ঢাকা ০৩:৫০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফরিদপুরে এমপি বাবুলের বক্তব্য ঘিরে বিতর্ক: সোশাল মিডিয়ায় ভিন্নমুখী চর্চা

দৈনিক জাগ্রত বাংলাদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ০৪:৪৩:০০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬
  • / 280

“খেলাধুলা করব আমরা, গানবাজনা করব, নৃত্যকলা করব। এই সংস্কৃতি, গান, নৃত্যকলা, জারি-সারি, ভাটিয়ালি, কাওয়ালি আমাদের শ্বাশ্বত কালের ঐতিহ্য। একটা গোষ্ঠী আছে, জান্নাতি দল আমরা বলি, তাদের কথা এই গান নাকি হারাম, নাচ নাকি হারাম! কোত্থেকে আমদানি করছে তাদের এই কথা আমরা জানি না।”

ফরিদপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম বাবুলের এই ক্ষুরধার উক্তিই এখন নেট দুনিয়া থেকে শুরু করে চায়ের কাপে ঝড়ের কেন্দ্রবিন্দু! গত ১৫ আগস্ট ব্রাহ্মণকান্দা এ.এস একাডেমির বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই মন্তব্য করেন। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের দেশীয় ঐতিহ্যের গান ও নাচ পরিবেশনের প্রশংসায় মুখর হলেও তাঁর এই বক্তব্য সোশাল মিডিয়ায় চরম ধর্মীয় ও সামাজিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। রাজনৈতিক বিরোধী পক্ষ তো সরাসরি একে ‘ইসলাম অবমাননা’ বলে দাগিয়ে দিয়েছে।

কিন্তু এই বাকযুদ্ধের পেছনে আসল সত্যটা কী? লোকসংস্কৃতির আবেগ বনাম শরিয়তের দৃষ্টিভঙ্গি—দুইয়ের সংঘাত ঠিক কোন জায়গায়? নিচে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা হলো:

শরিয়তের দলিল বনাম ফকিহদের দৃষ্টিভঙ্গি: বিতর্কটা কোথায়?

বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার ঐতিহ্যবাহী কওমি ও দেওবন্দী আলেম সমাজ গান ও বাদ্যযন্ত্রকে বরাবরই শরিয়তবিরোধী মনে করেন। তাঁদের মূল ভিত্তি সহীহ বুখারীর বিখ্যাত হাদিস (নং ৫৫ ৯০), যেখানে শেষ জামানায় বাদ্যযন্ত্রকে হালাল মনে করা এক দলের আবির্ভাবের বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। চার মাযহাবের অধিকাংশ সনাতনী আলেম এই বর্ণনার ওপর ভিত্তি করে আধুনিক বাদ্যযন্ত্রকে নিষিদ্ধ মনে করেন।

তবে বিশ্ববরেণ্য ইসলামিক স্কলারদের একাংশের দৃষ্টিভঙ্গি আবার ভিন্ন। প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম ইবনে হাজম (রহ.) উক্ত হাদিসের সনদে ‘মুআল্লাক’ বা সূত্রবিচ্ছিন্নতা উল্লেখ করে সব ধরনের বাদ্যযন্ত্র ঢালাওভাবে হারাম করার জন্য তা পর্যাপ্ত নয় বলে মত দেন। আধুনিক যুগের প্রখ্যাত স্কলার ড. ইউসুফ আল-কারযাভী কিংবা মিসরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ফতোয়া বোর্ডের স্পষ্ট বক্তব্য—সুর বা বাদ্যযন্ত্র স্বতসিদ্ধ হারাম নয়। যদি বিষয়বস্তু অশ্লীলতা বা পাপাচারের দিকে না ঠেলে দেয়, তবে তা শালীন বিনোদন হিসেবে গ্রহণযোগ্য।

ইতিহাসও বলে, রাসুল (সা.)-এর সময়ে বিবাহ বা উৎসবে একমুখী ঢোল বা ‘দফ’ বাজানোর প্রচলন ছিল (সহীহ বুখারী: ৯৪৯)। এমনকি মসজিদে নববীর আঙিনায় আবিসিনীয় যুবকদের শারীরিক কসরত ও ঐতিহ্যবাহী নৃত্য রাসুল (সা.) ও হযরত আয়েশা (রা.) প্রত্যক্ষ করেছিলেন (সহীহ বুখারী: ৪৫৪)।

এমপি শহিদুল ইসলাম বাবুলের ব্যাখ্যা:

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাঁর বক্তব্য ঘিরে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হওয়ার পর ফরিদপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম বাবুল বিষয়টি নিয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। সোশাল মিডিয়ায় দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি জানান, গত দিন তাঁর একটি বক্তব্যের খণ্ডিত অংশ প্রচার করে কুচক্রী মহল নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরির চক্রান্ত চালাচ্ছে।

সংসদ সদস্য বলেন, “আমি এবং আমার পরিবার কঠোরভাবে ইসলাম ধর্ম পালন করি এবং পৃথিবীর সকল ধর্মের প্রতিই আমাদের গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে। তবে আমার সেই বক্তব্যে অনিচ্ছাকৃতভাবে কেউ যদি আঘাত পেয়ে থাকেন, তবে তা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ জানাচ্ছি।” একই সঙ্গে তিনি সকল প্রকার বিভ্রান্তিকর অপপ্রচার ও ভুল তথ্যের বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন ও যত্নবান থাকার উদাত্ত আহ্বান জানান।

সমাজ ব্যবস্থা ও সুস্থ বিনোদনের তীব্র সংকট

উপমহাদেশীয় প্রেক্ষাপটে ধর্মীয় আপত্তির মূল জায়গা বাদ্যযন্ত্রের চেয়েও বেশি বিনোদনশিল্পে ঢুকে পড়া বেপর্দা ও বাণিজ্যিক অশ্লীলতা। যাত্রাপালা থেকে শুরু করে আধুনিক মাধ্যমে নগ্নতা ও অশালীনতার অনুপ্রবেশের কারণে সাধারণ মানুষ ও আলেমদের মনে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ জমেছে।

কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, বিকল্প সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা না করে শুধু ঢালাও নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার ফলে নতুন প্রজন্ম দ্রুত বিজাতীয় সংস্কৃতির দিকে ঝুঁকে পড়ছে। ধর্মীয় মূলনীতির উদ্দেশ্য মানুষকে বিনোদনহীন করা নয়, বরং সামাজিক নৈতিকতা রক্ষা করা। অথচ সুস্থ সাংস্কৃতিক কাঠামোর অভাবে ধর্মীয় আবেগ এবং সাধারণ মানুষের মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বের ফাঁকে ঢুকে পড়ছে অনাকাঙ্ক্ষিত কাদা ছোড়াছুড়ি।

ফরিদপুরে এমপি বাবুলের বক্তব্য ঘিরে বিতর্ক: সোশাল মিডিয়ায় ভিন্নমুখী চর্চা

আপডেট সময় : ০৪:৪৩:০০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬

“খেলাধুলা করব আমরা, গানবাজনা করব, নৃত্যকলা করব। এই সংস্কৃতি, গান, নৃত্যকলা, জারি-সারি, ভাটিয়ালি, কাওয়ালি আমাদের শ্বাশ্বত কালের ঐতিহ্য। একটা গোষ্ঠী আছে, জান্নাতি দল আমরা বলি, তাদের কথা এই গান নাকি হারাম, নাচ নাকি হারাম! কোত্থেকে আমদানি করছে তাদের এই কথা আমরা জানি না।”

ফরিদপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম বাবুলের এই ক্ষুরধার উক্তিই এখন নেট দুনিয়া থেকে শুরু করে চায়ের কাপে ঝড়ের কেন্দ্রবিন্দু! গত ১৫ আগস্ট ব্রাহ্মণকান্দা এ.এস একাডেমির বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই মন্তব্য করেন। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের দেশীয় ঐতিহ্যের গান ও নাচ পরিবেশনের প্রশংসায় মুখর হলেও তাঁর এই বক্তব্য সোশাল মিডিয়ায় চরম ধর্মীয় ও সামাজিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। রাজনৈতিক বিরোধী পক্ষ তো সরাসরি একে ‘ইসলাম অবমাননা’ বলে দাগিয়ে দিয়েছে।

কিন্তু এই বাকযুদ্ধের পেছনে আসল সত্যটা কী? লোকসংস্কৃতির আবেগ বনাম শরিয়তের দৃষ্টিভঙ্গি—দুইয়ের সংঘাত ঠিক কোন জায়গায়? নিচে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা হলো:

শরিয়তের দলিল বনাম ফকিহদের দৃষ্টিভঙ্গি: বিতর্কটা কোথায়?

বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার ঐতিহ্যবাহী কওমি ও দেওবন্দী আলেম সমাজ গান ও বাদ্যযন্ত্রকে বরাবরই শরিয়তবিরোধী মনে করেন। তাঁদের মূল ভিত্তি সহীহ বুখারীর বিখ্যাত হাদিস (নং ৫৫ ৯০), যেখানে শেষ জামানায় বাদ্যযন্ত্রকে হালাল মনে করা এক দলের আবির্ভাবের বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। চার মাযহাবের অধিকাংশ সনাতনী আলেম এই বর্ণনার ওপর ভিত্তি করে আধুনিক বাদ্যযন্ত্রকে নিষিদ্ধ মনে করেন।

তবে বিশ্ববরেণ্য ইসলামিক স্কলারদের একাংশের দৃষ্টিভঙ্গি আবার ভিন্ন। প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম ইবনে হাজম (রহ.) উক্ত হাদিসের সনদে ‘মুআল্লাক’ বা সূত্রবিচ্ছিন্নতা উল্লেখ করে সব ধরনের বাদ্যযন্ত্র ঢালাওভাবে হারাম করার জন্য তা পর্যাপ্ত নয় বলে মত দেন। আধুনিক যুগের প্রখ্যাত স্কলার ড. ইউসুফ আল-কারযাভী কিংবা মিসরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ফতোয়া বোর্ডের স্পষ্ট বক্তব্য—সুর বা বাদ্যযন্ত্র স্বতসিদ্ধ হারাম নয়। যদি বিষয়বস্তু অশ্লীলতা বা পাপাচারের দিকে না ঠেলে দেয়, তবে তা শালীন বিনোদন হিসেবে গ্রহণযোগ্য।

ইতিহাসও বলে, রাসুল (সা.)-এর সময়ে বিবাহ বা উৎসবে একমুখী ঢোল বা ‘দফ’ বাজানোর প্রচলন ছিল (সহীহ বুখারী: ৯৪৯)। এমনকি মসজিদে নববীর আঙিনায় আবিসিনীয় যুবকদের শারীরিক কসরত ও ঐতিহ্যবাহী নৃত্য রাসুল (সা.) ও হযরত আয়েশা (রা.) প্রত্যক্ষ করেছিলেন (সহীহ বুখারী: ৪৫৪)।

এমপি শহিদুল ইসলাম বাবুলের ব্যাখ্যা:

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাঁর বক্তব্য ঘিরে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হওয়ার পর ফরিদপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম বাবুল বিষয়টি নিয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। সোশাল মিডিয়ায় দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি জানান, গত দিন তাঁর একটি বক্তব্যের খণ্ডিত অংশ প্রচার করে কুচক্রী মহল নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরির চক্রান্ত চালাচ্ছে।

সংসদ সদস্য বলেন, “আমি এবং আমার পরিবার কঠোরভাবে ইসলাম ধর্ম পালন করি এবং পৃথিবীর সকল ধর্মের প্রতিই আমাদের গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে। তবে আমার সেই বক্তব্যে অনিচ্ছাকৃতভাবে কেউ যদি আঘাত পেয়ে থাকেন, তবে তা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ জানাচ্ছি।” একই সঙ্গে তিনি সকল প্রকার বিভ্রান্তিকর অপপ্রচার ও ভুল তথ্যের বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন ও যত্নবান থাকার উদাত্ত আহ্বান জানান।

সমাজ ব্যবস্থা ও সুস্থ বিনোদনের তীব্র সংকট

উপমহাদেশীয় প্রেক্ষাপটে ধর্মীয় আপত্তির মূল জায়গা বাদ্যযন্ত্রের চেয়েও বেশি বিনোদনশিল্পে ঢুকে পড়া বেপর্দা ও বাণিজ্যিক অশ্লীলতা। যাত্রাপালা থেকে শুরু করে আধুনিক মাধ্যমে নগ্নতা ও অশালীনতার অনুপ্রবেশের কারণে সাধারণ মানুষ ও আলেমদের মনে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ জমেছে।

কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, বিকল্প সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা না করে শুধু ঢালাও নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার ফলে নতুন প্রজন্ম দ্রুত বিজাতীয় সংস্কৃতির দিকে ঝুঁকে পড়ছে। ধর্মীয় মূলনীতির উদ্দেশ্য মানুষকে বিনোদনহীন করা নয়, বরং সামাজিক নৈতিকতা রক্ষা করা। অথচ সুস্থ সাংস্কৃতিক কাঠামোর অভাবে ধর্মীয় আবেগ এবং সাধারণ মানুষের মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বের ফাঁকে ঢুকে পড়ছে অনাকাঙ্ক্ষিত কাদা ছোড়াছুড়ি।