প্রেমে বাঁধা ও বিয়ের আলোচনায় চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রীর আত্মহত্যা
- আপডেট সময় : ১২:৫২:১৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 175
বয়সটা ছিল মাত্র চৌদ্দ। যে বয়সে হাতে থাকে স্কুলের বই আর চোখে থাকে অজস্র রঙিন স্বপ্ন, সেই বয়সেই এক বুক অবাধ্য প্রেম আর অভিমানের তীব্র যন্ত্রণা সইতে না পেরে পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়ার পথ বেছে নিল এক কিশোরী। তবে যাওয়ার আগে লিখে রেখে গেল এক হৃদয়বিদারক চিঠি—যে চিঠির প্রতিটি ছত্রে ফুটে উঠেছে মায়ের প্রতি অগাধ ভালোবাসা, না পাওয়ার যন্ত্রণা আর চরম সামাজিক মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার পোড়াগাঁও ইউনিয়নের আন্ধারুপাড়া গ্রামে নানার বাড়িতে ঘটে এই হৃদয়বিদারক ঘটনা। নিহত কিশোরী স্থানীয় ব্র্যাক স্কুলের চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ত।
পরিবারের লোকজন ঘরের ভেতর ওই শিক্ষার্থীকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পেয়ে চিৎকার করে উঠলে আশপাশের মানুষ ছুটে আসে। পরে খবর পেয়ে নালিতাবাড়ী থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে। মরদেহের পাশ থেকেই উদ্ধার হয় সেই অশ্রুসিক্ত চিরকুট।
শৈশবে পিতৃহীন, ভালোবাসার টানে চরম সিদ্ধান্ত
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, শৈশবেই এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় বাবাকে হারায় কিশোরীটি। তারপর থেকে তিন মেয়েকে নিয়ে বাবার বাড়ি আন্ধারুপাড়াতেই আশ্রয় নেন মা। তিন বোনের মধ্যে সে ছিল দ্বিতীয়।
সম্প্রতি কিশোরীটির সঙ্গে প্রতিবেশী এক যুবকের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যা নিয়ে পরিবারের সঙ্গে তাঁর কিছুদিন ধরেই অম্লমধুর বিবাদ চলছিল। কিছুদিন আগে তার জন্য নতুন বিয়ের প্রস্তাব এলে তাতে আপত্তি জানায় পরিবার। এই প্রেম মেনে না নেওয়া এবং অন্য কোথাও বিয়ের তোড়জোড় শুরুর সম্ভাবনাই তার মনস্তাত্ত্বিক জগতকে চুরমার করে দেয় বলে মনে করা হচ্ছে।
নালিতাবাড়ী থানা পুলিশ উদ্ধার করা যে চিরকুটটি জব্দ করেছে, সেখানে মায়ের উদ্দেশে লেখা ছিল—
‘মা তুমি আমারে মাফ কইরা দিও। আমি তোমার কথা রাখতে পারলাম না। আমি চাইলে পালিয়ে যেতে পারতাম। কিন্তু তোমার মাথা ধরে যে আমি তোওবা কাটছি… মা, তুমি কি একবারও ভাবছিলা আমি তারে পাইলে সুখ পাবো। হাজারো দুঃখ-কষ্টে থাকলেও আমি শান্তি পাইতাম। কারণ তারে যে আমি ভালোবাসি।’
অনুমোদিত বা চাপিয়ে দেওয়া বিয়ের প্রতি অনীহা প্রকাশ করে সে আরও লিখে গেছে—
‘তারে ছাড়া যদি তোমরা অন্য কারো সাথে বিয়ে দিতা, সত্যি কইতাছি মরার মতো বাঁচতাম।’
চিরকুটের সবচেয়ে স্পর্শকাতর দিক হলো, সে মৃত্যুর পরেও নিজের ভালোবাসার মানুষটিকে বাঁচাতে চেয়েছে। পুলিশ বা পরিবার যেন তাকে দোষী না করে, সে আর্জি জানিয়ে সে লেখে—
‘এখানে কারো দোষ নাই। তাও যদি তোমরা তারে অপরাধী হিসাবে দোষ দেও, তাইলে আমি মইরা গেলেও শান্তি পাইতাম না।’ চিঠির একদম শেষে সে নিজেকে সই করেছে—‘তোমার কপাল পোড়া’ নামে।
ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার ও চিরকুট জব্দের কথা নিশ্চিত করে নালিতাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান জানান, পুলিশ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখছে এবং প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।











