাসার বর্তমান অধ্যক্ষ মোশারফ হোসেনের দিকে। তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী সংসদ সদস্য নুরুন্নবী চৌধুরী শাওনের আশীর্বাদপুষ্ট ও গণজাগরণ মঞ্চের প্রভাবশালী নেতা হওয়ার সুবাদে একচ্ছত্র দাপট চালিয়ে এই জালিয়াতি সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন তিনি।
জালিয়াতির চিত্র ও তদন্ত রিপোর্ট
প্রাপ্ত নথি ও স্থানীয় অনুসন্ধানে জানা যায়, গভর্নিং বডির তৎকালীন সভাপতি (ইউএনও) এবং সাবেক অধ্যক্ষের স্বাক্ষর জাল করে হাদিস বিভাগে ২০০৩ সালে সেলিম রেজা এবং ২০০৭ সালে নূর মোহাম্মদকে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ দেখানো হয়। দীর্ঘদিন অলক্ষ্যে থাকার পর ২০২৪ সালে এসে রহস্যজনকভাবে তাঁদের এমপিওভুক্তির আবেদন করা হয় এবং পাসও করিয়ে নেওয়া হয়। তাঁদের ইনডেক্স নম্বর যথাক্রমে গ০০৬২৬৫২ ও গ০০৬২৬৫১।
তবে এই ভয়াবহ দুর্নীতির খবর জানাজানি হতেই প্রতিবাদে ফেটে পড়েন শিক্ষক, কর্মচারী ও অভিভাবকেরা। মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড ও জেলা প্রশাসন বরাবর ২৯ জন শিক্ষক-কর্মচারী লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। জেলা প্রশাসকের নির্দেশে লালমোহন সরকারি কলেজের প্রভাষক মো. মুসা সরেজমিনে তদন্ত করে অভিযোগের শতভাগ সত্যতা পান।
তদন্ত কর্মকর্তা স্পষ্ট জানান—
“যে দুই শিক্ষকের নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক, তাঁরা নিয়োগের কোনো মূল কাগজপত্র দেখাতে পারেননি। দীর্ঘ ২৪ বছরে প্রতিষ্ঠানে তাঁদের কোনো উপস্থিতি ছিল না। অভিযোগকারীরা যে দাবি করেছেন, তা তদন্তে শতভাগ প্রমাণিত হয়েছে।”
এমনকি ১৯৯৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত মাদরাসার দায়িত্বে থাকা সাবেক অধ্যক্ষ রফিকুল ইসলাম লিখিতভাবে জানিয়েছেন, ওই দুই ব্যক্তির নিয়োগ সম্পূর্ণ ভুয়া ও কাল্পনিক।
লাখ লাখ টাকার ঘুস ও অধ্যক্ষের ভূমিকা
এই প্রতারণার শিকার হওয়া কথিত শিক্ষক সেলিম রেজা খোদ মুখ খুলেছেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, বড় অঙ্কের টাকা ঘুষ নিয়ে অধ্যক্ষ মোশারফ হোসেন এই কাজ করেছেন, এখন বিপদে পড়ে আর কোনো যোগাযোগ রাখছেন না! তবে অপর ভুয়া শিক্ষক নূর মোহাম্মদ সাংবাদিকদের পরিচয় পেয়ে সটকে পড়েন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বিতর্কিত অধ্যক্ষ মোশারফ হোসেন দায় এড়িয়ে বলেন—
“আমি কোনো সাংবাদিকের সঙ্গে সরাসরি বা ফোনে কথা বলি না। আমার বিরুদ্ধে যা অভিযোগ আছে, তদন্তে যা হওয়ার হবে।”
তবে গভর্নিং বডির বর্তমান সভাপতি অধ্যাপক ইকবাল হোসেন পুরো ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জানান, এটি অত্যন্ত নজিরবিহীন জালিয়াতি। আসামিদের বেতন স্থগিত করা হয়েছে এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখতে ৩ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।











