ঢাকা ০৭:২৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬, ৮ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বাগত বঙ্গাব্দ ১৪৩২

ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে নতুন উদ্দীপনায় বাংলা নববর্ষ আজ

স্টাফ রিপোর্টার
  • আপডেট সময় : ০১:৪৫:১৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৫
  • / 237

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কালজয়ী আহ্বান “ঐ নূতনের কেতন ওড়ে, কালবৈশাখীর ঝড়…” কে ধারণ করে আবারও এসেছে পহেলা বৈশাখ, বাঙালির নববর্ষ। নতুন সূর্যের আলোয় উদ্ভাসিত প্রকৃতি যেমন হৃদয়কে দোলা দেয়, তেমনি বৈশাখ আমাদের মনেও নিয়ে আসে নতুনত্বের বার্তা। গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহ যখন জীবনকে রুক্ষ করে তোলে, তখন বৈশাখ তার ঝড়ো হাওয়ায় পুরনো দিনের জীর্ণতাকে ঝেড়ে ফেলে নতুনের আগমনকে ত্বরান্বিত করে।

দীর্ঘ ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটিয়ে নতুন এক যাত্রা শুরু করেছে বাংলাদেশ। তাই এবারের বর্ষবরণ উদযাপনে তারুণ্যের বাঁধভাঙা উদ্দীপনা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। এইবারের পহেলা বৈশাখ শুধু একটি উৎসব নয়, এটি বাংলাদেশের সকল নাগরিক, বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের কাছে এক ভিন্ন আমেজ নিয়ে এসেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তত্ত্বাবধানে এই প্রথম দেশের সকল নাগরিক ঐক্যবদ্ধভাবে উদযাপন করছে সর্বজনীন লোকউৎসব ‘পহেলা বৈশাখ ১৪৩২’।

পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশ সেজেছে নতুন রূপে, নেওয়া হয়েছে বর্ণাঢ্য কর্মসূচি। বাঙালি জাতির চিরন্তন ঐতিহ্যের প্রতীক এই দিনটিতে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন ও প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস পৃথক বাণী দিয়েছেন।

প্রধান উপদেষ্টা তার বাণীতে ’২৪-এর গণঅভ্যুত্থানকে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এই অভ্যুত্থান বৈষম্যহীন, সুখী-সমৃদ্ধ ও শান্তিময় বাংলাদেশ গঠনে প্রেরণা যোগায়। বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়াই হোক এবারের নববর্ষের অঙ্গীকার। তিনি বিগত বছরের গ্লানি, দুঃখ-বেদনা ভুলে গিয়ে নতুন প্রত্যয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও বাণী দিয়েছেন। তারেক রহমান পহেলা বৈশাখকে জাতির আত্মপরিচয়ের উজ্জ্বল উপাদান হিসেবে উল্লেখ করেন এবং দেশ-বিদেশে অবস্থানরত সকল বাংলাদেশিকে আন্তরিক অভিনন্দন জানান। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আশা প্রকাশ করেন, এবারের পহেলা বৈশাখে মানুষের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা ও বিভাজন দূর হবে এবং ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর এই উৎসব স্বস্তির বার্তা নিয়ে আসবে।

সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সরকার এই প্রথম ১৪৩২ সালের বাংলা নববর্ষ এবং চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা ও গারোসহ অন্যান্য নৃ-গোষ্ঠীর নববর্ষ উদযাপনের জন্য জাতীয় পর্যায়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক উৎসব আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছে।

বৈশাখ মাসের প্রথম দিনটিকে আরও আনন্দমুখর করে তোলে শোভাযাত্রা ও বৈশাখী মেলা। এই মেলাগুলো বাঙালির লোকায়ত সংস্কৃতির ধারক, যেখানে স্থানীয় কৃষিজাত দ্রব্য, কারুপণ্য, লোকশিল্প, কুটির শিল্প, হস্তশিল্প, মৃৎশিল্প, খেলনা এবং চিঁড়া, মুড়ি, খৈ, বাতাসা, মিষ্টিসহ বিভিন্ন লোকজ খাদ্যদ্রব্যের সমাহার ঘটে। এছাড়াও নাগরদোলা, পুতুলনাচ, যাত্রা ও লোকজ গানের আসরসহ নানান বিনোদন থাকে।

সরকারের নেওয়া কর্মসূচি অনুযায়ী, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, মহানগর ও পৌরসভা এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পার্বত্য জেলা ও অন্যান্য নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক দলগুলোর শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণের সমন্বয় করবে। পহেলা বৈশাখকে স্বাগত জানাতে ভোরে রমনা বটমূলে ছায়ানট সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে। বাংলা একাডেমি ও বিসিক বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে এবং বাংলাদেশ লোকশিল্প ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন বৈশাখী মেলার আয়োজন করবে। বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনও বর্ষবরণ উপলক্ষে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে।

বর্ষবরণের ঐতিহ্য বজায় রেখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উৎসবমুখর পরিবেশে সকাল ৯টায় চারুকলা অনুষদের সামনে থেকে ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’ বের করবে। এবারের শোভাযাত্রার প্রতিপাদ্য ‘নববর্ষের ঐকতান, ফ্যাসিবাদের অবসান’। দিনব্যাপী আনন্দ উৎসব চলবে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত। বিপুলসংখ্যক অতিথির সমাগম উপলক্ষে পুরো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় নেওয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা। বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও পুরো ঢাকা শহরে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা, আর্চওয়ে গেইট, হেল্প ডেস্ক, কন্ট্রোল রুম, অস্থায়ী পাবলিক টয়লেট ও মেডিক্যাল ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণের এবারের মূল বার্তা ‘আমার মুক্তি আলোয় আলোয়’—আলো, প্রকৃতি, মানুষ ও দেশপ্রেমের গান।

স্বাগত বঙ্গাব্দ ১৪৩২

ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে নতুন উদ্দীপনায় বাংলা নববর্ষ আজ

আপডেট সময় : ০১:৪৫:১৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৫

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কালজয়ী আহ্বান “ঐ নূতনের কেতন ওড়ে, কালবৈশাখীর ঝড়…” কে ধারণ করে আবারও এসেছে পহেলা বৈশাখ, বাঙালির নববর্ষ। নতুন সূর্যের আলোয় উদ্ভাসিত প্রকৃতি যেমন হৃদয়কে দোলা দেয়, তেমনি বৈশাখ আমাদের মনেও নিয়ে আসে নতুনত্বের বার্তা। গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহ যখন জীবনকে রুক্ষ করে তোলে, তখন বৈশাখ তার ঝড়ো হাওয়ায় পুরনো দিনের জীর্ণতাকে ঝেড়ে ফেলে নতুনের আগমনকে ত্বরান্বিত করে।

দীর্ঘ ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটিয়ে নতুন এক যাত্রা শুরু করেছে বাংলাদেশ। তাই এবারের বর্ষবরণ উদযাপনে তারুণ্যের বাঁধভাঙা উদ্দীপনা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। এইবারের পহেলা বৈশাখ শুধু একটি উৎসব নয়, এটি বাংলাদেশের সকল নাগরিক, বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের কাছে এক ভিন্ন আমেজ নিয়ে এসেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তত্ত্বাবধানে এই প্রথম দেশের সকল নাগরিক ঐক্যবদ্ধভাবে উদযাপন করছে সর্বজনীন লোকউৎসব ‘পহেলা বৈশাখ ১৪৩২’।

পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশ সেজেছে নতুন রূপে, নেওয়া হয়েছে বর্ণাঢ্য কর্মসূচি। বাঙালি জাতির চিরন্তন ঐতিহ্যের প্রতীক এই দিনটিতে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন ও প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস পৃথক বাণী দিয়েছেন।

প্রধান উপদেষ্টা তার বাণীতে ’২৪-এর গণঅভ্যুত্থানকে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এই অভ্যুত্থান বৈষম্যহীন, সুখী-সমৃদ্ধ ও শান্তিময় বাংলাদেশ গঠনে প্রেরণা যোগায়। বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়াই হোক এবারের নববর্ষের অঙ্গীকার। তিনি বিগত বছরের গ্লানি, দুঃখ-বেদনা ভুলে গিয়ে নতুন প্রত্যয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও বাণী দিয়েছেন। তারেক রহমান পহেলা বৈশাখকে জাতির আত্মপরিচয়ের উজ্জ্বল উপাদান হিসেবে উল্লেখ করেন এবং দেশ-বিদেশে অবস্থানরত সকল বাংলাদেশিকে আন্তরিক অভিনন্দন জানান। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আশা প্রকাশ করেন, এবারের পহেলা বৈশাখে মানুষের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা ও বিভাজন দূর হবে এবং ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর এই উৎসব স্বস্তির বার্তা নিয়ে আসবে।

সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সরকার এই প্রথম ১৪৩২ সালের বাংলা নববর্ষ এবং চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা ও গারোসহ অন্যান্য নৃ-গোষ্ঠীর নববর্ষ উদযাপনের জন্য জাতীয় পর্যায়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক উৎসব আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছে।

বৈশাখ মাসের প্রথম দিনটিকে আরও আনন্দমুখর করে তোলে শোভাযাত্রা ও বৈশাখী মেলা। এই মেলাগুলো বাঙালির লোকায়ত সংস্কৃতির ধারক, যেখানে স্থানীয় কৃষিজাত দ্রব্য, কারুপণ্য, লোকশিল্প, কুটির শিল্প, হস্তশিল্প, মৃৎশিল্প, খেলনা এবং চিঁড়া, মুড়ি, খৈ, বাতাসা, মিষ্টিসহ বিভিন্ন লোকজ খাদ্যদ্রব্যের সমাহার ঘটে। এছাড়াও নাগরদোলা, পুতুলনাচ, যাত্রা ও লোকজ গানের আসরসহ নানান বিনোদন থাকে।

সরকারের নেওয়া কর্মসূচি অনুযায়ী, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, মহানগর ও পৌরসভা এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পার্বত্য জেলা ও অন্যান্য নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক দলগুলোর শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণের সমন্বয় করবে। পহেলা বৈশাখকে স্বাগত জানাতে ভোরে রমনা বটমূলে ছায়ানট সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে। বাংলা একাডেমি ও বিসিক বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে এবং বাংলাদেশ লোকশিল্প ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন বৈশাখী মেলার আয়োজন করবে। বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনও বর্ষবরণ উপলক্ষে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে।

বর্ষবরণের ঐতিহ্য বজায় রেখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উৎসবমুখর পরিবেশে সকাল ৯টায় চারুকলা অনুষদের সামনে থেকে ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’ বের করবে। এবারের শোভাযাত্রার প্রতিপাদ্য ‘নববর্ষের ঐকতান, ফ্যাসিবাদের অবসান’। দিনব্যাপী আনন্দ উৎসব চলবে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত। বিপুলসংখ্যক অতিথির সমাগম উপলক্ষে পুরো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় নেওয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা। বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও পুরো ঢাকা শহরে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা, আর্চওয়ে গেইট, হেল্প ডেস্ক, কন্ট্রোল রুম, অস্থায়ী পাবলিক টয়লেট ও মেডিক্যাল ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণের এবারের মূল বার্তা ‘আমার মুক্তি আলোয় আলোয়’—আলো, প্রকৃতি, মানুষ ও দেশপ্রেমের গান।