ঢাকা ০৪:২৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সারা দেশে সাঁড়াশি অভিযান শুরু

দৈনিক জাগ্রত বাংলাদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ০৫:০৩:১৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬
  • / 212

আগস্ট ও সেপ্টেম্বর—পরপর দুই দফায় দূর পরবাস থেকে গর্জে উঠেছিলেন তিনি। স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন, আগামী ‘ডিসেম্বর’-এর মধ্যেই দেশের মাটিতে পা রাখছেন। আর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই একটিমাত্র ঘোষণাতেই যেন ওলটপালট হয়ে গেছে দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রেক্ষাপট! একদিকে যখন আত্মগোপনে থাকা দলের নেতাকর্মীরা নতুন করে মাথাচাড়া দেওয়ার রসদ খুঁজছেন, অন্যদিকে তখন যেকোনো মূল্যে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি রুখতে পুরো দেশে সাঁড়াশি চাটু মারছে যৌথ বাহিনী।

পুলিশ সদর দপ্তরের এক চাঞ্চল্যকর পরিসংখ্যানে জানা গেছে, গত এক মাসে সারা দেশ থেকে প্রায় ৫৩ হাজার লোককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এমনকি চলতি মাসের প্রথম ৬ দিনেই হাতকড়া পরানো হয়েছে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে! খাস রাজধানী ঢাকাতেই প্রতিদিন গড়ে ৫০০ জনকে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। বুধবারই কেবল ডিএমপি গ্রেপ্তার করেছে ৪৬৫ জনকে।

ইতোমধ্যেই পুলিশের জালে ধরা পড়েছেন মানিকগঞ্জ সাটুরিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আনোয়ার হোসেন খান জ্যোতি, পঞ্চগড়-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য নাঈমুজ্জামান ভূঁইয়া মুক্তা, সাটুরিয়ার রুহুল আমিন, কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরের রেনু মিয়া এবং কেরানীগঞ্জের তাঁতী লীগ নেতা নজরুল ইসলাম সরকারসহ তৃণমূল থেকে শীর্ষ পর্যায়ের বহু নেতা।

‘কৌশল’ নাকি ‘গোপন বন্দোবস্ত’? কী লুকিয়ে শেখ হাসিনার বার্তায়?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশের মতে, দেশে পা রাখলেই যেখানে নিশ্চিত গ্রেপ্তার ও আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে, সেখানে এই ঘোষণা নিছকই কোণঠাসা হয়ে পড়া নেতাকর্মীদের মনস্তাত্ত্বিক মনোবল চাঙা রাখার ‘ট্যাকটিক্স’।

তবে অন্য এক বিস্ফোরক বিশ্লেষণ উঠে আসছে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে। তাঁদের মতে, ভারতের মাটিতে শেখ হাসিনাকে দীর্ঘকাল আশ্রয় দেওয়াকে দিল্লি নিজের জন্য এক ধরনের কূটনৈতিক চাপ মনে করছে। ফলে ‘মৃত্যুদণ্ড কার্যকর না করার’ মতো বিশেষ আইনি ও নিরাপত্তা নিশ্চয়তার ভিত্তিতে কোনো আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতা বা ‘নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের’ মাধ্যমে তাঁকে দেশে ফেরানোর একটা প্রচ্ছন্ন চেষ্টা আড়ালে চললেও চলতে পারে।

বিশ্লেষক ও প্রবীণ সাংবাদিক মাসুদ কামালের মতে, “সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দেশে ফেরার ঘোষণাকে স্রেফ মনস্তাত্ত্বিক খেলা ভাবলে ভুল হবে। রাজনৈতিক পুনর্বাসন এবং দেশের মাটিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের বিষয়টিও এর পেছনে কাজ করতে পারে। তবে আত্মগোপনে থাকা কর্মীরা যদি হুট করে মাঠে নেমে পড়ে, তবে কেবল গ্রেপ্তার করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হবে।”

কারাগারে হাঁসফাঁস অবস্থা, উদ্বেগে অপরাধ বিজ্ঞানীরা

ব্যাপক ধরপাকড় চললেও প্রশাসনের কপালে এখন চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে ‘কারাগারের ধারণক্ষমতা’। দেশের সবগুলো কারাগার মিলিয়ে আসন সংখ্যা যেখানে মাত্র ৪৫ হাজার, সেখানে বর্তমানে বন্দির সংখ্যা এক লাখের কোঠা ছুঁইছুঁই!

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞানী ড. তৌহিদুল হকের মতে, “রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া যদি জবরদস্তিমূলক প্রতিরোধের পরিস্থিতি তৈরি হয়, তবে দেশে রক্তক্ষয়ী সংঘাত এড়ানো সম্ভব নয়। কেবল ঢালাও গ্রেপ্তার বা পুলিশি শক্তি দিয়ে এমন সংকট মোকাবিলা করা যায় না। সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে কেবল উসকানিদাতাদের ধরতে হবে, তা না হলে কারাগারের অতিরিক্ত বন্দিসংকট নিজেই একসময় প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।”

‘মাথাচাড়া দিতে দেওয়া হবে না’: জিরো টলারেন্সে পুলিশ প্রশাসন

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়ানো বা উসকানিমূলক পোস্ট মোকাবিলায় ইতিমধ্যেই প্রস্তুত করা হয়েছে সাইবার স্পেশাল ইউনিট। তৈরি হয়েছে আত্মগোপনে থাকা নেতাদের নতুন হিটলিস্ট।

সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দীন আহমদ এবং গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) প্রধান মো. শফিকুল ইসলাম সাফ জানিয়ে দিয়েছেন—ডিসেম্বরকে ঘিরে ঢাকায় কোনো ধরনের জনজীবন অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টা বা বিশৃঙ্খলা বরদাশত করা হবে না। কার্যক্রম নিষিদ্ধ কোনো রাজনৈতিক দলকে কোনো অবস্থাতেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে দেওয়া হবে না এবং যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশ কঠোরতম অবস্থানেই থাকবে।

সারা দেশে সাঁড়াশি অভিযান শুরু

আপডেট সময় : ০৫:০৩:১৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬

আগস্ট ও সেপ্টেম্বর—পরপর দুই দফায় দূর পরবাস থেকে গর্জে উঠেছিলেন তিনি। স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন, আগামী ‘ডিসেম্বর’-এর মধ্যেই দেশের মাটিতে পা রাখছেন। আর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই একটিমাত্র ঘোষণাতেই যেন ওলটপালট হয়ে গেছে দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রেক্ষাপট! একদিকে যখন আত্মগোপনে থাকা দলের নেতাকর্মীরা নতুন করে মাথাচাড়া দেওয়ার রসদ খুঁজছেন, অন্যদিকে তখন যেকোনো মূল্যে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি রুখতে পুরো দেশে সাঁড়াশি চাটু মারছে যৌথ বাহিনী।

পুলিশ সদর দপ্তরের এক চাঞ্চল্যকর পরিসংখ্যানে জানা গেছে, গত এক মাসে সারা দেশ থেকে প্রায় ৫৩ হাজার লোককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এমনকি চলতি মাসের প্রথম ৬ দিনেই হাতকড়া পরানো হয়েছে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে! খাস রাজধানী ঢাকাতেই প্রতিদিন গড়ে ৫০০ জনকে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। বুধবারই কেবল ডিএমপি গ্রেপ্তার করেছে ৪৬৫ জনকে।

ইতোমধ্যেই পুলিশের জালে ধরা পড়েছেন মানিকগঞ্জ সাটুরিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আনোয়ার হোসেন খান জ্যোতি, পঞ্চগড়-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য নাঈমুজ্জামান ভূঁইয়া মুক্তা, সাটুরিয়ার রুহুল আমিন, কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরের রেনু মিয়া এবং কেরানীগঞ্জের তাঁতী লীগ নেতা নজরুল ইসলাম সরকারসহ তৃণমূল থেকে শীর্ষ পর্যায়ের বহু নেতা।

‘কৌশল’ নাকি ‘গোপন বন্দোবস্ত’? কী লুকিয়ে শেখ হাসিনার বার্তায়?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশের মতে, দেশে পা রাখলেই যেখানে নিশ্চিত গ্রেপ্তার ও আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে, সেখানে এই ঘোষণা নিছকই কোণঠাসা হয়ে পড়া নেতাকর্মীদের মনস্তাত্ত্বিক মনোবল চাঙা রাখার ‘ট্যাকটিক্স’।

তবে অন্য এক বিস্ফোরক বিশ্লেষণ উঠে আসছে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে। তাঁদের মতে, ভারতের মাটিতে শেখ হাসিনাকে দীর্ঘকাল আশ্রয় দেওয়াকে দিল্লি নিজের জন্য এক ধরনের কূটনৈতিক চাপ মনে করছে। ফলে ‘মৃত্যুদণ্ড কার্যকর না করার’ মতো বিশেষ আইনি ও নিরাপত্তা নিশ্চয়তার ভিত্তিতে কোনো আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতা বা ‘নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের’ মাধ্যমে তাঁকে দেশে ফেরানোর একটা প্রচ্ছন্ন চেষ্টা আড়ালে চললেও চলতে পারে।

বিশ্লেষক ও প্রবীণ সাংবাদিক মাসুদ কামালের মতে, “সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দেশে ফেরার ঘোষণাকে স্রেফ মনস্তাত্ত্বিক খেলা ভাবলে ভুল হবে। রাজনৈতিক পুনর্বাসন এবং দেশের মাটিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের বিষয়টিও এর পেছনে কাজ করতে পারে। তবে আত্মগোপনে থাকা কর্মীরা যদি হুট করে মাঠে নেমে পড়ে, তবে কেবল গ্রেপ্তার করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হবে।”

কারাগারে হাঁসফাঁস অবস্থা, উদ্বেগে অপরাধ বিজ্ঞানীরা

ব্যাপক ধরপাকড় চললেও প্রশাসনের কপালে এখন চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে ‘কারাগারের ধারণক্ষমতা’। দেশের সবগুলো কারাগার মিলিয়ে আসন সংখ্যা যেখানে মাত্র ৪৫ হাজার, সেখানে বর্তমানে বন্দির সংখ্যা এক লাখের কোঠা ছুঁইছুঁই!

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞানী ড. তৌহিদুল হকের মতে, “রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া যদি জবরদস্তিমূলক প্রতিরোধের পরিস্থিতি তৈরি হয়, তবে দেশে রক্তক্ষয়ী সংঘাত এড়ানো সম্ভব নয়। কেবল ঢালাও গ্রেপ্তার বা পুলিশি শক্তি দিয়ে এমন সংকট মোকাবিলা করা যায় না। সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে কেবল উসকানিদাতাদের ধরতে হবে, তা না হলে কারাগারের অতিরিক্ত বন্দিসংকট নিজেই একসময় প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।”

‘মাথাচাড়া দিতে দেওয়া হবে না’: জিরো টলারেন্সে পুলিশ প্রশাসন

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়ানো বা উসকানিমূলক পোস্ট মোকাবিলায় ইতিমধ্যেই প্রস্তুত করা হয়েছে সাইবার স্পেশাল ইউনিট। তৈরি হয়েছে আত্মগোপনে থাকা নেতাদের নতুন হিটলিস্ট।

সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দীন আহমদ এবং গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) প্রধান মো. শফিকুল ইসলাম সাফ জানিয়ে দিয়েছেন—ডিসেম্বরকে ঘিরে ঢাকায় কোনো ধরনের জনজীবন অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টা বা বিশৃঙ্খলা বরদাশত করা হবে না। কার্যক্রম নিষিদ্ধ কোনো রাজনৈতিক দলকে কোনো অবস্থাতেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে দেওয়া হবে না এবং যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশ কঠোরতম অবস্থানেই থাকবে।