ফরিদপুরে পৌর মার্কেটে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ নির্মাণ: প্রশাসনের নির্দেশ উপেক্ষা করে চলছে কাজ
- আপডেট সময় : ০৪:১০:৫৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬
- / 263
ফরিদপুর শহরের কাঠপট্টি এলাকায় অবস্থিত পৌর মার্কেটের ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে নির্মাণকাজ বন্ধের মৌখিক নির্দেশ দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। রোববার (২৯ মার্চ) সকালে এই নির্দেশ দেওয়ার পর ঘণ্টা দুয়েক কাজ বন্ধ থাকলেও দুপুর ১২টার দিক থেকে আবারও নির্মাণকাজ শুরু হতে দেখা যায়। এ ঘটনায় পৌরসভার ভূমিকা নিয়ে সচেতন মহলে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এর আগে ঈদের ছুটির সুযোগে সবার অগোচরে এই ভবনের দোতলার ছাদের ওপর তিনতলায় লম্বা সারি করে দোকানঘর নির্মাণের কাজ শুরু হয়। দীর্ঘদিনের পুরোনো ও উপযুক্ত অবকাঠামো ছাড়াই প্রথমে একতলা এবং পরে দোতলা নির্মাণ করা হয়েছিল। দুর্বল ভিত্তির ওপর নতুন করে এই নির্মাণযজ্ঞ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাধারণ মানুষ তীব্র ক্ষোভ ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
জাতীয় পার্টির আমলে শুরু হওয়া সেই ‘ভাগবাটোয়ারা’
আশির দশকে জাতীয় পার্টির শাসনামলে ক্ষমতার অবৈধ দাপটে রাতের আঁধারে ফরিদপুর নিউমার্কেটে রাতারাতি কিছু ‘গায়েবি দোকান’ তৈরি করা হয়েছিল। তীব্র সমালোচনার মুখে সেগুলো ভেঙে ফেলার পর চক্রটির নজর পড়ে কোতোয়ালি থানার উত্তর সীমানার গেট সংলগ্ন ফাঁকা ফুটপাতের ওপর। সেখানে মার্কেট নির্মাণের নামে শুরু হয় গোপন ভাগবাটোয়ারা। সামান্য টাকায় একতলা ভবনের ২৬টি পজিশন বরাদ্দ নিয়ে পরবর্তী সময়ে প্রতিটি পজিশন ৪ থেকে সাড়ে ৪ লাখ টাকায় বিক্রি করে একটি বিশেষ গোষ্ঠী মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয়। রাজনৈতিক সুবিধাবাদীদের পাশাপাশি তৎকালীন আলোচিত টিএসআই ফজলুকেও ৪টি দোকানের পজিশন দিয়ে থানাকে ম্যানেজ করা হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান মরহুম হাসিবুল হাসান লাবলুর আমলে দোতলার পজিশন বরাদ্দ দেওয়া হয়। এরপর পৌর মেয়র মাহতাব আলী মেথুর সময় মার্কেটের পশ্চিম কোণের একাংশে প্রথম তিনতলার পজিশন বানিয়ে রাজনৈতিক কার্যালয় তৈরি করেন তৎকালীন যুবলীগের আহ্বায়ক এইচএম ফোয়াদ। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের পৌর মেয়র অমিতাভ বোসের কার্যকালের শেষদিকে এসে তিনতলার পজিশন বরাদ্দের কাজ ভাগবাটোয়ারা করা হয়। ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর এই কাজ শুরু করতে গেলে তীব্র আপত্তির মুখে দেয়াল নির্মাণ বন্ধ হয়ে যায়। তবে সম্প্রতি আবারও সেই কাজ শুরু হয়েছে। ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে নেটিজেনদের তীব্র আপত্তির মুখে এবং ‘দৈনিক অগ্নিপ্রহর’-এ খবর প্রকাশের পর পৌর কর্তৃপক্ষ কাজ বন্ধের মৌখিক নির্দেশ দেয়।
প্রশাসনের নির্দেশ ও বর্তমান চিত্র
ফরিদপুর পৌরসভার সচিব মো. তানজিলুর রহমান এই প্রতিবেদককে জানান, রোববার সকালেই কাজ বন্ধ করে দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের মৌখিক নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সকাল ১০টার দিকে কাজ শুরুর পর নির্দেশ পেয়ে কিছুক্ষণ বন্ধ থাকলেও দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে পুনরায় কাজ শুরু হয়। বর্তমানে তিনতলার দেয়ালের ওপর টিনশেড দিয়ে চাল তৈরির কাজ করছেন শ্রমিকেরা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে শ্রমিকরা বলেন, “সকালে পৌরসভা থেকে লোক এসে কাজ বন্ধ করতে বলেছিল। আমরা বন্ধ রেখেছিলাম, কিন্তু পরে দোকান মালিকরা আমাদের কাজ চালিয়ে যেতে বলেছেন।”
জননিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা ও দাবি
এভাবে তিনতলায় দোকানঘর তৈরি অত্যন্ত বিপজ্জনক উল্লেখ করে ওই মার্কেটের দোতলার চেম্বার মালিক অ্যাডভোকেট মাসুদ রানা বলেন, “এই অবৈধ নির্মাণ শুধু আইন লঙ্ঘনই নয়, বরং সাধারণ মানুষের জন্য মারাত্মক ঝুঁকির কারণ। দুর্বল ভিত্তির কারণে যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।” মাহমুদুল হাসান ওয়ালিদ নামে এক পথচারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এই মার্কেট দিয়ে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ যাতায়াত করে। ভবন ধসে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে এর অনুমোদনের সাথে জড়িত সবাই দায়ী থাকবেন। তারা বদলি হয়ে গেলেও যেন তাদের খুঁজে বের করে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।”
অ্যাডভোকেট মেহেরুণ নেসা স্বপ্না নামে অপর এক চেম্বার মালিক বলেন, “এটি জনস্বার্থবিরোধী একটি কাজ, যা কোনোভাবেই আইনসংগত নয়। আমরা কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করছি এবং সচেতন জনগণকে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে জেগে ওঠার আহ্বান জানাচ্ছি।”

















