ফরিদপুরে রাজনৈতিক তেলেসমাতি: কারারুদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতার পক্ষে বিএনপির শোডাউন
- আপডেট সময় : ০৩:৫৫:৪৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ জুন ২০২৫
- / 1298
ফরিদপুরের সালথা উপজেলায় এক অদ্ভুত রাজনৈতিক ঘটনা ঘটেছে, যেখানে কারারুদ্ধ একজন আওয়ামী লীগ নেতার পক্ষে বিএনপির কর্মী সম্মেলনে মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা ও মিছিল বের করা হয়েছে। গত রবিবার (২২ জুন, ২০২৫) দুপুরে এই ঘটনা ঘটে। কারারুদ্ধ এই নেতার ভাই, যিনি নিজেও শ্রমিক লীগের নেতা, এই শোডাউনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। ঘটনাটি সোমবার (২৩ জুন) রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও ভাইরাল হলে সবার নজরে আসে।
ঘটনার মূলে রয়েছেন সালথা উপজেলা আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক মো. নুরুদ্দীন মাতুব্বর (৫৫), যিনি বর্তমানে কারাগারে আছেন। তার বিরুদ্ধে গত ৫ আগস্টের পর থানায় হামলা, অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়া এবং বিস্ফোরক আইনে দায়ের করা তিনটি মামলার আসামি হিসেবে বর্তমানে কারাগারে আছেন। তার ভাই, উপজেলা শ্রমিক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. মুনছুর মাতুব্বর (৪৫) এই শোভাযাত্রার নেতৃত্ব দেন। তারা সালথা উপজেলার গট্টি ইউনিয়নের আড়ুয়াকান্দি গ্রামের বাসিন্দা মৃত হাসেম মাতুব্বরের দুই ছেলে।
বিএনপির সম্মেলনে আওয়ামী লীগ নেতার শোডাউন: কী ঘটেছিল?
জানা গেছে, ওইদিন সালথা উপজেলা বিএনপির কর্মী সম্মেলনের আয়োজন করা হয় উপজেলা পরিষদের মাল্টিপারপাস মিলনায়তনে। এই সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য গট্টি ইউনিয়ন বিএনপির পক্ষ থেকে কারারুদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতা মো. নুরুদ্দীন মাতুব্বরের পক্ষে দেড়শতাধিক মোটরসাইকেল, নসিমন, ভ্যান, ইজিবাইক নিয়ে এক মোটর শোভাযাত্রা বের করা হয়। শোভাযাত্রাটি সকাল ১০টার দিকে গট্টি ইউনিয়ন থেকে শুরু হয়ে বিরতি দিয়ে দুপুর পৌনে ১২টার দিকে সম্মেলনস্থলে পৌঁছায়। পরে মিছিল করে নুরুদ্দীনের সমর্থকরা সম্মেলনে যোগ দেন।
ব্যানারে জিয়া, খালেদা, তারেক ও নুরুদ্দীন: এক অদ্ভুত সমন্বয়!
নুরুদ্দীনের পক্ষে যে ব্যানারটি ব্যবহার করা হয়, তার ওপরের বাম পাশে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, মাঝে বেগম খালেদা জিয়া এবং শেষে তারেক রহমানের ছবি ছিল। ডান পাশে ফরিদপুর-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য প্রয়াত ওবায়দুল রহমানের ছবি দেওয়া ছিল। মাঝের বাম পাশে বড় করে নুরুদ্দীনের ছবি এবং ডান পাশে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদের ছবি ছিল। ব্যানারের মাঝে লেখা ছিল: “বারবার নির্যাতিত বিএনপি নেতা মো. নুরুদ্দীন মাতুব্বরের পক্ষ থেকে শামা আপার হাতকে শক্তিশালী করতে ২২ জুন সালথা উপজেলা বিএনপির কর্মী সম্মেলন সফল হোক। প্রচারে: গট্টি ইউনিয়ন বিএনপি।”
দলের পরিচয় নিয়ে বিতর্ক ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
নুরুদ্দীন মাতুব্বরের ভাই উপজেলা শ্রমিক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. মুনছুর মাতুব্বর দাবি করেন, “আমার ভাই নুরুদ্দীন আজীবন বিএনপি করেছেন। এখনো বিএনপি করেন। তিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক নন। তিনি বিএনপি করেন।” শ্রমিক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, “একথা আমার জানা নেই, কোনো কাগজও দেখিনি।”
তবে মুনছুরের দাবি নাকচ করে দিয়ে সালথা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক চৌধুরী সাব্বির আলী বলেন, “নুরুদ্দীন মাতুব্বর উপজেলা আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক এবং তার ভাই মুনছুর উপজেলা শ্রমিক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক।”
নুরুদ্দীন যে আওয়ামী লীগ নেতা, সে বিষয়টি নিশ্চিত করে সালথা থানার ওসি আতাউর রহমান বলেন, “নুরুদ্দীন উপজেলা আওয়ামী লীগের পদধারী নেতা। তিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক। নুরুদ্দীনের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক, অস্ত্র, থানায় হামলাসহ একাধিক মামলা রয়েছে।”
নাম প্রকাশ না করার শর্তে উপজেলা বিএনপির তিন নেতা অভিযোগ করেছেন, আওয়ামী লীগ নেতা নুরুদ্দীনের পক্ষে এই শোডাউনের মদদ দিয়েছেন পাশের নগরকান্দা উপজেলা বিএনপির সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি হাবিবুর রহমান বাবুল তালুকদার, যিনি নগরকান্দার লস্কারদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। তিনি নগরকান্দার বিএনপির নেতা হলেও সালথা-নগরকান্দা উভয় উপজেলার রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করেন।
তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করে আজ মঙ্গলবার (২৪ জুন) সকালে হাবিবুর রহমান বাবুল তালুকদার বলেন, “আওয়ামী লীগ নেতা নুরুদ্দীনকে আমি মদদ দেই না। বিএনপির কেউ এমন অভিযোগ করে থাকলে তা তার বিরুদ্ধে প্রতিহিংসার রাজনীতির অংশ হিসেবে করে থাকতে পারে। নুরুদ্দীনকে বিএনপিতে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।”
সালথা উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান তালুকদার বলেন, “সালথা বিএনপির এক বহিষ্কৃত নেতার সহায়তায় এ ঘটনা ঘটেছে। আমরা তখন বাধা দেইনি, কারণ জেলা থেকে আগত নেতৃবৃন্দের সামনে পরিবেশ নষ্ট হবে বলে।”
ফরিদপুর জেলা বিএনপির সদস্য সচিব একেএম কিবরিয়া বলেন, “আওয়ামী লীগের কোনো নেতার বিএনপিতে আসার কোনো সুযোগ নেই। এদের প্রতিহত করতে যা যা প্রয়োজন করা হবে।”





















