ঢাকা ০৫:৪০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রায় ১১ নভেম্বর

ধর্ষণে অন্তঃসত্ত্বা শিশু: সব সম্পদের বিনিময়ে হলেও মুক্তি চান মাদ্রাসাশিক্ষক

দৈনিক জাগ্রত বাংলাদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ০৬:০৫:৫৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬
  • / 67

১১ বছরের এক নিষ্পাপ শিশুর শৈশব কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ এবং সেই পাপাচারের নির্মম পরিণতি হিসেবে জন্ম নেওয়া একটি ফুটফুটে নবজাতক—সব মিলিয়ে গোটা দেশজুড়ে নাড়া দেওয়া চাঞ্চল্যকর শিশু ধর্ষণ মামলার আইনি লড়াই এখন একেবারে অন্তিম পর্যায়ে। আদালতে যুক্তিতর্ক চলাকালে নিজের সব সম্পত্তি লিখে দিয়েও রেহাই পাওয়ার আকুল আকুতি জানিয়েছেন অভিযুক্ত মাদ্রাসাশিক্ষক। অবশেষে সিআইডির বৈজ্ঞানিক ডিএনএ প্রমাণের ওপর দাঁড়িয়ে আগামী ১১ নভেম্বর এই চাঞ্চল্যকর মামলার রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেছেন আদালত।

নেত্রকোনার মদন উপজেলায় ১১ বছরের এক মাদ্রাসাপড়ুয়া শিশুকে ধর্ষণের পর অন্তঃসত্ত্বা করার ঘটনায় দায়ের করা বহুল আলোচিত মামলার যুক্তিতর্ক আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়েছে। গতকাল বুধবার নেত্রকোনা শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক আব্দুছ সালামের আদালতে দীর্ঘ শুনানি শেষে আগামী ১১ নভেম্বর (২০২৬) মামলার রায় ঘোষণার দিন নির্ধারণ করা হয়।

মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন জেলা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) নুরুল কবীর। সিআইডির ডিএনএ রিপোর্ট এবং সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে এই মামলার রায় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হতে চলেছে বলে মনে করছেন আইনি বিশেষজ্ঞরা।

আদালতে আসামির আকুতি ও আপসের প্রস্তাব নাকচ

আদালত-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গতকাল বুধবার বিকেলে যখন মামলার যুক্তিতর্ক কার্যক্রম চলছে, ঠিক সে সময় বিচারকের বিশেষ অনুমতি নিয়ে নিজে কথা বলার সুযোগ চান মূল অভিযুক্ত মাদ্রাসাশিক্ষক আমান উল্লাহ মাহদী (৩০)। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে তিনি বিচারকের উদ্দেশে আকুতি জানিয়ে বলেন, তাঁর নিজ নামে ১২ থেকে ১৫ শতাংশ জমি রয়েছে। সেই জমি বা জীবনের সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির বিনিময়ে হলেও যেন তাঁকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

আসামি আরও দাবি করেন, দীর্ঘকাল তাঁকে কারাগারে কাটাতে হলে তাঁর নিজের স্ত্রী ও সন্তানের জীবন ও ভরণপোষণ চরম সংকটে পড়বে। এমনকি এ সময় আসামিপক্ষের আইনজীবী আদালতের সামনে আপসের প্রস্তাব তোলার চেষ্টা করলে বিচারক তা কঠোরভাবে খারিজ করে দেন।

ডিএনএর ৯৯.৯৯ শতাংশ মিল ও অকাট্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ

রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি নুরুল কবীর জানান, রায়ের আগে বিচারিক প্রক্রিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো এই যুক্তিতর্ক। রাষ্ট্রপক্ষ থেকে সমস্ত দাপ্তরিক নথিপত্র এবং সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবরেটরির অত্যন্ত জোরালো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ আদালতের সামনে পেশ করা হয়েছে।

সিআইডি পরীক্ষার সেই প্রতিবেদনে দেখা যায়, ভুক্তভোগী শিশুটির কোলজুড়ে জন্ম নেওয়া নবজাতকের সঙ্গে অভিযুক্ত মাদ্রাসাশিক্ষক আমান উল্লাহ মাহদীর ডিএনএ নমুনার ৯৯.৯৯ শতাংশ নিখুঁত মিল পাওয়া গেছে, যা আসামির অপরাধের পক্ষে সন্দেহাতীত ও অকাট্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ হিসেবে কাজ করেছে।

যেভাবে ফাঁসলেন লোলুপ শিক্ষক: নেপথ্যের করুণ কাহিনী

মামলার এজাহার ও পারিবারিক সূত্র জানায়, প্রায় চার বছর আগে অভিযুক্ত শিক্ষক আমান উল্লাহ মাহদী মদন পৌর শহরে একটি মহিলা কওমি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এদিকে শিশুটির বাবা-মায়ের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে যাওয়ায় সে নানাবাড়িতে থেকে ওই মাদ্রাসায় লেখা পড়া করত। আর তার মা জীবিকার তাগিদে সিলেটে গৃহপরিচারিকার কাজ করতেন।

চলতি বছরের শুরুর দিকে শিশুটির শারীরিক পরিবর্তন ও গুরুতর অসুস্থতা দেখতে পেয়ে মা দ্রুত বাড়িতে ছুটে আসেন। গত ১৮ এপ্রিল মদন পৌর শহরের একটি ক্লিনিকে চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করে জানান যে শিশুটি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েছে। পরিবারের চাপের মুখে শিশুটি শিক্ষকের লালসার লোমহর্ষক বর্ণনা দেয়।

এরপর বিচার চাইতে শিশুর মা শিক্ষকের বাড়িতে গেলে অভিযুক্তের বড় ভাই মাইমন (৩২) উল্টো তাঁকে অকথ্য ভাষায় গালমন্দ ও মারধর করে তাড়া করে বের করে দেন। বাধ্য হয়ে ২৩ এপ্রিল শিশুটির মা বাদী হয়ে শিক্ষক আমান উল্লাহ ও তাঁর ভাইয়ের বিরুদ্ধে মদন থানায় মামলা দায়ের করেন। পুলিশ গত ৬ মে ময়মনসিংহের গৌরীপুর থেকে মূল অভিযুক্ত আমান উল্লাহকে গ্রেপ্তার করে।

নিরাপত্তার সেফ হোম থেকে ডিএনএ টেস্ট

মামলার তদন্তের ধারাবাহিকতায় আদালতের নির্দেশে গত ১২ মে শিশুটিকে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীন সিলেটের একটি নিরাপদ সেফ হোমে পাঠানো হয়। সেখানে গত ২ জুলাই সে একটি কন্যাশিশুর জন্ম দেয়। পরবর্তীতে আদালতের সুনির্দিষ্ট আদেশে গত ২৯ জুলাই নবজাতক ও ভুক্তভোগী মায়ের ডিএনএর নমুনা সংগ্রহ করা হয়।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মদন থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আখতারুজ্জামান গত ২৭ আগস্ট অভিযুক্ত শিক্ষক ও তাঁর বড় ভাইকে আসামি করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। দীর্ঘ তদন্ত ও সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে এখন কেবল রায়ের অপেক্ষা।

রায় ১১ নভেম্বর

ধর্ষণে অন্তঃসত্ত্বা শিশু: সব সম্পদের বিনিময়ে হলেও মুক্তি চান মাদ্রাসাশিক্ষক

আপডেট সময় : ০৬:০৫:৫৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

১১ বছরের এক নিষ্পাপ শিশুর শৈশব কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ এবং সেই পাপাচারের নির্মম পরিণতি হিসেবে জন্ম নেওয়া একটি ফুটফুটে নবজাতক—সব মিলিয়ে গোটা দেশজুড়ে নাড়া দেওয়া চাঞ্চল্যকর শিশু ধর্ষণ মামলার আইনি লড়াই এখন একেবারে অন্তিম পর্যায়ে। আদালতে যুক্তিতর্ক চলাকালে নিজের সব সম্পত্তি লিখে দিয়েও রেহাই পাওয়ার আকুল আকুতি জানিয়েছেন অভিযুক্ত মাদ্রাসাশিক্ষক। অবশেষে সিআইডির বৈজ্ঞানিক ডিএনএ প্রমাণের ওপর দাঁড়িয়ে আগামী ১১ নভেম্বর এই চাঞ্চল্যকর মামলার রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেছেন আদালত।

নেত্রকোনার মদন উপজেলায় ১১ বছরের এক মাদ্রাসাপড়ুয়া শিশুকে ধর্ষণের পর অন্তঃসত্ত্বা করার ঘটনায় দায়ের করা বহুল আলোচিত মামলার যুক্তিতর্ক আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়েছে। গতকাল বুধবার নেত্রকোনা শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক আব্দুছ সালামের আদালতে দীর্ঘ শুনানি শেষে আগামী ১১ নভেম্বর (২০২৬) মামলার রায় ঘোষণার দিন নির্ধারণ করা হয়।

মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন জেলা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) নুরুল কবীর। সিআইডির ডিএনএ রিপোর্ট এবং সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে এই মামলার রায় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হতে চলেছে বলে মনে করছেন আইনি বিশেষজ্ঞরা।

আদালতে আসামির আকুতি ও আপসের প্রস্তাব নাকচ

আদালত-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গতকাল বুধবার বিকেলে যখন মামলার যুক্তিতর্ক কার্যক্রম চলছে, ঠিক সে সময় বিচারকের বিশেষ অনুমতি নিয়ে নিজে কথা বলার সুযোগ চান মূল অভিযুক্ত মাদ্রাসাশিক্ষক আমান উল্লাহ মাহদী (৩০)। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে তিনি বিচারকের উদ্দেশে আকুতি জানিয়ে বলেন, তাঁর নিজ নামে ১২ থেকে ১৫ শতাংশ জমি রয়েছে। সেই জমি বা জীবনের সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির বিনিময়ে হলেও যেন তাঁকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

আসামি আরও দাবি করেন, দীর্ঘকাল তাঁকে কারাগারে কাটাতে হলে তাঁর নিজের স্ত্রী ও সন্তানের জীবন ও ভরণপোষণ চরম সংকটে পড়বে। এমনকি এ সময় আসামিপক্ষের আইনজীবী আদালতের সামনে আপসের প্রস্তাব তোলার চেষ্টা করলে বিচারক তা কঠোরভাবে খারিজ করে দেন।

ডিএনএর ৯৯.৯৯ শতাংশ মিল ও অকাট্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ

রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি নুরুল কবীর জানান, রায়ের আগে বিচারিক প্রক্রিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো এই যুক্তিতর্ক। রাষ্ট্রপক্ষ থেকে সমস্ত দাপ্তরিক নথিপত্র এবং সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবরেটরির অত্যন্ত জোরালো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ আদালতের সামনে পেশ করা হয়েছে।

সিআইডি পরীক্ষার সেই প্রতিবেদনে দেখা যায়, ভুক্তভোগী শিশুটির কোলজুড়ে জন্ম নেওয়া নবজাতকের সঙ্গে অভিযুক্ত মাদ্রাসাশিক্ষক আমান উল্লাহ মাহদীর ডিএনএ নমুনার ৯৯.৯৯ শতাংশ নিখুঁত মিল পাওয়া গেছে, যা আসামির অপরাধের পক্ষে সন্দেহাতীত ও অকাট্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ হিসেবে কাজ করেছে।

যেভাবে ফাঁসলেন লোলুপ শিক্ষক: নেপথ্যের করুণ কাহিনী

মামলার এজাহার ও পারিবারিক সূত্র জানায়, প্রায় চার বছর আগে অভিযুক্ত শিক্ষক আমান উল্লাহ মাহদী মদন পৌর শহরে একটি মহিলা কওমি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এদিকে শিশুটির বাবা-মায়ের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে যাওয়ায় সে নানাবাড়িতে থেকে ওই মাদ্রাসায় লেখা পড়া করত। আর তার মা জীবিকার তাগিদে সিলেটে গৃহপরিচারিকার কাজ করতেন।

চলতি বছরের শুরুর দিকে শিশুটির শারীরিক পরিবর্তন ও গুরুতর অসুস্থতা দেখতে পেয়ে মা দ্রুত বাড়িতে ছুটে আসেন। গত ১৮ এপ্রিল মদন পৌর শহরের একটি ক্লিনিকে চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করে জানান যে শিশুটি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েছে। পরিবারের চাপের মুখে শিশুটি শিক্ষকের লালসার লোমহর্ষক বর্ণনা দেয়।

এরপর বিচার চাইতে শিশুর মা শিক্ষকের বাড়িতে গেলে অভিযুক্তের বড় ভাই মাইমন (৩২) উল্টো তাঁকে অকথ্য ভাষায় গালমন্দ ও মারধর করে তাড়া করে বের করে দেন। বাধ্য হয়ে ২৩ এপ্রিল শিশুটির মা বাদী হয়ে শিক্ষক আমান উল্লাহ ও তাঁর ভাইয়ের বিরুদ্ধে মদন থানায় মামলা দায়ের করেন। পুলিশ গত ৬ মে ময়মনসিংহের গৌরীপুর থেকে মূল অভিযুক্ত আমান উল্লাহকে গ্রেপ্তার করে।

নিরাপত্তার সেফ হোম থেকে ডিএনএ টেস্ট

মামলার তদন্তের ধারাবাহিকতায় আদালতের নির্দেশে গত ১২ মে শিশুটিকে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীন সিলেটের একটি নিরাপদ সেফ হোমে পাঠানো হয়। সেখানে গত ২ জুলাই সে একটি কন্যাশিশুর জন্ম দেয়। পরবর্তীতে আদালতের সুনির্দিষ্ট আদেশে গত ২৯ জুলাই নবজাতক ও ভুক্তভোগী মায়ের ডিএনএর নমুনা সংগ্রহ করা হয়।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মদন থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আখতারুজ্জামান গত ২৭ আগস্ট অভিযুক্ত শিক্ষক ও তাঁর বড় ভাইকে আসামি করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। দীর্ঘ তদন্ত ও সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে এখন কেবল রায়ের অপেক্ষা।