ঢাকা ১২:৪৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২২ জুন ২০২৬, ৭ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফরিদপুরে চোর সন্দেহে নির্যাতনে স্কুলছাত্রের মৃত্যুর অভিযোগ

ফরিদপুর প্রতিনিধি:
  • আপডেট সময় : ১০:৪২:৫০ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৩ নভেম্বর ২০২৪
  • / 141

দুইদিন নিখোঁজ থাকার পর ফরিদপুর শহরের চরকমলাপুরের নবম শ্রেণির ছাত্র আবরার জাওয়াদ দারুন নামে নবম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। ময়নাতদন্ত শেষে বুধবার সন্ধ্যায় তাকে দাফন করা হয়।

এর আগে মঙ্গলবার সকালে স্থানীয়দের কাছ থেকে খবর পেয়ে পুলিশ লাশটি উদ্ধার করে।

পরিবারের অভিযোগ, চোর সন্দেহে পিটিয়ে নির্যাতনের পর দারুনের লাশ পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়। আবরার জাওয়াদ দারুন শহরের চর কমলাপুরের বাসিন্দা ভিয়েতনাম প্রবাসী কামরুল ইসলামের একমাত্র সন্তান।

কামরুল ইসলাম আগে ডেসটেনিতে চাকরি করতেন। কিন্তু ডেসটিনির টাকা পয়সা ধরা খাওয়ার পর বেশ কয়েক বছর আগে কামরুল ঢাকায় চলে যান। এরপর সেখান থেকে বিদেশে চলে যান। এদিকে দারুনের মা প্রথম স্বামী ছেড়ে দ্বিতীয় বিয়ে করেন। এরপর থেকে দারুন চরকমলাপুরে তার দাদির কাছেই থাকতো।

পুলিশ জানায়, গেরদা গ্রামের বাসিন্দা রাজমিস্ত্রি মো. সোহেল সাহেববাড়ি পুকুরে বেলা আড়াইটার দিকে একটি লাশ ভাসতে দেখে থানায় খবর দেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে আবরারের লাশ উদ্ধার করে।

দারুনের চাচা মার্শাল টিটো জানান, গত সপ্তাহে দারুনকে শাহীন আবাসিক স্কুলে ভর্তি করা হয়েছিলো। সেখানে দুইদিন থাকার পর গত শুক্রবার রাতে দারুনকে তারা ফরিদপুরের বাসায় নিয়ে আসেন। রোববার (১০ নভেম্বর) রাতে সে হঠাৎ করে নিখোঁজ হয়। সোমবার দুপুরের পর তারা ফেসবুকে দারুনকে জোয়াইরের মোড়ের একটি দোকানে চোর সন্দেহে আটকে জিজ্ঞাসাবাদ করার একটি ভিডিও দেখতে পান। তাৎক্ষণিকভাবে তারা শহরের জোয়াইরের মোড়ে লোক পাঠালে তাদেরকে জানানো হয় সেখান থেকে অনেক আগেই দারুনকে ছেড়ে দিয়েছেন তারা।

স্থানীয়রা জানান, জোয়াইরের মোড়ে সোমবার রাতে অটোরিকশা চুরি হয়। এ ঘটনায় ঐ অটোরিকশা চোরকে ধরা হয়। এর কিছুক্ষণ আগে সেখানে সন্দেহভাজন ঘোরাফেরা করতে দেখে তারা দারুনকে আটক করে। এরপর তারা পুলিশকে খবর দেয়। তবে দারুনের অসংলগ্ন কথাবার্তা শুনতে পেয়ে পুলিশের সন্দেহ না হওয়ায় তাকে আর আটক করে নিয়ে আসেনি পুলিশ। পরে স্থানীয়রা তাকে একটি মুদি দোকানে রেখে নামাজ পড়তে গেলে এক ফাঁকে সেখান থেকে পালিয়ে যায়।

দারুনের চাচা টিটো জানান, গত একমাস যাবত দারুন মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। হঠাৎ করে সে অসংলগ্ন কথাবার্তা বলতো। মা বাবার বিচ্ছেদের বিষয়টি তার ওপর বিরুপ প্রভাব ফেলে।

তিনি অভিযোগ করেন, জোয়াইরের মোড়ে দারুনকে জিজ্ঞাসাবাদ ছাড়াও তাকে মারপিট করা হয় বলে জানতে পেরেছি। এ সময় দারুন বার বার বলছিল তার বাড়ি চর কমলাপুরে। কিন্তু তারা তার এই কথায় কোনো কর্ণপাত না করে তার ওপর নির্যাতন করে। এরপর সে কীভাবে সেখান থেকে বের হলো এবং কীভাবে তার লাশ ওই পুকুরে আসলো এ বিষয়টি জানতে পারছেন না।

এদিকে দারুন নিখোঁজ হওয়ার পর বিষয়টি পরিচিত জনেরা ফেসবুকের মাধ্যমে তারা পোস্ট দেন। এরপর সোমবার বিকেল পাঁচটার পর ০১৩৩৩১১৭২৩০ ও ০১৬১০৭৯৪০৬৮ এই দুটি নম্বর থেকে তার চাচা মার্শাল টিটোর মোবাইল নম্বরে ফোন করে বলা হয়, দারুন মানিকগঞ্জের ঘিওরে এক্সিডেন্ট করেছে। তার দ্রুত রক্ত লাগবে আপনারা টাকা পাঠান। এরপর সন্ধ্যা সাতটার দিকে টিটো প্রথম নম্বরটিতে ৭ হাজার ৭০০ টাকা পাঠান। মার্শাল টিটো ঢাকায় হেলথ ডিপার্টমেন্টে চাকরি করেন। তিনি মানিকগঞ্জে অবস্থানরত তার এক কলিগকে ফোন করে তার ভাতিজার খোঁজ নিতে বলেন। তখন তিনি জানতে পারেন, তিনি প্রতারণার শিকার হয়েছেন এরপর প্রতারকের মোবাইল ফোন দুটি বন্ধ পাওয়া যায়।

দারুনের নিকটতম প্রতিবেশী চরকমলাপুরের বাসিন্দা নান্টু খান জানান, মা-বাবার ডিভোর্সের পর দারুন তার দাদির বাড়িতে থাকতো। তার দাবি হালিমা বেগম সারদা সুন্দরী কলেজের আয়ার চাকরি করেন।

নান্টু খান বলেন, পুকুর থেকে লাশ উদ্ধারের সময় দারুনের শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন দেখতে পেয়েছেন তিনি। তাকে নির্যাতন করে হত্যার পর লাশটি পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়েছে বলে তাদের ধারণা।

পুলিশ জানায়, স্থানীয়দের মাধ্যমে খবর পেয়ে মঙ্গলবার দুপুরে গেরদা ইউনিয়নের সাহেব বাড়ির পুকুর থেকে দারুনের লাশ উদ্ধার করা হয়। তবে তার লাশ উদ্ধারের সময় তারা কোনো আঘাতের চিহ্ন দেখতে পাননি। ময়নাতদন্ত শেষে বুধবার বাদ আসর চরকমলাপুরের জান্নাতুল ফেরদৌস জামে মসজিদে জানাজা শেষে তাকে পার্শ্ববর্তী বিলমামুদপুর গোরস্থানে দাফন করা হয়েছে।

কোতোয়ালি থানার এসআই ফাহিম ফয়সাল জানান, আবরার জাওয়াদ নিখোঁজের ঘটনায় থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছিল। দুপুরে খবর পেয়ে সাহেববাড়ি পুকুর থেকে তার লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠানো হয়েছে।

কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আসাদউজ্জামান বলেন, দারুনের লাশ উদ্ধারের ঘটনায় থানায় একটি ইউপি (অপমৃত্যু) মামলা দায়ের করা হয়েছে। লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। ময়নাতদন্ত রিপোর্টে যদি তাকে নির্যাতন বা অন্য কোনোভাবে মেরে ফেলার আলামত পাওয়া যায় তাহলে পরবর্তীতে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ফরিদপুরে চোর সন্দেহে নির্যাতনে স্কুলছাত্রের মৃত্যুর অভিযোগ

আপডেট সময় : ১০:৪২:৫০ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৩ নভেম্বর ২০২৪

দুইদিন নিখোঁজ থাকার পর ফরিদপুর শহরের চরকমলাপুরের নবম শ্রেণির ছাত্র আবরার জাওয়াদ দারুন নামে নবম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। ময়নাতদন্ত শেষে বুধবার সন্ধ্যায় তাকে দাফন করা হয়।

এর আগে মঙ্গলবার সকালে স্থানীয়দের কাছ থেকে খবর পেয়ে পুলিশ লাশটি উদ্ধার করে।

পরিবারের অভিযোগ, চোর সন্দেহে পিটিয়ে নির্যাতনের পর দারুনের লাশ পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়। আবরার জাওয়াদ দারুন শহরের চর কমলাপুরের বাসিন্দা ভিয়েতনাম প্রবাসী কামরুল ইসলামের একমাত্র সন্তান।

কামরুল ইসলাম আগে ডেসটেনিতে চাকরি করতেন। কিন্তু ডেসটিনির টাকা পয়সা ধরা খাওয়ার পর বেশ কয়েক বছর আগে কামরুল ঢাকায় চলে যান। এরপর সেখান থেকে বিদেশে চলে যান। এদিকে দারুনের মা প্রথম স্বামী ছেড়ে দ্বিতীয় বিয়ে করেন। এরপর থেকে দারুন চরকমলাপুরে তার দাদির কাছেই থাকতো।

পুলিশ জানায়, গেরদা গ্রামের বাসিন্দা রাজমিস্ত্রি মো. সোহেল সাহেববাড়ি পুকুরে বেলা আড়াইটার দিকে একটি লাশ ভাসতে দেখে থানায় খবর দেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে আবরারের লাশ উদ্ধার করে।

দারুনের চাচা মার্শাল টিটো জানান, গত সপ্তাহে দারুনকে শাহীন আবাসিক স্কুলে ভর্তি করা হয়েছিলো। সেখানে দুইদিন থাকার পর গত শুক্রবার রাতে দারুনকে তারা ফরিদপুরের বাসায় নিয়ে আসেন। রোববার (১০ নভেম্বর) রাতে সে হঠাৎ করে নিখোঁজ হয়। সোমবার দুপুরের পর তারা ফেসবুকে দারুনকে জোয়াইরের মোড়ের একটি দোকানে চোর সন্দেহে আটকে জিজ্ঞাসাবাদ করার একটি ভিডিও দেখতে পান। তাৎক্ষণিকভাবে তারা শহরের জোয়াইরের মোড়ে লোক পাঠালে তাদেরকে জানানো হয় সেখান থেকে অনেক আগেই দারুনকে ছেড়ে দিয়েছেন তারা।

স্থানীয়রা জানান, জোয়াইরের মোড়ে সোমবার রাতে অটোরিকশা চুরি হয়। এ ঘটনায় ঐ অটোরিকশা চোরকে ধরা হয়। এর কিছুক্ষণ আগে সেখানে সন্দেহভাজন ঘোরাফেরা করতে দেখে তারা দারুনকে আটক করে। এরপর তারা পুলিশকে খবর দেয়। তবে দারুনের অসংলগ্ন কথাবার্তা শুনতে পেয়ে পুলিশের সন্দেহ না হওয়ায় তাকে আর আটক করে নিয়ে আসেনি পুলিশ। পরে স্থানীয়রা তাকে একটি মুদি দোকানে রেখে নামাজ পড়তে গেলে এক ফাঁকে সেখান থেকে পালিয়ে যায়।

দারুনের চাচা টিটো জানান, গত একমাস যাবত দারুন মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। হঠাৎ করে সে অসংলগ্ন কথাবার্তা বলতো। মা বাবার বিচ্ছেদের বিষয়টি তার ওপর বিরুপ প্রভাব ফেলে।

তিনি অভিযোগ করেন, জোয়াইরের মোড়ে দারুনকে জিজ্ঞাসাবাদ ছাড়াও তাকে মারপিট করা হয় বলে জানতে পেরেছি। এ সময় দারুন বার বার বলছিল তার বাড়ি চর কমলাপুরে। কিন্তু তারা তার এই কথায় কোনো কর্ণপাত না করে তার ওপর নির্যাতন করে। এরপর সে কীভাবে সেখান থেকে বের হলো এবং কীভাবে তার লাশ ওই পুকুরে আসলো এ বিষয়টি জানতে পারছেন না।

এদিকে দারুন নিখোঁজ হওয়ার পর বিষয়টি পরিচিত জনেরা ফেসবুকের মাধ্যমে তারা পোস্ট দেন। এরপর সোমবার বিকেল পাঁচটার পর ০১৩৩৩১১৭২৩০ ও ০১৬১০৭৯৪০৬৮ এই দুটি নম্বর থেকে তার চাচা মার্শাল টিটোর মোবাইল নম্বরে ফোন করে বলা হয়, দারুন মানিকগঞ্জের ঘিওরে এক্সিডেন্ট করেছে। তার দ্রুত রক্ত লাগবে আপনারা টাকা পাঠান। এরপর সন্ধ্যা সাতটার দিকে টিটো প্রথম নম্বরটিতে ৭ হাজার ৭০০ টাকা পাঠান। মার্শাল টিটো ঢাকায় হেলথ ডিপার্টমেন্টে চাকরি করেন। তিনি মানিকগঞ্জে অবস্থানরত তার এক কলিগকে ফোন করে তার ভাতিজার খোঁজ নিতে বলেন। তখন তিনি জানতে পারেন, তিনি প্রতারণার শিকার হয়েছেন এরপর প্রতারকের মোবাইল ফোন দুটি বন্ধ পাওয়া যায়।

দারুনের নিকটতম প্রতিবেশী চরকমলাপুরের বাসিন্দা নান্টু খান জানান, মা-বাবার ডিভোর্সের পর দারুন তার দাদির বাড়িতে থাকতো। তার দাবি হালিমা বেগম সারদা সুন্দরী কলেজের আয়ার চাকরি করেন।

নান্টু খান বলেন, পুকুর থেকে লাশ উদ্ধারের সময় দারুনের শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন দেখতে পেয়েছেন তিনি। তাকে নির্যাতন করে হত্যার পর লাশটি পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়েছে বলে তাদের ধারণা।

পুলিশ জানায়, স্থানীয়দের মাধ্যমে খবর পেয়ে মঙ্গলবার দুপুরে গেরদা ইউনিয়নের সাহেব বাড়ির পুকুর থেকে দারুনের লাশ উদ্ধার করা হয়। তবে তার লাশ উদ্ধারের সময় তারা কোনো আঘাতের চিহ্ন দেখতে পাননি। ময়নাতদন্ত শেষে বুধবার বাদ আসর চরকমলাপুরের জান্নাতুল ফেরদৌস জামে মসজিদে জানাজা শেষে তাকে পার্শ্ববর্তী বিলমামুদপুর গোরস্থানে দাফন করা হয়েছে।

কোতোয়ালি থানার এসআই ফাহিম ফয়সাল জানান, আবরার জাওয়াদ নিখোঁজের ঘটনায় থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছিল। দুপুরে খবর পেয়ে সাহেববাড়ি পুকুর থেকে তার লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠানো হয়েছে।

কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আসাদউজ্জামান বলেন, দারুনের লাশ উদ্ধারের ঘটনায় থানায় একটি ইউপি (অপমৃত্যু) মামলা দায়ের করা হয়েছে। লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। ময়নাতদন্ত রিপোর্টে যদি তাকে নির্যাতন বা অন্য কোনোভাবে মেরে ফেলার আলামত পাওয়া যায় তাহলে পরবর্তীতে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।