এনডিটিভিকে সাক্ষাৎকার, এবং ডিমের দাম ১৫ টাকা হতেই নার্গিসের সেই আশঙ্কাই কি আজ বাস্তব? দুই বছর পর ডিসেম্বরেই ফিরতে চান ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী
‘কারাবাস হলেও নিজের মাটিতেই মরব!’ ডিসেম্বরেই ফিরছেন শেখ হাসিনা
- আপডেট সময় : ০৪:২৮:৪৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 166
জুলাই-আগস্টের রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দীর্ঘ ২ বছর ১ মাস ১৮ দিন (ঠিক ৭৭৯ দিন) ধরে ভারতে অবস্থান করছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দীর্ঘ এই নীরবতা ও আত্মগোপনের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে তিনি নিজের দেশে ফেরার সুনির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করেছেন। ভারতের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি (NDTV) এবং আন্তর্জাতিক ডিজিটাল মিডিয়া ব্রুট ইন্ডিয়া (Brut India / Brut Media)-কে দেওয়া চাঞ্চল্যকর সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা স্পষ্ট জানিয়েছেন—আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই তিনি বাংলাদেশে ফিরছেন এবং আদালতে হাজির হয়ে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হবেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট টানা সাড়ে ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে দেশ ছাড়েন আওয়ামী লীগ সভাপতি। এরপর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৮ মাসের মেয়াদ পার হয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বর্তমান বিএনপি সরকার দায়িত্ব সামলাচ্ছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তাঁর অনুপস্থিতিতেই দেওয়া হয়েছিল মৃত্যুদণ্ডের রায়। তবে সব চ্যালেঞ্জ ও কারাবাসের ঝুঁকি মাথায় নিয়েই শেখ হাসিনা এবার দেশে ফেরার চূড়ান্ত বার্তা দিলেন।
আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় মুখ খুললেন শেখ হাসিনা: ‘প্রহসনের বিচার উন্মোচিত করব’
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে কথা বলার সময় শেখ হাসিনা নিজের ক্যামেরা বন্ধ রেখেছিলেন (Camera Off)। সাক্ষাৎকারে তিনি এনডিটিভি ও ব্রুট মিডিয়াকে জানান, তিনি আইনের কাঠামোর মধ্য দিয়েই দেশে ফিরতে চান। তবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ দাবি করে তিনি বলেন—
“আমাকে ফিরতেই হবে। আমার দলের নেতাকর্মীরা চরম নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। মৃত্যু যদি আসে, তবে আমি নিজের দেশেই মরতে চাই—যেখানে আমার বাবা-মা শুয়ে আছেন এবং যেখানে তাঁদের রক্ত ঝরেছে। অনেকে আত্মগোপনে আছেন, আমি তাঁদের বলেছি—‘এবার আমি বাংলাদেশে ফিরছি। একদিন আপনারাও চলে আসবেন। আমরা সবাই মিলে একসাথে আদালতে আত্মসমর্পণ করব।’ আইনি প্রক্রিয়া শুরু হলেই মানুষ বুঝতে পারবে এই আদালত কতটা প্রহসনের, আমি সেটাই প্রমাণ করতে চাই।”
এদিকে বিদেশি গণমাধ্যম রয়টার্স (Reuters) ও দ্য গার্ডিয়ান (The Guardian)-এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও উঠে এসেছে যে, নয়া দিল্লিতে অবস্থানরত শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আদালতের রায় কার্যকরের জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রত্যর্পণ অনুরোধ ঢাকা ও দিল্লির দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর বড় ধরনের কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেছে।
তবে প্রথম আলো ইংলিশ-এর এক বিশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, আওয়ামী লীগের ভেতরে আলোচনা রয়েছে যে এই ‘ডিসেম্বর’ সময়সীমাটি প্রতীকীও হতে পারে। দলীয় কর্মীদের চাঙ্গা করা ও রাজনীতিতে অবস্থান পুনর্দখল করার এক মনস্তাত্ত্বিক কৌশল হতে পারে এটি। কারণ, মে মাসে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পর থেকে রাজপথের রাজনীতি তাদের হাতছাড়া।
‘নার্গিসের সেই আশঙ্কাই আজ সাধারণের মুখে মুখে’
রাজনীতির হিসেব-নিকাশ বা কূটনৈতিক টানাপোড়েনের বাইরেও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সাথে যুক্ত থাকে ক্ষমতার পালাবদল। শেখ হাসিনার এই প্রত্যাবর্তনের ঘোষণার পেছনে কাজ করছে দেশের অগণিত সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রামের এক অদৃশ্য মনস্তত্ত্ব।
স্মৃতির পাতায় একটু চোখ ফেরালে দেখা যায়—২০২৪ সালের ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ১৮ দিনের মাথায়, অর্থাৎ ২৬ আগস্ট, হঠাৎ করেই বাজারে এক পিস ডিমের দাম লাফিয়ে ১৫ টাকায় ঠেকে।
তখনও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের উত্তাপ চারপাশে। সেই দিনই আন্দোলনের সাথে যুক্ত থাকা সাধারণ এক তরুণী—নার্গিস, ১৫ টাকার ডিম হাতে নিয়ে মৃদু হেসে তাঁর সহযোদ্ধাকে বলেছিলেন, “এই যে চড়া দামে জিনিসপত্র কিনতে হচ্ছে, সময়ের সাথে সাথে মানুষ যখন বাজারে হাঁসফাঁস করবে, দেখবে একদিন তারাই বলতে শুরু করবে—শেখ হাসিনাই ভালো ছিল!”
আন্দোলনের ঠিক আঠারো দিনের মাথায় দাঁড়িয়ে সাধারণ এক তরুণীর সেই তাৎক্ষণিক উপলব্ধিটি আজ দুই বছর এক মাস পেরিয়ে এসে যেন এক বাস্তব চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজ নিত্যপণ্যের আকাশছোঁয়া দাম ও জীবনযাত্রার চাপে পড়ে চায়ের দোকান থেকে বাজার-ঘাট—বহু সাধারণ মানুষের মুখে মুখে ঘুরছে সেই একই আক্ষেপ। নার্গিসের সেই অনানুষ্ঠানিক আশঙ্কাই আজ যেন বাংলাদেশের গণমানুষের সামাজিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। আর এই জন অসন্তোষের পারদ দেখেই কি তবে ডিসেম্বরের মাঠে নামার হিসাব কষছেন শেখ হাসিনা? উত্তর জমে আছে সময়ের গর্ভেই।
ভারতের অবস্থান সাফ: ‘শেখ হাসিনার বক্তব্য তাঁর নিজস্ব, সম্পর্কের বার্তা তারেক রহমানের কাছে’
তবে শেখ হাসিনার এই ব্যক্তিগত অবস্থান ও প্রত্যাবর্তনের ঘোষণার বিপরীতে প্রতিবেশী দিল্লির মনস্তত্ত্ব ঠিক কী? বিষয়টি নিয়ে ধোঁয়াশা কাটতে মুখ খুলেছেন ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ও রাজ্যসভার সদস্য হর্ষবর্ধন শ্রিংলা।
উত্তর ২৪ পরগনার অ্যাডামাস বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ভারতের অবস্থান পরিষ্কার করে শ্রিংলা সাফ জানিয়ে দেন—
“শেখ হাসিনা কী বলছেন, সেটি তাঁর নিজস্ব এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এর সাথে ভারত সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। ভারত সবসময় বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে চায়।”
শেখ হাসিনার পতনের পর দুই দেশের বরফ জমা সম্পর্কে যে শীতলতা তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে ওঠার ইঙ্গিত দিয়ে শ্রিংলা আরও যুক্ত করেন যে, বর্তমানে বাংলাদেশে জনগণের ভোটে নির্বাচিত বিএনপি সরকার ক্ষমতায় রয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্ব করছেন। ফলে ভারতের সাথে বাংলাদেশের কাজ করাটাই স্বাভাবিক এবং তা একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে। এমনকি দিল্লিতে আয়োজিত ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারতের আমন্ত্রণ জানানোর বিষয়টিও দুই দেশের ভবিষ্যৎ স্বাভাবিক সম্পর্কের বড় ইঙ্গিত বলে মনে করেন তিনি।













