বিদেশে ছেলে, লাশ হয়ে ফিরলেন বাবা: ফরিদপুর জজকোর্টে বিধবার ফাঁসির দাবি
- আপডেট সময় : ০৭:২৯:০৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 215
“আমার একটাই ছেলে। ছয় মাস আগে পেটের তাগিদে বিদেশে গেছে। আজ তার বাবার লাশটা পর্যন্ত দেখতে পারল না! আমারে যারা অসময়ে বিধবা করল, আমি সেই খুনিদের ফাঁসি চাই!” — অশ্রুসজল চোখে, ব্যথিত হৃদয়ে ফরিদপুর আদালত চত্বরে দাঁড়িয়ে এভাবেই কান্নায় ভেঙে পড়লেন ডালিয়া বেগম। তাঁর করুণ আহাজারিতে এক লহমায় ভারি হয়ে উঠল জেলা জজকোর্টের প্রাঙ্গণ।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) সকাল ১১টার দিকে ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলার গাজীরটেক ইউনিয়নের চরঅমরাপুর গ্রামের কৃষক ইউসুফ আলী শেখ (৫৫) হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত ফাঁসি ও পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারের দাবিতে ফরিদপুর জজকোর্ট চত্বরে এক বিশাল মানববন্ধন ও বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। প্ল্যাকার্ড, ব্যানার ও ফেস্টুন হাতে এতে অংশ নেন প্রায় দেড় শতাধিক স্বজন ও ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী।
দুর্গম চরে ডেকে নিয়ে বিষ খাইয়ে হত্যার অভিযোগ
আইনি নথি ও স্বজনদের অভিযোগ থেকে জানা গেছে, পেশায় সাধারণ কৃষক ইউসুফ আলী শেখকে গত ১ আগস্ট ২০২৬ তারিখ সন্ধ্যায় বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয় পদ্মার দুর্গম চর এলাকায়। সেখানে নিয়ে তাঁর ওপর চালানো হয় অমানবিক নির্যাতন। নির্যাতনের একপর্যায়ে দুষ্কৃতীরা তাঁর মুখে জোরপূর্বক ঘাস মারা বিষ ঢেলে দেয়।
অসুস্থ ও মুমূর্ষু অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে দু’দিন পর, ৩ আগস্ট ভোরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তিনি। মৃত্যুর ঠিক আগের মুহূর্তে ইউসুফ একটি ভিডিও বার্তায় এই নির্মম হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের নাম ও বিবরণ বলে গেছেন বলে দাবি স্বজনদের।
নারী নিখোঁজের অদ্ভুত সন্দেহ ও ৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা
ঘটনার নেপথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, এই হত্যাকাণ্ডের প্রায় এক মাস আগে মামলার প্রধান আসামি শামীমের মা আসমা বেগম রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হন। ওই ঘটনায় পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কৃষক ইউসুফসহ স্থানীয় কয়েকজনকে থানায় ডাকে। স্থানীয়দের স্পষ্ট অভিযোগ—নিখোঁজের সেই সন্দেহের জের ধরেই প্রতিশোধ নিতে ইউসুফকে ডেকে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন ও বিষ খাইয়ে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।
ঘটনার পর নিহতের স্ত্রী ডালিয়া বেগম বাদী হয়ে ৭ জনের নাম উল্লেখ করে চরভদ্রাসন থানায় একটি সুনির্দিষ্ট হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলা দায়েরের পর পুলিশি অভিযানে চার এজাহারভুক্ত আসামি গ্রেপ্তার হয়। তারা হলেন—
১. শামীম হোসেন (২৫)
২. ইয়াছমিন আক্তার (৩৪) (শামীমের বোন)
৩. আক্কাস মোল্যা (৬০)
৪. জুলহাস মোল্যা (৩৫) (আক্কাসের ছেলে)
তবে মামলার বাকি ৩ জন আসামি এতদিনেও গ্রেপ্তার না হওয়ায় চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নিহতের স্বজন ও মানববন্ধনকারীরা।
জামিন না দেওয়ার দাবি ও স্মারকলিপি প্রদান
মানববন্ধনে স্থানীয় বাসিন্দা শাখাওয়াত হোসেন বলেন, “আমাদের একটাই মূল দাবি—গ্রেপ্তার হওয়া এই চিহ্নিত খুনিরা যেন কোনো অবস্থাতেই আদালত থেকে জামিন না পায়। দ্রুত বিচারপ্রক্রিয়া শেষ করে তাদের ফাঁসি নিশ্চিত করতে হবে এবং আত্মগোপনে থাকা বাকি ৩ আসামিকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করতে হবে।”
পরবর্তীতে মানবন্ধন শেষে নিহতের স্ত্রী ডালিয়া বেগম এলাকাবাসীকে সাথে নিয়ে ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক মাজহারুল ইসলামের হাতে স্মারকলিপি তুলে দেন।
এদিকে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও চরভদ্রাসন থানার উপপরিদর্শক (এসআই) এনামুল হক জানান, “মামলার তদন্ত কার্যক্রম অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে চলমান রয়েছে। আত্মগোপনে থাকা বাকি ৩ আসামিকে জালে তুলতে পুলিশ সব ধরনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।”















