ফরিদপুরে কেন্দ্রীয় কৃষক দল নেতার বিরুদ্ধে জমি দখলের অভিযোগ
- আপডেট সময় : ১১:২৬:৫৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬
- / 332
“জমির কাগজে সই করে দাও, নইলে মরে গেলেও কবরে মাটি দিতে দেব না!”—কোনো সিনেমার খলনায়কের সংলাপ নয়, ফরিদপুর সদরের নিখুরদী গ্রামের ৮২ বছর বয়সী বৃদ্ধ আলতাফ হোসেনের ঘরে ঢুকে ঠিক এভাবেই হুমকির গর্জন তুলেছেন প্রতিবেশী ও জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহদপ্তর সম্পাদক সুলায়মান হোসাইন। ৫৯ শতক জমি দখল করতে না পেরে বৃদ্ধের অসহায়ত্ব এবং তাঁর পুলিশ কর্মকর্তা ছেলেকে পর্যন্ত ভুয়া মামলায় ফাসানোর নজিরবিহীন অভিযোগ উঠেছে এই কেন্দ্রীয় নেতার বিরুদ্ধে।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) বেলা একটার দিকে ফরিদপুর প্রেস ক্লাবে এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে কান্নাজড়িত কণ্ঠে ক্ষমতার এই বেপরোয়া দাপটের কথা তুলে ধরেন বৃদ্ধ আলতাফ হোসেন।
আলতাফ হোসেন ফরিদপুর সদরের গেরদা ইউনিয়নের নিখুরদী গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা। তিনি দুই ছেলে ও এক মেয়ের বাবা। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর থেকে কৃষক দল নেতা সুলায়মান আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। গ্রামের পাঁচটি দাগে তাঁদের প্রায় ৫৯ শতক জমি দখলের জন্য নানাভাবে ব্ল্যাকমেল ও হুমকি দিয়ে আসছেন তিনি। জমি সংক্রান্ত এই বিবাদ নিয়ে আগে একাধিক গ্রাম্য সালিশ এবং থানা-আদালত হলেও সেখানে সুলায়মান পরাজিত হন। কিন্তু তা সত্ত্বেও থামেনি তাঁর জমি দখলের চক্রান্ত।
পুলিশ ছেলেকে চাকরিচ্যুতির হুমকি ও ভুয়া হত্যা মামলা
অভিযোগের মাত্রা এখানেই শেষ নয়। বৃদ্ধ আলতাফ হোসেনের ছোট ছেলে ইউসুফ হোসেন নূর বর্তমানে পুলিশের সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) হিসেবে মাগুরায় কর্মরত। প্রতিবাদ করায় সুলায়মানের রোষানলে পড়েন তিনিও।
আলতাফ হোসেন জানান, ২০২৩ সালে তাঁর ছেলে ইউসুফ বাদী হয়ে সুলায়মানের বিরুদ্ধে ‘ভূমি প্রতিরোধ আইনে’ একটি মামলা করেন। ওই মামলায় ক্ষিপ্ত হয়ে সুলায়মান ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে সাম্প্রতিক জুলাই গণ-আন্দোলনের একটি মিথ্যা হত্যা মামলায় এএসআই ইউসুফকে আসামি করেন! এখানেই ক্ষান্ত হননি, ছেলে যেখানেই কর্মরত থাকেন, সেখানেই গিয়ে বিএনপির স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে নিয়ে পুলিশ সুপারের (এসপি) কাছে বানোয়াট অভিযোগ দিয়ে তাঁকে চাকরিচ্যুত করার চক্রান্ত চালিয়ে যাচ্ছেন সুলায়মান।
গ্রেপ্তারি পরোয়ানা তামিলে গিয়ে হুমকির মুখে পুলিশ!
ভূমি প্রতিরোধ আইনের মামলায় সম্প্রতি আদালত সুলায়মানের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা (ওয়ারেন্ট) জারি করেন। আলতাফ হোসেন জানান, গত ৮ জুলাই রাতে ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সমীর কুমার দাস আসামিকে গ্রেপ্তার করতে তাঁর বাড়িতে যান। কিন্তু পরোয়ানা তামিল করতে গেলে সুলায়মান ওই পুলিশ কর্মকর্তার ওপর চড়াও হন এবং তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করার হুমকিসহ অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন। সংবাদ সম্মেলনে সেই ঘটনার একটি অডিও রেকর্ডও সাংবাদিকদের সামনে উপস্থাপন করা হয়।
ঘটনাবলির সত্যতা স্বীকার করে কোতোয়ালি থানার এসআই সমীর কুমার জানান, “৮ জুলাই রাতে পরোয়ানা নিয়ে গেলে সুলায়মান প্রথমে অত্যন্ত উগ্র আচরণ করেন। পরবর্তীতে কৃষক দলের এক কেন্দ্রীয় নেতার মধ্যস্থতায় তিনি জানান যে তিনি অসুস্থ এবং পরদিন আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন। পরদিন তিনি আদালতে জামিন আবেদন করলে আদালত জামিন মঞ্জুর করেন।”
‘সব বানোয়াট, জমি আমাদেরই’: দাবি সুলায়মানের
তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কৃষক দল নেতা সুলায়মান হোসাইন। তাঁর দাবি, “সব অভিযোগ সম্পূর্ণ বানোয়াট। জমিগুলোর ওপর আমার বাবার নামে বৈধ দলিল রয়েছে। বাবার মৃত্যুর পর আমাদের ছোটবেলায় এই আলতাফ হোসেন গং উচ্ছেদ করে জমি দখল করে নিয়েছিল। বাবার সেই বৈধ জমি বুঝে নিতে গেলেই এই বিরোধের সৃষ্টি হয়।”
তিনি আরও দাবি করেন, “কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক ও ফরিদপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম বাবুল ভাইয়ের ফরিদপুরের বাসায় এক সালিসে সিদ্ধান্ত হওয়ার পর আলতাফ হোসেন সই করেছিলেন। কিন্তু পরে তা মানেননি। কোনো সাদা কাগজে সই নেওয়া হয়নি। বর্তমানে আদালতে বণ্টন মামলা চলমান রয়েছে।”
খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস বিএনপির
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে ফরিদপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক সৈয়দ মোদাররেস আলী জানান, নির্দিষ্ট এই ঘটনার বিস্তারিত তিনি জানেন না। তবে তিনি স্পষ্ট বার্তা দিয়ে বলেন, “আদালতের আদেশে কেউ জমি পেলে তাতে আইনগত বাধা থাকার কথা নয়। কিন্তু দলীয় পদ বা বিএনপির নাম ভাঙিয়ে কেউ যদি কোনো অন্যায় কাজ বা সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার করে থাকে, তবে তা খতিয়ে দেখে দলের পক্ষ থেকে সাংগঠনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”











