ফ্যামিলি কার্ডের জন্য টিপসই দিয়ে বিধবা জানলেন ‘বিয়ে হয়ে গেছে’
- আপডেট সময় : ০৫:৪১:১৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬
- / 99
সরকারি সহায়তার ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বানিয়ে দেওয়া হবে—এমন আশ্বাসে সরল বিশ্বাসে এনআইডি ফটোকপি আর ছবি দিয়েছিলেন ১৩ বছর আগে স্বামীহারা এক অসহায় বিধবা নারী (৪৩)। কয়েক দিন পর ডেকে নিয়ে একটি কাগজে সই-টিপসইও নেওয়া হলো। কিন্তু সেই সাধারণ টিপসই যে এক নিমেষে জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেবে, তা কল্পনাও করতে পারেননি তিনি! কিছুদিন যেতেই পুরো গ্রামে রটে গেল—ওই বিধবার আবার বিয়ে হয়ে গেছে! শুধু তা-ই নয়, হাতে হাতে ঘুরতে লাগল আড়াই লাখ টাকা দেনমোহরের এক চকচকে কাবিননামা।
চাঞ্চল্যকর ও নজিরবিহীন এই জালিয়াতির ঘটনাটি ঘটেছে ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়া উপজেলার একটি গ্রামে। স্বজন ও নাতি-নাতনি নিয়ে শান্তিতে বাস করা ওই বিধবা হতভম্ব হয়ে বলছেন, “আমি কোথাও বিয়ে করতে যাইনি। কোনো কাজিকেও আমি চোখে দেখিনি।”
ফ্যামিলি কার্ডের লোভে টিপসই, অতঃপর ভূতুড়ে কাবিননামা
ভুক্তভোগী নারীর স্বামী মারা গেছেন প্রায় ১৩ বছর আগে। তারপর থেকে অপরের জমিতে দিনমজুরি করে ও রক্ত পানি করা শ্রমে দুই ছেলেকে বড় করে বিয়ে দিয়েছেন। ঘরে এখন নাতি-নাতনিও রয়েছে। সম্প্রতি স্থানীয় কসমেটিকস ব্যবসায়ী ও স্থানীয় জামায়াতের কেন্দ্র কমিটির সহযোগী সদস্য আবদুস ছাত্তার ফ্যামিলি কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে তাঁর কাছ থেকে ছবি ও এনআইডির ফটোকপি নেন। এরপর কৌশলে একটি কাগজে টিপসই নেওয়া হয়।
অভিযোগ উঠেছে, সেই টিপসই ও তথ্য ব্যবহার করেই তৈরি করা হয়েছে একটি জাল কাবিননামা। আর সেই কাবিননামায় ‘বর’ হিসেবে নাম বসানো হয়েছে স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল কুদ্দুসের। এই কুদ্দুস বিভিন্ন সময় ওই নারীকে বিয়ের প্রস্তাব দিলেও তিনি তা সটান প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। কুদ্দুসের নিজের ঘরেও স্ত্রী, ছেলেমেয়ে ও নাতি-নাতনি রয়েছে।
ঘটনা জানাজানি হলে কুদ্দুস আত্মগোপন করেন। তাঁর স্ত্রী সুফিয়া খাতুন জানান, স্বামী তাঁকে কিছু না জানিয়ে দাবি করছেন তিনি নাকি ‘কোর্ট ম্যারেজ’ করেছেন! পরিবার বোঝানোর চেষ্টা করলেও কুদ্দুস কারও কথা শুনছেন না।
কাজী বলছেন ‘ভুয়া কাগজ’, সাক্ষী বললেন ‘আমি জানিই না’
চাউর হওয়া ওই কাবিননামা পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, এতে দেনমোহর ধরা হয়েছে আড়াই লাখ টাকা, যার মধ্যে ৫০ হাজার টাকা নগদ পরিশোধের কথা লেখা রয়েছে। সেখানে কাজি হিসেবে নাম রয়েছে কাজি গোলাম মোস্তফার। তবে তিনি সরাসরি পুরো ঘটনা অস্বীকার করেছেন।
কাজি গোলাম মোস্তফা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “যে কাবিননামা ছড়ানো হয়েছে, তা সম্পূর্ণ ভুয়া ও জাল। আমি এই বিয়ে সম্পন্ন করিনি। এর আগে ২০২০ সালেও এমন একটি জাল কাগজ তৈরি হওয়ায় থানায় জিডি করেছিলাম। এবারও আইনি ব্যবস্থা নেব।”
অন্যদিকে কাবিননামায় সাক্ষী হিসেবে নাম থাকা স্থানীয় বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম দাবি করেছেন, তিনি কখনোই এমন কোনো বিয়ের সাক্ষী হননি বা সই দেননি।
তদন্তের আশ্বাস জামায়াত ও পুলিশের, গ্রামে সালিশের তোড়জোড়
অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত আবদুস ছাত্তার জানান, তিনি ফ্যামিলি কার্ডের নামে কোনো টিপসই নেননি। জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে তাঁকে রাজনৈতিকভাবে ফাঁসানো হচ্ছে।
এ বিষয়ে উপজেলা জামায়াতের আমির মো. ফজলুল হক জানান, “ঘটনা জানার পর খোঁজ নেওয়া হয়েছে। ছাত্তার দলের পদধারী কেউ নন, নির্বাচনের সময় কেন্দ্র কমিটির সহযোগী সদস্য ছিলেন। আমরা চাই সত্য উদঘাটিত হোক এবং অপরাধীর শাস্তি হোক। তবে প্রাথমিক তথ্যে মনে হচ্ছে এটি সাজানো নাটক হতে পারে।”
ঘটনার জট খুলতে গত সোম ও বুধবার দুই দফা গ্রাম্য সালিশ বসে। তবে প্রধান দুই অভিযুক্ত আবদুস ছাত্তার ও আবদুল কুদ্দুস এতে উপস্থিত হননি। সালিশের নেতৃত্বে থাকা মোহাম্মদ রুস্তম আলী জানান, শুক্রবার পর্যন্ত তাঁদের অবস্থান স্পষ্ট করার সময় দেওয়া হয়েছে। সমাধান না হলে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
ফুলবাড়ীয়া থানার ওসি মোহাম্মদ রাশেদুল হাসান জানিয়েছেন, বিষয়টি তাঁরা লোকমুখে শুনেছেন। লিখিত অভিযোগ পেলেই তদন্তপূর্বক কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।











